Logo

ধর্ম

ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২৯

ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

মানবজীবনের নৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ওয়াদা রক্ষা। সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়াদা পালন অপরিহার্য। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ওয়াদা রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। কোরআন ও হাদিসে ওয়াদা ভঙ্গকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং ওয়াদা রক্ষাকারীদের প্রশংসা করা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-সে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।

ওয়াদার অর্থ ও তাৎপর্য

আরবি শব্দ ‘ওয়াদা’ অর্থ প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার বা কথা দেওয়া। ইসলামের দৃষ্টিতে ওয়াদা শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; বরং এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মানুষ যখন কাউকে কোনো কথা দেয়, তখন সে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সেই কথা দেয়। তাই ওয়াদা রক্ষা করা মূলত আল্লাহর নির্দেশ পালন করার নাম।

কোরআনে ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা একাধিক স্থানে ওয়াদা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।’ [সুরা মায়েদা : ১] এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি মুমিনদের উদ্দেশে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন তাদের সকল অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে। এটি প্রমাণ করে, ওয়াদা রক্ষা ঈমানের অংশ।

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ [সুরা ইসরা : ৩৪] এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কিয়ামতের দিন মানুষের প্রতিটি ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেউ যদি ওয়াদা ভঙ্গ করে, তবে তাকে তার জবাবদিহি করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা বলো না যা তোমরা করো না। আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় যে তোমরা এমন কথা বলো যা তোমরা পালন করো না।’ [সুরা সাফ : ২-৩] এই আয়াতে ওয়াদা ভঙ্গকে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা একজন মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাদিসে ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর হাদিসে ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন- ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খিয়ানত করে।’ [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম] এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ওয়াদা ভঙ্গ করা মুনাফিকির একটি প্রধান লক্ষণ। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিয়মিত ওয়াদা ভঙ্গ করে, তার ঈমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন- ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার ঈমান নেই; আর যে ওয়াদা রক্ষা করে না, তার দ্বীন নেই।’ এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) ওয়াদা রক্ষাকে দীনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে ওয়াদা রক্ষার বাস্তব উদাহরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ওয়াদা রক্ষার জীবন্ত আদর্শ। নবুওয়তের পূর্বেও তিনি ‘আল-আমিন’ [বিশ্বাসযোগ্য] উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। শত্রুরাও তাঁর সততা ও ওয়াদা রক্ষার গুণ স্বীকার করত।

হিজরতের সময় কুরাইশরা তাঁর শত্রু হওয়া সত্ত্বেও তাদের আমানত তাঁর কাছেই রেখে যেত। রাসুল সা. হিজরতের আগে হজরত আলী রা.-কে নির্দেশ দেন যেন তিনি সকল আমানত যথাযথভাবে তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেন। এটি প্রমাণ করে, শত্রুর সঙ্গেও করা ওয়াদা ও আমানত রক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা।

সামাজিক জীবনে ওয়াদা রক্ষার প্রভাব

ওয়াদা রক্ষার মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, দাম্পত্য জীবন, রাজনীতি, নেতৃত্ব-সব ক্ষেত্রেই ওয়াদা পালন অপরিহার্য। ওয়াদা ভঙ্গ সমাজে বিশৃঙ্খলা, অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।

বর্তমান সমাজে আমরা দেখতে পাই, অনেক মানুষ কথায় কথায় প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু তা পালন করে না। এর ফলে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হচ্ছে। ইসলাম এই অবক্ষয় রোধ করতে ওয়াদা রক্ষাকে ফরজের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

ওয়াদা ভঙ্গের পরিণতি

ইসলামের দৃষ্টিতে ওয়াদা ভঙ্গ একটি বড় গুনাহ। এটি শুধু মানুষের অধিকার নষ্ট করে না; বরং আল্লাহর অসন্তোষ ডেকে আনে। কিয়ামতের দিন ওয়াদা ভঙ্গকারীরা কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন হবে। দুনিয়াতেও তারা মানুষের আস্থা হারায় এবং সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়।

সমাজ গঠনের ভিত্তি

ওয়াদা রক্ষা ইসলামের একটি মৌলিক নৈতিক শিক্ষা। এটি ঈমানের পরিচয়, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। কোরআন ও হাদিসে ওয়াদা রক্ষার প্রতি যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একজন প্রকৃত মুসলিম কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে না। তাই আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদের প্রতিটি কথা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর