Logo

ধর্ম

নবীজির দোয়াপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান সাহাবি

Icon

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৬

নবীজির দোয়াপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান সাহাবি

নবী কারিম (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনার পথে হিজরত আরম্ভ করেন, তখন থেকেই মদিনার অধিবাসীরা প্রতিদিন শহরের শেষপ্রান্তে এসে অপেক্ষা করতেন, যেন তাঁরা মহানবী (সা.)-কে পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে মদিনায় নিয়ে যেতে পারেন। অপেক্ষা করতে করতে দিনশেষে যখন দেখতেন, আজকেও আল্লাহর রাসুল (সা.) আসেননি, বিষণ্ন মনে সবাই যে যার বাড়ি ফিরে যেতেন। 

নবীজির আগমন: এভাবে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষে যেদিন মহানবী আগমন করলেন, মদিনায় যেন সেদিন ইদের আমেজ শুরু হয়ে গেল। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তাঁর সৌন্দর্যে পুরো মদিনা আলোকিত হয়ে উঠল।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬১৮)

নবীজিকে স্বাগত জানাতে সব জায়গায় কৌতুহলী মানুষের ভিড় ছিল। বৃদ্ধ, যুবক, তরুণ, কিশোর সবাই সেদিন বলে উঠেছিলেন, ‘আল্লাহু আকবার, রাসুলুল্লাহ (সা.) এসেছেন। আল্লাহু আকবার, মুহাম্মদ (সা.) ইয়াসরিবে এসেছেন। আল্লাহু আকবার, আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের শহরে আগমন করেছেন।’

হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) তখন অল্প বয়সী শিশু। তিনি বলেন, ‘আমি নবীজি (সা.)-এর আগমনে মদিনাবাসীকে যেভাবে খুশি হতে দেখেছিলাম, অন্যকিছুতে তাঁদের এভাবে খুশি হতে দেখিনি।’

নবীজির শানে কবিতা: মদিনার আনসারগণ নবীজি (সা.)-এর আগমনে তাকবির ধ্বনি দিচ্ছিলেন। তাঁদের দেখে মনে হচ্ছিল, এর থেকে আনন্দের মুহূর্ত তাঁদের জীবনে আর কখনো আসেনি। মদিনার শিশুরা সেদিন হেলেদুলে এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছিল, ‘তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন সানিয়্যাতিল ওয়াদা; ওয়াজাবাশ শুকরো আলাইনা, মাদাআ লিল্লাহিৃ।’ কবিতাটির অর্থ হলো, ‘ওয়াদা উপত্যকা থেকে পূর্ণিমার চাঁদ (নবীজি) আমাদের ওপর উদিত হয়েছে। যতদিন আল্লাহ তাআলাকে ডাকার মতো কেউ জীবিত থাকবে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। হে আমাদের মাঝে প্রেরিত নবী! আপনি এমন এক নির্দেশ নিয়ে এসেছেন, যা মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য। আপনি এসে মদিনাকে মর্যাদাবান করেছেন। স্বাগতম হে সর্বশ্রেষ্ঠ আহ্বানকারী!’

আনসারি যুবক সাহাবি: আনসারি এক যুবক হজরত তালহা ইবনে বারা (রা.) সেদিন রাসুলের খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। নবীজি (সা.)-এর হাতে পরম আবেগে চুমু খেয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনার যা ইচ্ছা হয়, আমাকে আদেশ করুন। আপনার কোনো আদেশ আমি কখনো লঙ্ঘন করব না।’

নবী কারিম (সা.) তাঁর কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন, ‘যা বলি তার সব করতে পারবে?’ অতঃপর দয়ার নবী পরীক্ষা স্বরূপ বললেন, ‘যাও! তোমার বাবা ‘বারা’কে হত্যা করে এসো।’

রাসুলের মুখ থেকে আদেশ বের হওয়ামাত্র তিনি নিজের বাবাকে হত্যা করতে রওনা হয়ে গেলেন। নবীজি (সা.) তখন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ্ তাআলা আমাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পাঠিয়েছেন, ছিন্ন করতে নয়।’ 

কিছুদিন পর আল্লাহর রাসুলের এই আশেক সাহাবি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো। তিনি আউফ গোত্রের একটা মহল্লায় থাকতেন। যা মদিনা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

মহানবী (সা.) তাঁকে দেখতে গেলেন। দেখার পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের লোকদের ডেকে বললেন, ‘মৃত্যুর ছাপ তাঁর চেহারায় স্পষ্ট। হয়তো সে আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না। তাঁর ইন্তিকাল হলে আমাকে খবর দেবে, যেন আমি কাফন দাফন ও জানাজায় উপস্থিত হতে পারি। কাফন দাফনের কাজ দ্রুত করতে হবে। কারণ কোনো মুসলমানের লাশ বিলম্বে দাফন করা অনুচিৎ।’

নবীজির প্রতি মহব্বত: নির্দেশনা শেষে আল্লাহর রাসুল মদিনায় ফিরে এলেন। দিন ফুরিয়ে রাত শুরু হলো। হজরত তালহা (রা.)-এর অবস্থাও ক্রমেই খারাপ হতে লাগল। তিনি তখন লোকদের ডেকে বললেন, ‘শোনো, আমি হয়তো রাতেই ইন্তিকাল করব। আমার ইন্তিকালের পর তোমরাই আমার জানাজা পড়ে দাফন করে দেবে। রাসুলকে কোনোভাবেই খবর দেবে না। কারণ এখান থেকে মদিনার দূরত্ব তিন কিলোমিটার। মাঝখানে ইহুদিদের বসতি রয়েছে, যারা সবসময় আল্লাহর রাসুলের ক্ষতি করার সুযোগ খোঁজে। এত রাতে আল্লাহর রাসুল মদিনা থেকে বের হলে তারা তাঁকে কষ্ট দিতে পারে। আমি চাই না, আমার কারণে আল্লাহর রাসুল কোনো কষ্ট পান।’

লোকেরা কথা অনুযায়ী কাজ করল। রাতে দাফন কার্য সম্পাদন করে সকালে আল্লাহর রাসুলের খেদমতে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলল। 

নবীজির অনন্য দোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে তাঁর কবরের সামনে এলেন। সাহাবিরা সবাই তাঁর পেছনে দাঁড়ানো। তিনি দোয়ার জন্য হাত তুললেন। এমন এক দোয়া করলেন, যা দুনিয়াতে আর কারো জন্য করা হয়নি। মহানবী (সা.) দোয়ায় বললেন, ‘প্রভু হে! তোমার আর তালহার মোলাকাত হোক পরস্পর হাসিমুখে।’

খোশ কিসমত তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহুর। এটাই তো একজন খাঁটি আশেকে রাসুলের পুরস্কার। (ফাতহুল বারি: ৩/১৪২)

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

বিকেপি /এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর