Logo

ধর্ম

আত্মশুদ্ধি, সংযম ও শারীরিক সুস্থতার সমন্বিত সাধনা

রমজানের আগমনী প্রস্তুতি

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২৩

রমজানের আগমনী প্রস্তুতি

মুসলিম উম্মাহর জীবনে আবারও ফিরে আসছে পবিত্র মাহে রমজান-রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে হিজরি ১৪৪৭ সনের রমজান। এ মাস কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নয়; বরং এটি একজন মুমিনের জীবন গঠনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। তাই রমজান শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজন সচেতন ও পরিকল্পিত শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি।

রমজান কোনো ভোগ-বিলাসের মৌসুম নয়, এটি মজুতদারি কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার সময়ও নয়। দুঃখজনকভাবে আজ অনেকেই রমজানকে বাজারমুখী ও খাদ্যকেন্দ্রিক মাসে পরিণত করেছে। অথচ রমজান হলো সংযম, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা, অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে দমন করে তাকওয়ার পথে অগ্রসর হয়। শাবান মাস মূলত রমজানের প্রস্তুতির সময়। এই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তুলনামূলক বেশি নফল রোজা রাখতেন, যেন উম্মত রমজানের কষ্ট ও শৃঙ্খলার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। শাবান আমাদের শেখায়- হঠাৎ করে নয়, ধাপে ধাপে আত্মশুদ্ধির পথে এগোতে হয়। রমজান শব্দের মূল অর্থ দহনকারী তাপ। রোজার ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মানুষের পাপ-পঙ্কিলতা জ্বালিয়ে দেয়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। যেমন আগুনে সোনা খাঁটি হয়, তেমনি রমজানের সংযমে মুমিনের ঈমান বিশুদ্ধ হয়। তাই এ মাস কেবল না খাওয়ার নাম নয়; বরং নিজের নফসকে শাসন করার এক বাস্তব প্রশিক্ষণ।

রমজানকে স্বাগত জানানোর সুন্নতি শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাস থেকেই রমজানের জন্য দোয়া করতেন-

“হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। এই দোয়া আমাদের শেখায়, রমজান পাওয়া নিশ্চিত বিষয় নয়; এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

চাঁদ দেখা সুন্নত এবং ইবাদতের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও ঈদ করা ইসলামের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলার প্রকাশ। নতুন চাঁদ দেখে দোয়া পড়ার মাধ্যমে একজন মুমিন নতুন মাসকে ঈমান, নিরাপত্তা ও কল্যাণের সঙ্গে গ্রহণ করে।

রমজানের মর্যাদা ও ফরজ রোজা

রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারা: ১৮৩) রোজা কেবল উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য নয়; আদম (আ.) থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী সব নবীর উম্মতের ওপর কোনো না কোনোভাবে রোজার বিধান ছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি সব যুগেই আল্লাহর প্রিয় ইবাদত।

রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস। কোরআন যেমন মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত পথনির্দেশ, রমজানও তেমনি মানবজীবনের নৈতিক পুনর্জাগরণের মাস। এই মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর- যে রাত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।

রোজার অনন্য প্রতিদান ও সম্মান

রোজা এমন একটি ইবাদত, যার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দেবেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে- “রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব।”

রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও প্রিয়। কারণ এটি লোক দেখানো নয়, বরং একান্ত আল্লাহর জন্য কষ্ট স্বীকারের নিদর্শন। রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি বিশেষ আনন্দ—একটি ইফতারের মুহূর্তে এবং অন্যটি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। জান্নাতে ‘রাইয়্যান’ নামে একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে। এটি রোজার মর্যাদা ও সম্মানের এক অনন্য ঘোষণা।

গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ

রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের তিন দশকে বিভক্ত। এই মাসে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার দরজা খুলে দেন। যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রোজা রাখে এবং রাতে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

শারীরিক প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

রমজানে ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। যাঁরা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম, হালকা ব্যায়াম ও মানসিক প্রশান্তি রোজা পালনে সহায়ক।

ইফতার ও সেহরিতে হালাল, পুষ্টিকর ও পরিমিত খাবার গ্রহণ করতে হবে। অতিভোজন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ইবাদতে অলসতা সৃষ্টি করে। সুন্নতি খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে শরীর ও মন উভয়ই ইবাদতের উপযোগী থাকে।

পরিশেষে বলতে চাই, রমজান আমাদের জন্য সারা জীবনের পাথেয় সংগ্রহের এক অনন্য সুযোগ। এই মাস যেন কেবল উপবাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আমাদের চরিত্র, আচরণ ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। সংযম, সততা, সহমর্মিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ- এই চার গুণ যেন রমজানের পরও আমাদের জীবনে অব্যাহত থাকে।

আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের রমজানের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করেন, রহমত-মাগফিরাত-নাজাতের কাতারে শামিল করেন এবং রোজাকে জীবনের বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার শক্তি দেন। আমিন।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

ই-মেইল: drmazed96@gmail.com

বিকেপি/ এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর