Logo

ধর্ম

বরকত সিরিজ-২

বরকতের পরিচয়

Icon

উবাইদুল্লাহ তারানগরী

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫২

বরকতের পরিচয়

বরকত কী? আমরা কেন বরকত কামনা করব? বরকত বা বারাকাহ বহুল প্রচলিত একটি আরবি শব্দ। ক্ষেত্র বিশেষ অনেক অর্থ হয়। স্থান-কাল-পাত্রভেদে আরবি শব্দ ‘বরকত’-এর অনেক অর্থ হয়ে থাকে। যার প্রতিটি অর্থই কল্যাণের। মঙ্গলের। কল্যাণের উপস্থিতি, তার স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতাকে বলা হয় বারাকাহ বা বরকত।। আল্লামা রাগিব ইস্পাহানি (রহ.) বলেন, বরকত বলা হয় ঐ জিনিসকে যাতে মহান আল্লাহর কল্যাণ নিহিত থাকে। (মুফরাদাতু আলফাযিল কোরআন : ১/৮৩)। 

বরকত মানে- ‘আল্লাহর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা।’

বরকত মানে- ‘সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি’। অর্থাৎ আল্লাহ বান্দার সব বিষয়ে প্রবৃদ্ধি ও সফলতা দান করেন।

বরকত মানে- ‘মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়া’।

বরকত মানে- কল্যাণের শিক্ষক।

বরকত মানে- সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ।’ (ফাতহুল কাদির) 

সব কাজে চাই বরকত। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বরকতের প্রয়োজন। মূলত আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বরকতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কেননা, যার জীবনে বরকত ও কল্যাণ নেই সে সারা দুনিয়ার সম্পদের মালিক হলেও সুখ পাবে না। নিশ্চিন্তে এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না। জীবনটা তখন দুনিয়ার জাহান্নামে পরিণত হবে। মানসিক শান্তি সুখ আল্লাহর নেয়ামত। যাদের জীবন মহান আল্লাহ কল্যাণ ও বরকতে ভরপুর করেন, তারাই তা অনুভব করতে পারে। বরকতময় জীবন শান্তিময় হয়, সুখ-শান্তিতে ভরপুর থাকে। সে হায়াতে, সময়ে, সম্পদে বরকত পায়। 

এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন, কিন্তু সে জীবনে ধনসম্পদ, সন্তানসন্ততি কিংবা আমল-ইবাদতে কোনো বরকত নেই। আবার অনেকে পরিশ্রম করেন কিন্তু প্রাপ্তি সেভাবে আসে না। এর অর্থ হলো কাজে কোনো বরকত নেই। পক্ষান্তরে এমন অনেক লোক আছেন, যারা কম হায়াত পেয়েছেন কিন্তু ধনসম্পদ, সন্তানসন্ততি, ইবাদত-আমলে বরকত লাভ করেছেন। অনেকে স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করেন কিংবা অল্প বেতনে কাজ করেন, কিন্তু তাতে বরকত আছে। তাই প্রত্যেকটা কাজে বরকত খুব জরুরি।

বরকত একটি উহ্য সৈনিক 

বরকতের বিচিত্র প্রকার ও অর্থ এক আল্লাহওয়ালার বর্ণনায় ফুটে উঠেছে। 

জনৈক বুজুর্গ দোয়া করছেন- ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার রিজিকে বরকত দান করুন।

তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, আপনি কেন এভাবে দোয়া করছেন? বরং বলুন- হে আল্লাহ! আপনি আমাকে রিজিক দান করুন।

বুজুর্গ বললেন- ‘আল্লাহতায়ালা তার প্রত্যেক সৃষ্টির রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু আমি চাই, রিজিকে বরকত। কারণ, বরকত হল আল্লাহতায়ালার একটি গোপন সৈনিক; যার কাছে ইচ্ছা তিনি তা প্রেরণ করেন। অতপর বলেন;

এই ‘বরকত’ যদি সম্পদে প্রবেশ করে; তাহলে তা সম্পদ বৃদ্ধি করে দেয়।

এই ‘বরকত’ যদি সন্তান-সন্ততির মধ্যে প্রবেশ করে; তাহলে তাদেরকে সংশোধন করে দেয়।

এই ‘বরকত’ যদি শরীরে প্রবেশ করে; তাহলে তা শরীরকে শক্তিশালী করে দেয়।

এই ‘বরকত’ যদি সময়ে প্রবেশ করে; তাহলে সময়কে সমৃদ্ধ করে দেয়।

আর এই ‘বরকত’ যদি হৃদয়ে প্রবেশ করে; তাহলে তাতে এনে দেয় সুখ ও শান্তির ছোঁয়া।’

তাই আমাদের ও দোয়া আকাক্সক্ষা হবে হে আল্লাহ! আপনি আমাদের যা কিছু দিয়েছেন তাতে ‘বরকত’ দান করুন। যখন কাজে বরকত থাকে না তখন মানুষের সব কাজ দুশ্চিন্তায় অতিবাহিত হয়। এ জন্যই রাসুল ( সা.) সব সময় নিজের জন্য ও অন্যের জন্য বরকতের দোয়া করতেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, আবদুর রাহমান বিন আওফ (রা.) গায়ে (বা পোশাকে) রাসুল (সা.) হলুদ রং-এর চিহ্ন দেখে প্রশ্ন করেন- কি ব্যাপার! তিনি বললেন, আমি এক নারীকে একটি খেজুর আঁটির অনুরূপ পরিমাণ সোনার বিনিময়ে বিয়ে করেছি। রাসুল (সা.) বললেন- ‘তোমাকে আল্লাহতায়ালা বরকত দিন। আর ওয়ালিমার আয়োজন কর; তা একটি ছাগল দিয়ে হলেও।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, বোখারি ও মুসলিম)

এমনকি রাসুল (সা. ) প্রিয় নাতি হজরত হাসান (রা.) কে বরকত লাভের দোয়া শিক্ষা দিয়েছিলেন। হজরত হাসান (রা.) কর্তৃক বিতর নামাজে পঠিত লম্বা দোয়ার অংশ ছিল- “ওয়া বারিক লি ফি-মা আ’তাইতা”

অর্থ : (হে আল্লাহ!) তুমি আমাকে যা দান করেছ, তার মধ্যে বরকত দাও! (তিরমিজি)

হজরত হাসান (রা.) এর পুরো দোয়াটি হলো-

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! যাদেরকে তুমি হেদায়াত করেছো আমাকেও তাদের সাথে হেদায়াত কর, যাদের প্রতি উদারতা দেখিয়েছ তুমি তাদের সঙ্গে আমার প্রতিও উদারতা দেখাও। তুমি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছ তাদের সঙ্গে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ কর। তুমি আমাকে যা দান করেছ তার মধ্যে বারকাত দাও। তোমার নির্ধারিত খারাবি হতে আমাকে রক্ষা কর। কেননা তুমিই নির্দেশ দিতে পার, তোমার উপর কারো নির্দেশ চলে না। যাকে তুমি বন্ধু ভেবেছ সে কখনও অপমানিত হয় না। তুমি কল্যাণময়, তুমি সুউচ্চ।’ (তিরমিজি, ইবনে খুজাইমা, আবু দাউদ)

বরকতেই রয়েছে পরম শান্তি 

যার বেতন বিশ হাজার টাকা, সে চিন্তা করে আমার বেতন ত্রিশ হাজার হলে সমস্যার সমাধান হয়ে হয়ে যাবে, ত্রিশ হাজার টাকার লোক চিন্তা করে পঞ্চাশ হাজার হলে কোনো সমস্যা আমার জীবনে থাকবে না, পঞ্চাশ হাজার টাকার লোক চিন্তা করে এক লাখ হলে আমার জীবনে আর কোনো পেরেশানি থাকবে না। কিন্তু দিন শেষে দেখা যায়, সমস্যা একটা যায় তো আরেটা বড় বিপদ ডালপালাসহ সামনে উপস্থিত হয়। সুতরাং বোঝা গেল, সম্পদ অধিক হওয়া সমস্যা কিংবা পেরেশানির সমাধান নয়। সমাধান আছে, বরকতের মাঝে। বরকতেই শান্তি, বরকতেই তৃপ্তি। পবিত্র শাবান মাস শেষ হতে চলেছে। মহিমান্বিত বরকতময় রমজান কড়া নাড়ছে। শাবানেও সাহাবায়ে কেরাম ও নবীজি (সা.) বরকতের দোয়া করতেন। রমজানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই। আল্লাহতায়ালা আমাদের শাবানে বরকত দান করুন। রমজান পর্যন্ত হায়াতকে দীর্ঘায়িত করে দিন। 

লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইবনে আব্বাস (রা.) সামান্তপুর, জয়দেবপুর গাজীপুর সিটি

বিকেপি /এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর