আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। এটাই আমাদের আত্মপরিচয়। আর আমরা একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই ইবাদত করি। কালিমা নামাজ রোজা হজ ও জাকাত - এই পাঁচটি হচ্ছে ইসলামের মূল ভিত্তি। এই পাঁচটি হলো ইসলামের মূল ফাউন্ডেশন। কিন্তু শত আফসোস এবং পরিতাপের সংবাদ হচ্ছে যে, আমরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করি বটে। তবে আমরা সবাই কী ইসলাম বিষয়ে সচেতন? মৌলিক এ বিষয়গুলো সবারই কী জানা আছে? এর উত্তর যদি হয়, না। তবে প্রত্যেকেই আমরা নিজেদেরকে আগে প্রশ্ন করি, আমরা কেমন মুসলমান?
আমি নিজেকে শুধু একটি প্রশ্ন করি, আমি কী ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি? কিংবা এমন কোনো চেষ্টা আছে কী আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে, আমরা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করব? সন্তানদেরকেও ইসলাম বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেব। অন্তত মসজিদ ভিত্তিক মকতবে- প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা'র জন্য সন্তানকে পাঠাব। আর যদি আমাদের মধ্যে সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ থাকে, তবে শতকরা কত ভাগ লোক আমরা আমাদের সন্তানকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ করে দিচ্ছি। কিংবা এ ব্যাপারে একটু ভাবছি! আর নিজেরাই ইসলাম সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করছি? বা চেষ্টা করি। বিষয়টি নিয়ে কখনো ভেবেছেন কী?
সম্প্রতি একটি জরিপে স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে একটি তথ্য উঠে এসেছে যে, তাদের একজন শিক্ষার্থীও পূর্ণ‘কালিমা তায়্যিবা’ তথা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলতে পারেনি। অথচ হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শিশুদের সর্বপ্রথম কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শেখাও। -শুআবুল ঈমান
হ্যাঁ, ভাই। এই হলো আমাদের বর্তমান সময়ের অবস্থা। তবে আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের কী হবে? বর্তমানের চিত্র যদি এই হয়। অথচ স্কুলের পাঠ্যবইতেও ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ নামে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। নির্ধারিত ধর্মীয় শিক্ষকও আছেন। এরপরও যদি আমাদের শিশুরা কালিমা তায়্যিবাও বলতে না পারে; কিংবা না জানে। তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে?
তারা কী ইসলামের গন্ডিতে থাকতে পারবে? না কি হারিয়ে যাবে অন্য কোনো তন্ত্র মন্ত্রের যাদুতে? এখনো সময় আছে, আমাদের সন্তানকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়ার। কালিমা নামাজ রোজা হজ জাকাত সম্পর্কে শিক্ষা দেবার এখনই সময়। অজু গোসলের ফরজ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন, বিশুদ্ধ কোরআন পাঠের শিক্ষা। সঙ্গে প্রয়োজনীয় দুআ-মাসআলা ইত্যাদি বাচ্চাদেরকে শেখানো আমাদেরই দায়িত্ব। এটি আমাদের কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, সন্তানাদি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য আমানত স্বরূপ। যার যথেষ্ট হেফাজত ও সঠিক পরিচর্যা করা প্রত্যেকটি মা বাবার দায়িত্ব। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি তাঁর কিতাব 'মারাকিউয যুলাফা’য় লিখেছেন, সন্তান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য আমানত।
ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও কালিমার মেহনত এবং দাওয়াত এখন শুধু বড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবে না। বরং এগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের মাঝে। নয়ত চেচনিয়া বসনিয়া ও চীনের মতো এমন এক অদ্ভুত জাতি গোষ্ঠীর আবির্ভাব হবে, যারা ইসলামের শিক্ষা তো দূরে থাক। ইসলাম কী তাই জানবে না। বলতে পারবে না, কালিমা নামাজ রোজা হজ জাকাত প্রভৃতি ইবাদতের পরিচয়ও।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন - হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো এবং তোমাদের পরিবার পরিজন তথা সন্তানদেরকেও বাঁচাও। (জাহান্নামের আগুন থেকে।) -সুরা তাহরিম : ০৬
এটি হচ্ছে, প্রতিটি অভিভাবকের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে উন্মুক্ত বার্তা। যাতে রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সম্পর্কে সঠিক দিক-নির্দেশনা। প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারি)
একজন আদর্শ পিতা হজরত লোকমান হাকিমের কথা এসেছে কোরআনে। তিনি তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়েছেন। যা আল্লাহ তায়ালা কোরআনে উল্লেখ করেছেন এভাবে, আর যখন হজরত লোকমান তাঁর পুত্রকে বললেন, হে আমার পুত্র! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক একটি বড় জুলুম- অন্যায়। -সুরা লোকমান : ১৩
একইভাবে হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোনো বাবা তার সন্তানকে আদবের চেয়ে উত্তম কিছু দান করতে পারে না।’-সহিহ বুখারি
বাইহাকির বর্ণনায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তোমরা সন্তানদেরকে উত্তম শিক্ষা ও আদব শেখাও।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে পরিস্কার বুঝে আসছে যে, একজন পিতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, তাঁর সন্তানকে তাওহিদ শিক্ষা দেওয়া। কুফর তথা, আল্লাহর আনুগত্যের অস্বীকার যাবতীয় কাজ থেকে বিরত রাখা ইত্যাদি।
এ ছাড়াও আমাদের প্রতিটি মাদরাসা এবং তার দায়িত্বশীলগণ, মসজিদের সম্মানীত ইমাম ও খতিব, আলিম, দাঈ ও বক্তাগণ- প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকা ও সীমানায় সাধ্যমতো নিজেদের মসজিদ মাদরাসাসহ এক একটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও কালিমার মেহনত শুরু করা উচিত। আমরা যদি এখনো এই মেহনত শুরু না করতে পারি। তবে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কালিমা বলা তো পরের কথা। এরা ইসলামের সঠিক পরিচয়ও পাবে না। জানবে না ইসলাম কী? এজন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কালিমার মেহনত তথা ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এই কাজে অংশ গ্রহণের তাওফিক দান করুন।
লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

