Logo

ধর্ম

আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

সৎ ও যোগ্য লোককে ভোট দিন

Icon

ইমরান নাজির

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:১৮

সৎ ও যোগ্য লোককে ভোট দিন

আজ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জুলাই বিপ্লবোত্তর প্রথম বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

নির্বাচন তথা ভোট মানে জনগণের রায় প্রদান। আর মুমিনের জন্য রায় প্রদান তথা ভোট হল আমানতস্বরূপ। আর আমানতের যথার্থ ব্যবহার মুমিনের জন্য ওয়াজিব। কেননা, আমানতের খেয়ানতকে হাদিসে মুনাফিকের লক্ষণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি। যথা: যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন তার নিকট আমানত রাখা হয় তখন তার খেয়ানত করে এবং যখন সে ওয়াদা করে তখন তা ভঙ্গ করে। কোরআনুল কারীমেও আমানতের খেয়ানতের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের সাথে খেয়ানত করো না এবং জেনেশুনে তোমাদের আমানতের খেয়ানত করো না।” (সূরা: আনফাল, আয়াত নম্বর: ২৭) এই আয়াতের মধ্যে আমানতের খেয়ানত না করতে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ প্রদান করেছেন।

এজন্য যার পক্ষে রায় তথা ভোট প্রদান করা হবে তার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া। তিনি ব্যক্তি হিসেবে কেমন তা আগে খতিয়ে দেখতে হবে। জেনেশুনে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ এবং অসৎ লোককে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা যাবে না।

এভাবে যথার্থরূপে নিজের আমানত রক্ষা করা এবং তার খেয়ানত থেকে বেঁচে থাকতে কোরআন ও হাদিসে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারীমের অন্যত্র আমানত আদায় সম্পর্কে বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের এ আদেশ করছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার পাওনাদারদের পৌঁছে দাও এবং যখন লোকদের মাঝে বিচার কর তখন ইনসাফের সাথে বিচার কর। আল্লাহ তোমাদের যে উপদেশ দেন, তা কতই না উত্তম! নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা: নিসা, আয়াত নম্বর: ৫৮)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী (রহ.) তাঁর লিখিত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে উসমানী’তে বলেন, “ইহুদীদের অভ্যাস ছিল আমানতের খেয়ানত করা এবং বিচার-মীমাংসায় ঘুষ ইত্যাদি নিয়ে কারো পক্ষপাতিত্ব করে সত্যের পরিপন্থী বিচার করা। এ জন্য আয়াতে মুসলমানদের এই উভয় বিষয় থেকে বারণ করা হচ্ছে।” (তাফসীরে উসমানী, সূরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য, রাহনুমা প্রকাশনী)

একইভাবে উপর্যুক্ত আয়াতে নেতৃত্ব, দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসহ সবকিছুকেই আমানত হিসেবে বোঝানো হয়েছে। তাই এক্ষেত্রেও যদি কেউ তার আমানতের যথার্থ ব্যবহার না করে, কোনো দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য কিংবা অসৎ লোককে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে তাহলে সে খেয়ানতকারী হিসেবে গণ্য হবে।

আল্লাহ তায়ালা যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব দেওয়া সম্পর্কে বলেন, “তুমি যাকে দায়িত্ব দেবে, তার মধ্যে উত্তম হল সে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” (সূরা: কাসাস, আয়াত নম্বর: ২৬)

বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেম মাওলানা তাকী উসমানী তাঁর লিখিত তাফসীরগ্রন্থ ‘তাফসীরে তাওযীহুল কোরআন’-এ এই আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, “আল্লাহ তাআলা তার এ বাক্যটি বিবৃত করে ‘কর্মচারী নিয়োগদান’ সংক্রান্ত চমৎকার মাপকাঠি দিয়ে দিয়েছেন। আমরা এর দ্বারা জানতে পারি, যে-কোনো কাজে যাকে নিয়োগ দান করা হবে, মৌলিকভাবে তার মধ্যে দু’টি গুণ থাকতে হবে। (ক) যে দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করা হবে, তা আঞ্জাম দেওয়ার মতো দৈহিক ও মানসিক শক্তি এবং (খ) আমানতদারী।” (তাওযীহুল কোরআন, সূরা কাসাসের ২৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।)

ঠিক একইভাবে নেতৃত্বের জন্যও প্রধানত দুইটি শর্ত থাকা প্রয়োজন। এক, যোগ্যতা, দুই, বিশ্বস্ততা তথা আমানতদারিতা। যার মধ্যে যোগ্যতা নেই সে জনগণের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না। পক্ষান্তরে, তার মধ্যে যদি বিশ্বস্ততা তথা আমানতদারিতা না থাকে তাহলে জনগণ এবং রাষ্ট্রের সম্পদ তার কাছে মোটেও নিরাপদ নয়। সে অবৈধভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ভক্ষণ এবং আত্মসাতে লিপ্ত হয়ে পড়বে তার মধ্যে আমানতদারিতা না থাকার দরুন। এজন্য এমন ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে যার মধ্যে রয়েছে দ্বীনদারিতা, খোদাভীতি এবং আমানতদারিতা। এই তিন গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে যদি রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে রাষ্ট্র এবং জনগণের সম্পদ থাকবে নিরাপদ। থাকবে না সম্পদ চুরি কিংবা লুট হওয়ার কোনো সমূহ আশঙ্কা। আর যদি টাকাপয়সা কিংবা কোনোকিছুর লোভে অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ এবং অসৎ লোককে ভোট দেওয়া হয় কিংবা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হয় তাহলে সেটা হবে আমানতের খেয়ানত।

আর এর পরিণতি সম্পর্কে হাদিস শরীফে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।”

এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমানত নষ্ট হয় কীভাবে? তখন তিনি বললেন, “যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হবে।” (সহীহ বুখারী)

একটি রাষ্ট্রকে খুনখারাবি এবং দুর্নীতিমুক্ত শান্তিময়, সমৃদ্ধশালী এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমত তার জনপ্রতিনিধিদেরকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং আমানতদার হতে হবে। কেননা, ন্যায়পরায়ণ এবং আমানতদার জনপ্রতিনিধি ব্যতিরেকে একটি রাষ্ট্রকে কখনো দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়। যে রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিরা অসৎ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হয় সে রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা অবাস্তব কল্পনা বৈ আর কিছুই নয়। এজন্য দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে হলে আগে দুর্নীতিমুক্ত-আমানতদার ব্যক্তিদেরকে ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। তবেই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন হবে।

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত কোনো অসৎ, অযোগ্য, প্রতারক, ধোঁকাবাজ, মুনাফেক, চাঁদাবাজ, মিথ্যাবাদী লোককে ভোট না দেওয়া। বরং সৎ, যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ ও আমানতদার ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা। যারা দেশ থেকে সব ধরণের দুর্নীতি মূলোৎপাটন করে একটি সাম্য ও শান্তির রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: imrannazir326322@gmail.com

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর