কওমি সিলেবাস আরও সুন্দর করে সাজানো হোক
মুহাম্মদ হেদায়ত উল্লাহ
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২৮
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কওমি মাদরাসার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় জ্ঞান সংরক্ষণ, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং সমাজে আলেম তৈরি করার ক্ষেত্রে কওমি শিক্ষা ধারার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাসে যুগোপযোগী সংযোজন এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা হলো জ্ঞান এখন বহুমাত্রিক। শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই একজন শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গভাবে সমাজে ভূমিকা রাখতে পারে না। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা আজকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যখন সমাজে বেরিয়ে আসে, তখন তাদেরও এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আধুনিক জ্ঞানের সঙ্গে অপরিচিত থাকায় নানা সীমাবদ্ধতায় পড়ছে। এই ব্যবধান কমানো জরুরি।
সিলেবাস সংস্কারের কথা বললেই অনেকের মনে আশঙ্কা তৈরি হয় যে এতে কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা নষ্ট হবে। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন মানে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাদ দেওয়া নয়, বরং তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমসাময়িক বিষয় যুক্ত করা। কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা এসবের গুরুত্ব ও প্রাধান্য তো থাকবেই, পাশাপাশি গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতি, নাগরিক শিক্ষা এবং কর্মমুখী দক্ষতাও প্রয়োজন অনুসারে যুক্ত হতে পারে।
বিশেষভাবে তথ্যপ্রযুক্তির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। বর্তমান বিশ্ব ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দাওয়াহ, গবেষণা, লেখালেখি, এমনকি ধর্মীয় ফতোয়া ও ব্যাখ্যার কাজেও এখন প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। কওমি শিক্ষার্থীরা যদি কম্পিউটার, ইন্টারনেট ব্যবহার, মৌলিক সফটওয়্যার এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা পায়, তাহলে তারা ধর্মীয় জ্ঞানকে আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে।
এ ছাড়া ভাষা শিক্ষার গুরুত্বও কম নয়। আরবি তো আছেই, পাশাপাশি শুদ্ধ বাংলা ও কার্যকর ইংরেজি জানা থাকলে কওমি শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, গবেষণামূলক লেখা প্রকাশ বা আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা করতে ভাষা একটি বড় হাতিয়ার।
সিলেবাস সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদানের পদ্ধতিতেও আধুনিকতা আনতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি বিশ্লেষণ, প্রশ্ন করা, যুক্তিভিত্তিক আলোচনা এবং গবেষণার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীদের চিন্তার পরিসর বিস্তৃত হবে এবং তারা বাস্তব সমস্যার সমাধানে দক্ষ হয়ে উঠবে।
অবশ্য এই সংস্কার একতরফাভাবে চাপিয়ে দিলে সফল হবে না। কওমি মাদরাসার প্রবীণ আলেম, মুহতামিম, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ধাপে ধাপে সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। সরকার, শিক্ষাবিদ এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে কাজ এগোলে ফলাফল ইতিবাচক হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পরিবর্তনের লক্ষ্য। লক্ষ্য যেন হয় কওমি শিক্ষার্থীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং সমাজের দায়িত্বশীল, সচেতন ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। যারা ইসলামের মৌলিক আদর্শে দৃঢ় থাকবে, আবার একই সঙ্গে দেশের উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতি ও মানবকল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, কওমি মাদরাসার সিলেবাস যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রণয়ন করা হলে তা কোনো হুমকি নয়, বরং একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী হবে এবং সমাজও পাবে এমন আলেম ও নেতৃত্ব, যারা ধর্ম ও আধুনিকতার মধ্যে সুস্থ সেতুবন্ধন তৈরি করতে সক্ষম। এখনই সময় এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
লেখক: প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ দশমিনা ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা,পটুয়াখালী, বরিশাল
বিকেপি/এমএম

