Logo

ধর্ম

নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়াত

মানবজাতির জন্য চিরন্তন দিশারী

Icon

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২৯

মানবজাতির জন্য চিরন্তন দিশারী

নবী মুহাম্মাদ (সা.) মানব ইতিহাসের শেষ নবী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দূত। আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন মানবজাতিকে ঈমান, নৈতিকতা, শিক্ষা এবং ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার জন্য। নবুয়াতের মাধ্যমে তিনি কেবল ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করেননি, বরং সমাজে ন্যায়, সমতা ও মানবীক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন: আমি তোমাকে সমস্ত মানুষের প্রতি দূত হিসেবে পাঠিয়েছি। (সূরা আল-আনবীয়া:১০৭) নবীজির (সা.) জীবন আমাদের জন্য চিরন্তন দিশা, যা শেখায় কিভাবে আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখে নৈতিক ও মানবীক জীবনযাপন করতে হয়।

নবুয়াত প্রাপ্তি ও প্রাথমিক জীবন

মক্কার সমাজ তখন সামাজিক ও নৈতিকভাবে দুর্বল এবং অস্থিতিশীল ছিল। আল্লাহ নবীজিকে (সা.) মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে নির্বাচিত করেন। কোরআনে উল্লেখ রয়েছে: যিনি মানুষের মধ্যে বাছাই করা হয়ে দূত পাঠিয়েছেন, যাতে আল্লাহর বাণী প্রচার করা যায়। (সূরা আল-আযহার:১৬ ) নবীজি (সা.) ৪০ বছর বয়সে গুহায় ধ্যানের সময় প্রথম ওহি প্রাপ্ত হন। প্রথম ওহি হলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ পাঠের নির্দেশ।

হাদিসে বর্ণিত: পাঠ কর; আল্লাহ তোমাকে পাঠের মাধ্যমে শিক্ষা দেবেন। (সহীহ বুখারি: ৪৬) এই মুহূর্ত থেকে নবীজির (সা.) জীবন আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হতে শুরু করে।

নবুয়াতের উদ্দেশ্য

নবীজি (সা.) নবুয়াতের মাধ্যমে সমাজে তিনটি মূল লক্ষ্য স্থাপন করেন।

* নৈতিক ও মানবীক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা: হাদিসে বর্ণিত: সর্বোত্তম মানুষ হলো যিনি মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী। (সহীহ মুসলিম:২৬৯৯)

* সমাজে ন্যায় ও সমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা: কোরআনে উল্লেখ রয়েছে:অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন।” (সূরা আনফাল:৭২) নবীজির (সা.) জীবন এ দুই দিককে সমন্বিত করে মানবতার জন্য চিরন্তন দিশা স্থাপন করেছে।

নবুয়াতের সময়কালে কার্যক্রম

শিক্ষা ও দাওয়াত: নবীজি (সা.) প্রথমে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। হাদিসে বর্ণিত: আল্লাহর রাসুল সর্বদা মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করতেন। (সহীহ বুখারি: ১১০)

সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা: তিনি দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষা করতেন। কোরআনে বলা হয়েছে: “বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষা করো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।”

(সূরা আনফাল:৫৮)

আখলাক ও ধর্মীয় অনুশীলন: সততা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও সহমর্মিতা ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে:

“নির্মল হৃদয়ই সঠিক ঈমানের পরিচয়। (সহীহ মুসলিম: ২৫৫) নবীজি (সা.) মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং মানবীক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

নবুয়াতের প্রতিকূলতা

মক্কার কুরাইশরা নবীজির (সা.) দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাঁকে সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা চালানো হয়। কোরআনে বলা হয়েছে: যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হবে। (সূরা আল-মুদ্দাসির:৪-৫)

নবীজি (সা.) ধৈর্য ও স্থিতপ্রজ্ঞার মাধ্যমে সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতেন। হাদিসে বলা হয়েছে: যে ধৈর্যশীল, আল্লাহ তাকে মহাপরিতৃপ্তি দেবেন। (সহীহ বুখারি: ৫৬৭) এটি দেখায় কিভাবে নৈতিক শিক্ষা ও মানবীক আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ধৈর্য অপরিহার্য।

মদীনা হিজরতের মাধ্যমে নবুয়াত সম্প্রসারণ

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর নবীজি (সা.) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিনি সমাজে ন্যায়, শিক্ষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।

সামাজিক ব্যবস্থা: মানুষের অধিকার, দায়িত্ব এবং শাসন সংজ্ঞায়িত হয়। কোরআনে বলা হয়েছে: আপনারা সব কাজ ন্যায় ও সুবিচারের মাধ্যমে পরিচালনা করুন। (সূরা নিসা:৫৮)

শান্তি ও চুক্তি: নবীজি (সা.) সকল সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চুক্তি স্থাপন করেছিলেন। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে: “আল্লাহর রাসুল সর্বদা শান্তি ও দয়া বজায় রাখতেন। (সহীহ মুসলিম:২৩৩) নবীজি (সা.) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমঝোতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন কিভাবে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা যায়।

নবুয়াতের শিক্ষা আজকের সমাজে

নবীজির (সা.) জীবন থেকে আমরা শিখি কিভাবে ঈমান, নৈতিকতা এবং মানবীক মূল্যবোধের সংমিশ্রণে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায়।

* বিশ্বাস স্থাপন ও নিয়মিত ইবাদত।

* সততা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

* দরিদ্র ও দুর্বলদের অধিকার রক্ষা করা।

* প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের সময় ধৈর্য ও সাহস বজায় রাখা। এই শিক্ষা আজকের যুবক সমাজের জন্যও চিরন্তন দিশা।

পরিশেষে বলতে চাই, নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুয়াত জীবন কেবল অতীতের ঘটনা নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, জীবনযাপন এবং সমাজ ব্যবস্থায় চিরন্তন দিশা প্রদান করে। তাঁর শিক্ষা আমাদের নৈতিকতা, মানবীকতা এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পথে পরিচালিত করে। নবীজির (সা.) জীবন আমাদের শেখায়, প্রতিটি পদক্ষেপ ঈমান, নৈতিকতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। আল্লাহর নির্দেশ এবং মানবীক মূল্যবোধ অনুসরণ করে আমরা সমাজে শান্তি, ন্যায় এবং সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর