শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো শৈশবকাল। শিশুকালেই মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। পরিবার যেমন শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়, তেমনি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা হলো তার দ্বিতীয় ঘর। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকগণ শুধু পাঠদানই করেন না; বরং তারা শিশুদের আখলাক, শালীনতা ও জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতার পাঠও দেন।
বর্তমান সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের শাসনের প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও অতিরিক্ত মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে, আবার কোথাও শাসনের নামে সবকিছু নিষিদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে শাসনের অভাবে শৃঙ্খলাহীনতা বাড়ছে। এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে শরীয়তের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কী; সে প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
শিশুদের শিক্ষা ও তরবিয়তের গুরুত্ব
ইসলামে শিশুদের শিক্ষা ও তরবিয়ত একটি আমানত। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।’ [সুরা তাহরিম : ৬] এই আয়াত প্রমাণ করে, সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও সংশোধনের দায়িত্ব অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ওপর অর্পিত। দীন শেখানো, আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া এবং ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা-সবই এই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
রাসুলুল্লাহ সা. নিজে শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের মাথায় হাত বুলাতেন, কোলের উপর বসাতেন এবং ভুল করলে ধৈর্যের সঙ্গে সংশোধন করতেন। এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে শিক্ষার মূলনীতি হলো রহমত, সহানুভূতি ও প্রজ্ঞা।
শাসনের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো- সব শিশু একই মানসিকতা ও বোধবুদ্ধির অধিকারী নয়। কেউ সহজে উপদেশ গ্রহণ করে, আবার কেউ বারবার অবহেলা করে। তাই শুধু স্নেহ দিয়েই সবসময় কাজ হয় না। এ কারণেই শরীয়ত প্রয়োজনে শাসনের অনুমতি দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে সংশোধনের জন্য কঠোরতার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে সেই কঠোরতা কখনোই সীমালঙ্ঘন বা নির্যাতনের পর্যায়ে নয়।
শাসনের বিষয়ে হাদিসের দিকনির্দেশনা
শিশুদের শাসনের ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত হাদিসটি হলো- ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে [নামাজ আদায় না করলে] তাদের শাসন কর।’ [সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৫] এই হাদিস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। এক. শাসনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা ও উপদেশ দিতে হবে। দুই. শাসন হবে শেষ ধাপ, প্রথম ধাপ নয়। তিন. শাসনের উদ্দেশ্য হবে সংশোধন, প্রতিশোধ নয়।
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘ঘরে এমন স্থানে চাবুক ঝুলিয়ে রাখো, যেখানে পরিবারের লোকেরা দেখতে পায়। এটি তাদের জন্য শাসনের মাধ্যম।’ [তবারানী, আল-মুজামুল কাবীর] এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এখানে চাবুক ব্যবহারের নির্দেশ নয়; বরং শাসনের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলার বার্তা দেওয়াই উদ্দেশ্য।
সাহাবায়ে কেরামের আমল
ইমাম বুখারি রহিমাহুল্লাহ তাঁর সহিহ গ্রন্থে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যেখানে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর আমলের উল্লেখ রয়েছে। তিনি ইকরিমা রহিমাহুল্লাহকে কোরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার জন্য শাসনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইকরিমা রহিমাহুল্লাহ বলেন- ‘ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে কোরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমার পায়ে বেড়ি পরাতেন।’ [তাবাকাতে ইবনে সাদ] এ থেকে বোঝা যায়, সংশোধনের উদ্দেশ্যে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত শাসন সাহাবায়ে কেরামের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল।
শাসনের ক্ষেত্রে ফকীহদের শর্তাবলি
তবে ইসলাম কখনোই অবাধ শাস্তির অনুমতি দেয়নি। বরং ফকীহগণ শাসনের জন্য কঠোর কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এক. অভিভাবকের অনুমতি থাকতে হবে। দুই. উদ্দেশ্য হবে সংশোধন, রাগ বা প্রতিশোধ নয়। তিন. শরীয়তে নিষিদ্ধ কোনো পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে না। চার. রাগান্বিত অবস্থায় শাস্তি দেওয়া নিষিদ্ধ। পাঁচ. শিশুর শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করা আবশ্যক। ছয়. প্রতিষ্ঠানের নিয়মের আওতায় হতে হবে। সাত. লাঠি, চাবুক ইত্যাদি ব্যবহার নিষিদ্ধ [অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে]। আট. একসঙ্গে তিনটির বেশি আঘাত নয়। নয়. মাথা, চেহারা ও স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত নিষিদ্ধ। দশ. অসহনীয় বা ক্ষতিকর শাস্তি হারাম। এই শর্তগুলো প্রমাণ করে, ইসলামে শাসনের চেয়ে নির্যাতন প্রতিরোধই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অতিরিক্ত মারধরের কুফল
অহেতুক ও অতিরিক্ত মারধর শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে শিশু শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, মানসিকভাবে ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস হারায়, একপর্যায়ে বেহায়া ও অবাধ্য হয়ে ওঠে। ইবনে খালদুন রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘শিশুকে অতিরিক্ত মারধর করলে সে মিথ্যাবাদী ও ভীরু হয়ে ওঠে।’
শাসনের উত্তম বিকল্প পদ্ধতি
ইসলাম শাসনের পাশাপাশি বিকল্প সংশোধন পদ্ধতিও শিক্ষা দিয়েছে। এক. উপদেশ ও তিরস্কার। দুই. সাময়িক অসন্তুষ্টি প্রকাশ। তিন. দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া। চার. পুরস্কার ও উৎসাহ প্রদান। পাঁচ. শৃঙ্খলাভিত্তিক শাস্তি [দাঁড় করিয়ে রাখা, ছুটি বন্ধ ইত্যাদি]। এসব পদ্ধতি শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই শিশুকে সংশোধনে সহায়ক।
রাসুল সা.-এর আদর্শ
রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাদেম বা শিশুকে প্রহার করেননি। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো মানুষকে নিজের হাতে মারেননি।’ [সহিহ মুসলিম] এটি আমাদের জন্য সর্বোচ্চ আদর্শ।
শাসন হোক সংশোধনের জন্য
শিশুদের শাসনের প্রশ্নে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখিয়েছে। না অন্ধ কঠোরতা, না সীমাহীন ছাড়। শাসন হবে প্রয়োজনের তাগিদে, সংশোধনের উদ্দেশ্যে এবং শরীয়তের সীমার ভেতরে। আজকের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি আমরা এই ইসলামী ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তবে শিশুদের চরিত্র গঠন হবে সুন্দর, সমাজ হবে শৃঙ্খলিত এবং আগামী প্রজন্ম হবে দীনদার ও মানবিক। শাসনের মূল লক্ষ্য যেন হয় সংশোধন, আর সংশোধনের পথ যেন হয় রহমত ও প্রজ্ঞা।
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

