Logo

ধর্ম

নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদরাসা প্রসঙ্গ এবং কিছু প্রস্তাবনা

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:১১

নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদরাসা প্রসঙ্গ এবং কিছু প্রস্তাবনা

কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই দেয় না, বরং নৈতিক ও আদর্শবান নাগরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরি করে। এই শিক্ষা ব্যবস্থার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন; এটি দারুল উলুম দেওবন্দ (১৮৬৬) থেকে শুরু হয়নি, বরং এর ধারাবাহিকতা কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানচর্চার ১৪০০ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তী সময়ে এ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, কওমি মাদরাসার সনদ ও পাঠক্রমকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে, কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৬, ২০১৮সহ বেশ কয়েকবার স্বীকৃতির ঘোষণা এলেও তা চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সমতুল্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। এতে করে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদরাসার উন্নয়ন ও স্বীকৃতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলেও, প্রায়ক্ষেত্রে তা বিস্তারিত রূপরেখা বা বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অভাবে রয়ে গেছে। এছাড়া কওমি মাদরাসার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা রক্ষা করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে কওমি মাদরাসা প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে উল্লেখ করা হলো-

জামাতের ইশতেহার

কওমি শিক্ষা ও গবেষণা: কওমি শিক্ষা

“কাঠামো ঠিক রাখা, কওমি শিক্ষা সিলেবাস পরিমার্জন ও কওমি শিক্ষার প্রসারসহ সার্বিক উন্নতির জন্য কওমি অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বী আলেম তথা আকাবিরে আসলাফদের পরামর্শে বাস্তবায়ন করা হবে। কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও হাইয়াতুল উলইয়ার সার্টিফিকেটের যথাযথ মূল্যায়নসহ সার্বিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”

বিএনপির ইশতেহার

“কওমি সনদ স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাধা দূরীকরণ: কওমি সনদ স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে। কওমি সনদধারীদের বিদেশে (যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ) ধর্মীয় উচ্চশিক্ষালাভে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হবে।”

সরকারি চাকরির নিয়োগে অগ্রাধিকার: যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ, বিশেষত সরকারি মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সেনা বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক কাম ইমাম, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সার্টিফিকেটধারীদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

হাফেজে কোরআনদের সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সকল হাফেজে কোরআন, কারী এবং আলেম কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখবেন, তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতির কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

নতুনকুঁড়ি কোরআন তেলাওয়াত প্রবর্তন: নতুনকুঁড়ি কোরআন তেলাওয়াত প্রবর্তন করা হবে।

নি¤œলিখিত প্রস্তাবনাগুলো কওমি মাদরাসার উন্নয়ন ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে:

১. আইনি স্বীকৃতি ও সমতা: কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) ও অন্যান্য স্তরের সনদকে সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বিসিএসসহ সকল ক্যাডারে প্রবেশের উপযোগী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। একই সাথে ধর্মীয় পদ (কাজী, ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষক) নিয়োগে এই সনদকে প্রাধান্য দেওয়া।

২. উচ্চশিক্ষার সুযোগ: কওমি মাদরাসার সনদধারীদের জন্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (ইসলামিক স্টাডিজ, আরবি, আইন ইত্যাদি) উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত করা। এছাড়া বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

৩. শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে সংলাপ: কওমি মাদরাসার শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী ও প্রাসঙ্গিক করার জন্য একটি বিশেষ শিক্ষা কমিশন গঠন করা, যেখানে কওমি মাদরাসার অভিজ্ঞ আলেম ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করা হবে। লক্ষ্য হবে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাদান। এক্ষেত্রে এই কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন কওমি মাদরাসার সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদগন প্রয়োজনে সাধারণ শিক্ষার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সমন্বয় করা হবে।

৪. শিক্ষকের মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা: কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের সরকারি বেতন কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা। এছাড়া দেশের মসজিদ, প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্কুল ও আলিয়া মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা। 

৫. অবকাঠামো ও আর্থিক সহায়তা: কওমি মাদরাসার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রন্থাগার ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিতে সরকারি অনুদান ও সহযোগিতা দেওয়া, তবে যেন তাদের স্বায়ত্তশাসন ও স্বকীয়তায় হস্তক্ষেপ না হয়।

৬. সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার: কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। এ শিক্ষা ব্যবস্থাকে “হাজার বছরের ঐতিহ্য” হিসেবে মূল্যায়ন করে এর প্রতি ন্যায়বিচার ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা।

৭. স্বতন্ত্রতা রক্ষা: সকল সংস্কার বা উন্নয়ন পরিকল্পনা কওমি মাদরাসার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই করা উচিত। সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ নয়, বরং সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।

কওমি মাদরাসা ইসলামি শিক্ষা ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। এটির যথাযথ স্বীকৃতি ও উন্নয়ন কেবল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, বরং সমগ্র জাতির নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, সকল রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদরাসার উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করবে।

নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদরাসার উল্লেখ থাকুক বা না থাকুক এদেশের ওলামায়ে কেরাম যুগ যুগ থেকে দ্বীনি ইলেমের সেবা করে যাচ্ছেন। সরকারি স্বীকৃতি থাকো অথবা না থাকুক তাদের আন্তরিকতার এবং একনিষ্ঠতার কোন কমতি নেই। ইশতেহারে উল্লেখ করে কওমি মাদরাসাগুলোকে আলিয়া মাদরাসার মত না বানানো উচিত সুতরাং পরিমার্জন ও সংস্কারের কথা বলে  সরকারি কোনো হস্তক্ষেপ ওলামায়ে কেরাম মেনে নেবে না। 

পক্ষান্তরে নানা আশ্বাস দিয়ে কবি মাদরাসাকে একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করাও কারোর পক্ষে উচিত হবে না। উলামায়ে কেরাম যেন কারোর মিথ্যা আশ্বাসে অথবা বাস্তববাদ যোগ্য নয় এমন প্রতিশ্রæতিতে আশাবাদী না হন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অস সহযোগিতা না থাকলেও ওলামায়ে কেরাম তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেই যাবেন এবং অতীত থেকে তারা করে আসছেন। 

কওমি মাদরাসার যারা দায়িত্বে রয়েছেন এবং যারা নেতৃত্ব দেন নবীন প্রজন্মকে এবং আধুনিক প্রজন্মের উলামায়ে কেরাম এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার এবং দেশ-বিদেশের পড়ালেখার ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এর সমাধান এগিয়ে আসবেন এই প্রত্যাশা। 

লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

বিকেপি /এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর