মানুষের চরিত্র গঠনে সত্যবাদিতা একটি মৌলিক গুণ। সত্য মানুষের জীবনকে আলোকিত করে, সমাজে আস্থা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করে। এর বিপরীতে মিথ্যা মানুষের চরিত্রকে কলুষিত করে, সমাজে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে। ইসলামে মিথ্যা বলা শুধু একটি দোষ নয়; বরং এটি একটি মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত। কোরআন ও হাদিসে মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
মিথ্যার সংজ্ঞা ও প্রকৃতি
মিথ্যা হলো জেনেশুনে সত্যের বিপরীত কথা বলা বা বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা। কেউ নিজের স্বার্থে, ভয় থেকে, লোভে বা অন্যকে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে যখন সত্য গোপন করে বা অসত্য বলে, তখন সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নয়; কাজ, সাক্ষ্য, প্রতিশ্রæতি ভঙ্গ এবং ভ্রান্ত তথ্য ছড়ানোও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।
কোরআনের দৃষ্টিতে মিথ্যা
পবিত্র কোরআনে মিথ্যাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হিদায়াত দেন না।’ [সুরা যুমার : ৩৯/৩] এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মিথ্যাবাদী ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হয়। হিদায়াতহীন জীবন মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন- ‘মিথ্যা রচনা করে তারাই, যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না; আর তারাই হলো প্রকৃত মিথ্যাবাদী।’ [সুরা নাহল : ১৬/১০৫] এখানে মিথ্যাকে ঈমানহীনতার একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিয়মিত মিথ্যা বলা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয় এবং ধীরে ধীরে তাকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
মিথ্যা ও জুলুমের সম্পর্ক
মিথ্যা প্রায়ই জুলুমের জন্ম দেয়। মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষ শাস্তি পায়, অপরাধী মুক্তি পায় এবং সমাজে ন্যায়বিচার ভেঙে পড়ে। কোরআনে মিথ্যা সাক্ষ্যকে বড় গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘তোমরা মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে দূরে থাকো।’ [সুরা হজ : ২২/৩০] এই নির্দেশ শুধু আদালতের জন্য নয়; বরং পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
হাদিসে মিথ্যার ভয়াবহতা
রাসুলুল্লাহ সা. মিথ্যা সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন- ‘নিশ্চয়ই সত্য নেকির পথে পরিচালিত করে, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়...। আর মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এই হাদিসে সত্য ও মিথ্যার পরিণতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সত্যবাদিতা মানুষের জন্য জান্নাতের পথ খুলে দেয়, আর মিথ্যা তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।
আরেক হাদিসে রাসুল সা. বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি। কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।’ [সহিহ বুখারি] এখানে মিথ্যাকে মুনাফিকির প্রধান লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর।
মিথ্যার সামাজিক ক্ষতি
মিথ্যা শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। যখন সমাজে মিথ্যা ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষের মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট হয়। পরিবারে অশান্তি, ব্যবসায় প্রতারণা, রাজনীতিতে দুর্নীতি-সবকিছুর মূলে রয়েছে মিথ্যা। মিথ্যার কারণে সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সত্যবাদিতার মর্যাদা
মিথ্যার বিপরীতে সত্যবাদিতাকে ইসলাম সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ [সুরা তাওবা : ৯/১১৯] রাসুলুল্লাহ সা. নিজে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যবাদী। নবুওয়াতের আগেও তিনি ‘আল-আমিন’ [বিশ্বস্ত] নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা ছিল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মিথ্যা থেকে বাঁচার উপায়
মিথ্যা থেকে বাঁচতে হলে প্রথমে আল্লাহভীতি অর্জন করতে হবে। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, হাদিস অধ্যয়ন এবং আত্মসমালোচনা মানুষকে সত্যের পথে দৃঢ় রাখে। কথা বলার আগে চিন্তা করা, অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা এবং ভুল হলে তা স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তোলাও মিথ্যা থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়।
আখিরাতের মুক্তি
মিথ্যা বলা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি মহাপাপ, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব স্তরে ধ্বংস ডেকে আনে। কোরআন ও হাদিসে মিথ্যার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা এবং সত্যবাদিতার প্রতি জোরালো আহ্বান রয়েছে। একজন প্রকৃত মুসলমানের কর্তব্য হলো সব অবস্থায় সত্যের পথে অবিচল থাকা, যত কঠিনই হোক না কেন। সত্যের পথেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, দুনিয়ার শান্তি এবং আখিরাতের মুক্তি।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

