মুসলিম সমাজে ইহুদি খাছলতের অনুপ্রবেশ: পরিণতি ও প্রতিকার
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:৫১
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু জাতি আছে, যাদের নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে ঘৃণা, ধিক্কার ও ধ্বংসের কালো অক্ষরে। যাদের কৃতকর্ম মানবতার জন্য এক কালো অধ্যায় রচনা করেছে। এখনও তাদের কর্ম ও চরিত্র মানুষের স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে বিভীষিকার প্রতিচ্ছবি। তাদের আচরণ, মনোভঙ্গি, এবং ব্যবহার ছিল এতটাই ধ্বংসাত্মক, যে তা কেবল তাদের নিজের জাতিকেই নয়- সমগ্র মানবসমাজকেই করেছে ক্ষতবিক্ষত।
এদেরই একটি জাতি হলো- ইহুদি জাতি। এ জাতি অগণিত নবীর পাঠানো সুমহান শিক্ষা-দীক্ষা প্রত্যাখ্যান করেছে। অবাধ্যতার জালে নিজেদের জড়িয়েছে বারবার। কেবলমাত্র গর্ব ও আত্মঅহঙ্কারের কারণে সত্যকে জেনে-বুঝে তারা প্রত্যাক্ষান করেছে, ফলে তারা পরিণত হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম এক জাতিতে। ইতিহাস তার বাঁকে বাঁকে এই নিকৃষ্ট জাতিকে ধ্বংসের ইন্ধনে পরিণত করেছে।
ওরা ছিল এক অহংকারী ও জেদি জাতি। যাদের হৃদয়ে ছিল না বিনয়। চোখে ছিল না সত্যের আলো। মূসা (আ.)-এর মতো মহান নবীর জাতি হয়েও তারা পরিণত হয় প্রবৃত্তির গোলামে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, সত্য গোপন, অন্যায়ের প্রতি পক্ষপাত, এবং অহংকার- এসব তাদের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্যের এমন রূপ পরিগ্রহ করে, যা ওদের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।
পবিত্র কোরআন ইহুদিদের এসব চরিত্রকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এক স্বচ্ছ আইনা রূপে, যেখানে প্রতিফলিত হয় অমানবিকতা, মিথ্যাচার, এবং ঈমানহীনতার কালো ছায়া। এই আয়নায় আমরা দেখি- কীভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে একের পর এক নিদর্শন লাভ করার পরও তারা অবজ্ঞা করেছে, কীভাবে তারা নিজেদেরকে “নির্বাচিত জাতি” মনে করে অন্য জাতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছে, এবং কীভাবে তারা ধর্মকে বানিয়েছে ব্যবসার পুঁজি , ঈমানকে করেছে ছলনার পাত্র।
এখানে আমরা ইহুদিদের সেই চরিত্রগত দিকগুলো পর্যালোচনা করবো, যেগুলো শুধুমাত্র অতীতে নয়- আজও বিশ্বপরিসরে নানা রূপে আবির্ভূত হচ্ছে, আর আমাদের জন্য হয়ে উঠছে এক অমূল্য শিক্ষা ও সতর্কতা। এবং এখানেই আসে এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়। আজ আমরা দেখছি, ইহুদিদের সেই গর্হিত চারিত্রিক মন্দ স্বভাবসমূহ, যেগুলোর প্রতি কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই আমাদের মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, দুনিয়াপ্রীতি, দ্বীনকে নিজেদের স্বার্থে বিকৃত করে তোলা, আল্লাহর বিধান নিয়ে অপকৌশল লিপ্ত হওয়া, এবং সত্যকে গোপন রেখে বাহ্যিক আচারে ধর্মীয়ভাব প্রদর্শন—এসব রোগ আমাদের মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে ইহুদি-চরিত্রের ছায়া হয়ে।
এই অবক্ষয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, এবং কোরআনের আয়নায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখার সাহস করা। যাতে করে আমরা শুধুমাত্র ইহুদিদের সমালোচনাই না করি, বরং তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের চরিত্র ও সমাজকে সেই নিকৃষ্ট গন্তব্য থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি। কোরআনে বর্ণিত ইহুদিদের প্রধান প্রধান খাছলতগুলো তুলে ধরা হলো।
১. শিরক
ইহুদিরা আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামত, অসংখ্য নাবীর শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করার পরও তারা সত্য থেকে সরে গিয়ে শিরকের পথে পা বাড়ায়। তারা ‘হযরত উজাইর’কে আল্লাহর পুত্র বলে দাবি করে এবং নিজেদের ধর্মগুরু-রব্বীদেরকে আল্লাহর সমান মান্য করে ইবাদতের পর্যায়ে উন্নীত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “ইহুদিরা বলে, ‘উজাইর আল্লাহর পুত্র’,...এবং তারা তাদের ধর্মগুরু ও রাব্বিদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসাবে গ্রহণ করে।” (সূরা তওবা: ৩০-৩১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ইহুদিদের ধ্বংস করুন, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে।” (সহিহ বুখারি: ৪৩৭)
দুঃখজনকভাবে সত্য যে, আজকের মুসলিম সমাজের একটি অংশেও এমন লোকদের দেখা যায়, যারা ঐ ইহুদি গোমরাহির ছায়া বহন করে। কোন স্বার্থ উদ্ধার বা কথিত সুপারিশ লাভের আশায় মাযার, ভণ্ডপীর বা অন্য কারো কবরস্থানে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। নির্ধারিত ব্যক্তির নামে নযরানা পেশ করে, এবং এমন সব কাজ করে যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ইবাদাত। কেউ কেউ আল্লাহর বিধানকে পাশ কাটিয়ে নিজের মতলববাজীর জন্য ব্যক্তিবিশেষের কথা ও মতামতকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে তা ইসলামের সাতে সাংঘর্ষিত হওয়া সত্ত্বেও- যেমনটা ইহুদিরা করত তাদের ধর্মগুরুদের সাথে।
২. নবীগণ ও সৎলোকদের বিরোধিতা
তারা তাদের রাব্বি ও ধর্মগুরুদের পূজা করত এবং তাদের নবী ও নেককারদের বিরোধিতা করত। এমনকি তারা নবীদের হত্যা পর্যন্তও করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের ওপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়েছিল। এসব এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করত এবং অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করত।” (সূরা বাকারা: ৬১)
এই পরিস্থিতি আমাদের সমাজেও বিদ্যমান। নবীগণের শিক্ষা-দীক্ষা ও সৎলোকদের বিরোধিতার এই চিত্র আমাদের সমাজে অহনির্শ প্রতিফলিত হচ্ছে। আজও যখন কেউ সত্য কথা বলে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে চায়—তখন তাকে উপহাস করা হয়। তার বিরোধিতা করা হয়। করা হয় তাকে দেশ ছাড়া। কথিত ধর্মভীরুরা অনেক সময় প্রকৃত দ্বীনদার ও আলেমদেরকে অপমান করতে উদ্ধত হয়। গীবত করে, দোষ খুঁজে এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেও পিছপা হয় না। কোন কোন গোষ্ঠীর হাতে সত্য প্রচারকারীরা আজও লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, যেভাবে ইহুদির হাতে তাদের নবী ও নেককারা হয়েছিল।
৩. জ্ঞান গোপন ও সত্য বিকৃতি
ইহুদিদের অন্যতম নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- তারা জ্ঞান গোপন করে ও সত্য বিকৃত করে। হাদিসে এসেছে, বনি ইসরাঈলকে বলা হয়েছিল, “দরজায় সিজদা অবস্থায় প্রবেশ করো এবং বলো ‘হিত্তাতুন (ক্ষমা চাই)’।” কিন্তু তারা তা বিকৃত করে বলল, “শীষের ভেতরে দানা” এবং পিছনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করল। (সহিহ বুখারি: ৩৪০৩) এবং তারা রাসুল (সা.)-এর নবুয়তের বিষয়টি গোপন রাখত। তিনি তাদের বলেছিলেন, “তোমরা তাওরাতে যা আছে, তা গোপন করেছ, যা তোমাদের মানুষের কাছে প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল।” (তাফসীর ইবনে জারীর: ৬/৩১০) আল্লাহ তাআলা বলেন, “ নবী আপনি বলুন, হে আহলে কিতাব! তাওরাত, ইনজীল এবং তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত তোমরা কোনো ভিত্তির উপর নেই।” (সূরা মায়িদা: ৬৮)
ইহুদিদের এই জঘন্য বৈশিষ্ট্যটাও আমাদের সমাজকে গ্রাস করেছে। কতক গোষ্ঠী নিজের মনোবাসনা পূরণার্থে দ্বীনের সহিহ ইলমকে গোপন করে রাখে। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অসম্পূর্ণ বিষয় প্রচার করে। মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরতে সংকোচবোধ করে। ইসলামের বিধানকে ইচ্ছেমতো বিকৃত করে মানুষের সামনে পেশ করে। কিছু লোক আলেমের মুখোশ পড়ে গোমড়াহি ও ভণ্ডামি বাজার গরম রেখেছে। বাস্তবে তারা ইলম ও মারেফাত থেকে যোজন যোজন দূরে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আদর্শকে উপেক্ষা করে তারা নিজেদের তৈরি বিকৃত মতাদর্শকেই তুলে ধরে কোরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনাগুলো আড়াল করে ফেলে।
৪. বিভক্তি
ইহুদিরা সবসময় ভিন্নমত ও দলাদলিতে লিপ্ত থাকে। বাহ্যিকভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও তাদের অন্তর ছিল বিভেদে ভরপুর। আল্লাহ বলেন, “তারা তোমাদের সাথে একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করবে না, তবে দুর্গম গ্রামে কিংবা প্রাচীরের আড়াল থেকে (যুদ্ধ করতে পারে)। কারণ, তাদের নিজেদের মধ্যেই তো শত্রুতা প্রবল। তুমি মনে করবে তারা একতাবদ্ধ, অথচ তাদের হৃদয় পরস্পর বিচ্ছিন্ন।” (সূরা হাশর: ১৪)
আমাদের সমাজেও আজ বাহ্যিকভাবে অনেককে ঐক্যবদ্ধ মনে হয়। কিন্তু অন্তরে বিভেদ, হিংসা ও দলাদলি প্রবল। একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। সুযোগ পেলেই পরস্পরে বিরোধিতায় লিপ্ত হয়, একে অপরকে অপমান করে, পিছনে ষড়যন্ত্র করে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ দ্বীনি অঙ্গনেও দলবাজি, হানাহানি, স্বার্থনির্ভর গ্রুপিং ও নেতৃত্ব-বিবাদ ক্রমাগত বাড়ছে। মুখে একতা ও উম্মাহর কথা বলা হলেও বাস্তবে হৃদয়ে রয়েছে বিচ্ছিন্নতা ও আস্থাহীনতা।
৫. ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ ভোগ
ইহুদিরা সবসময় ওদের লক্ষ্য হাসিলের জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয়- ঘুষ, প্রতারণা, হারাম উপায়ে অর্থ উপার্জন করে থাকে। আল্লাহ বলেন, “তারা মিথ্যা শোনে এবং হারাম খেতে অভ্যস্ত। যদি তারা তোমার কাছে আসে তবে তুমি ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের পছন্দ করেন।” (সূরা মায়িদা: ৪২)
আমাদের বর্তমান সমাজে লক্ষ্য হাসিল মানেই যেন হারাম পথে হাঁটা! ঘুষ, জালিয়াতি, প্রতারণা—সব কিছুতেই লিপ্ত হওয়া। ন্যায়-অন্যায় কেউ ভাবে না, কেবল টাকার জোরে সবকিছু আদায় করে নেওয়ার মানসিকতা সবার মধ্যে প্রবল। হারাম উপার্জনে কারও দ্বিধা নেই, বরং সেটাকেই বুদ্ধিমত্তা ভাবা হয়। যারা ন্যায়বিচার প্রার্থী, তারা আজ উপহাসের পাত্র। সোজা পথে চলা আজ যেন গাধামির নাম! ঈমান-আখলাকের কথা বললেই হাসাহাসি ও নাক সিটকে বলে, “এ যুগে ওসব চলে নাকি?” বরং ধোঁকা দিয়ে, ঘুষ খাইয়ে, সত্য চাপা দিয়ে কে কত দ্রুত ওপরে উঠতে পারে, তাই নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা! ন্যায়ের পথে দাঁড়ানো এখন বিপদ ডেকে আনার নাম, আর বাঁকা পথে সফল হওয়াই যেন বুদ্ধিমানের প্রমাণ! যেন হারামই হয়ে উঠেছে আজকের হালাল!
৬. মুনাফিকি
ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির পর মদীনায় কিছু ইহুদি ইসলাম গ্রহণের ভান করত, অথচ ওদের অন্তরে ছিল কপটতা। ওরা ছিল মুনাফিক। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা অন্য সাহাবাদের মতো ঈমান আনো,’ তখন তারা বলে, ‘আমরা কি নির্বোধদের মতো ঈমান আনব?’ জেনে রেখো, ওরাই তো নির্বোধ, কিন্তু ওরা তা জানে না।” (সূরা বাকারা: ১৩-১৪)
আজকাল আমাদের সমাজে অনেকেই মুখে ধর্মের নাম করে, কথা দেয় সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়ার, কিন্তু অন্তরে কপটতা আর স্বার্থপরতার গোদাম রাখা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কথিত নেতারা পর্যন্ত এমন অনেকেই আছে, যারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যের বিশ্বাসকে পুঁজি করে আপন লক্ষ্য পূরণের খেলায় মেতে উঠে। তারা ভদ্রদের মতো বিশ্বাস জাগায়, মুখে মধুর ভাষণ দেয়, কিন্তু মনের গভীরে চলে অন্য হিসাব। সত্যের পথে দাঁড়ানো তাদের পছন্দ নয়, কারণ সেটি তাদের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করে। আর এই নেফাকি ছদ্মবেশেই তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে নিয়োজিত থাকে।
৭. অন্যায়কে প্রশ্রয় দান
ইহুদিরা সমাজে অনৈতিকতা দেখে চুপ থাকে, বরং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। আল্লাহ বলেন, “বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল, তাদেরকে দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাধ্যমে অভিসম্পাত করা হয়েছে। কারণ তারা অমান্য করত ও সীমালঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে অন্যায় থেকে নিষেধ করত না।” (সূরা মায়িদা: ৭৮-৭৯)
আমাদের আজকের সমাজেও ইহুদিদের এই বৈশিষ্ট্যের এক ভয়ঙ্কর চিত্র প্রকাশমান।
সমাজে রাজত্ব করছে মিথ্যা। দুর্নীতি শিকড় গেড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। “স্বাধীনতা”-র নামে জেঁকে বসেছে অশ্লীলতা ও নগ্নতা। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ কয়জন? কতজন দাঁড়িয়ে বলে, “এটা হারাম, এটা অন্যায়, এটা অমানবিক”?
অনেকেই এদের সাতে শুধু নিজের দুনিয়া ঘুচাতে সঙ্গে আপস করে চলে। অন্যায়কারীর পাশে দাঁড়ায়, কখনো সুবিধা নেয়, কখনো চুপ থেকে সম্মতি দেয়। অথচ এটা সবার জানা কথা, অন্যায়ের সমর্থন দেয়াও চরম অন্যায়। বাস্তবে, এরা শুধু কাপুরুষই নয়- এরা সেই বোবা শয়তানের অভিশপ্ত দল, যাদের উপর আল্লাহর লানত নাযিল হয়েছিল। আর এই লানত শুরু হয় আত্মিক পচন দিয়ে, শেষ হয় জাতিগত ধ্বংসের মাধ্যমে।
৮. জ্ঞানকে কাজে না লাগানো
ইহুদিরা শুধু মাত্র নিজেদের অবৈধ স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে ওহীর জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও তা অনুসরণ করত না। আল্লাহ বলেন, “যারা তাওরাত বহন করেছিল, কিন্তু তা পালন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হলো সেই গাধার মতো, যে কিতাব-পত্র বহন করে থাকে (কিন্তু তা তার কোন কাজে আসে না) ” (সূরা জুমু‘আ: ৫)
৯. বিদ্বেষ ও ঘৃণা
ইহুদিদের হৃদয় ও মন যেন বিদ্বেষ ও ঘৃণার উপাদানে তৈরি। তারা এমন কোনো কিছুকেই সহ্য করতে পারে না, যা তাদের জাতির বাইরের। মুসলিমদের উন্নতি ও অগ্রগতি তো ওদের চোখের কাঁটা। ওরা চায় মুসলিম জাতি চিরকাল অবহেলার অতল গহ্বরে ডুবে থাকুক। জ্ঞান-বিজ্ঞান, নেতৃত্ব-শক্তি, ও আত্মমর্যাদায় যেন কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। মুসলমানদের উন্নতির প্রতিটি সিঁড়িকে ওরা সন্দেহের চোখে দেখে। প্রতিটি সাফল্যের পিছনে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতে। মুসলামানদের ঈমানকে ওরা গিলে খেতে চায়। ধ্বংস করতে চায় মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। কোরআনে ভাষায় “বহু আহলে কিতাব চায়, যাতে তোমরা ঈমান আনার পর কুফরে ফিরে যাও। আর তা কেবল হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে।” (সূরা বাকারা: ১০৯)
১০. অহংকার ও আত্মপ্রশংসা
প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদিরা অতিরিক্ত আত্মগর্ব ও দম্ভে ভুগে আসছে। তারা নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চতর মনে করে। তারা দাবি করে যে, তারাই “আল্লাহর নির্বাচিত জাতি” এবং জান্নাত কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত। ওরা বলে বেড়ানো যে, কেবল ওদের ধর্মই সঠিক, বাকি সব গোমরাহি। আল্লাহ তাআলা বলেন: “ওরা (ইহুদিরা) বলে, ‘জান্নাতে প্রবেশ করবে না কেউ, কিন্তু সে যদি ইহুদি বা খ্রিষ্টান হয় (তাহলেই কেবল জান্নাতে যাবে)।’ এ হলো তাদের কল্পনা মাত্র। নবী আপনি বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে এই ব্যাপারে তোমাদের প্রমাণ উপস্থাপন কর।” (সূরা বাকারা: ১১১) এই আত্মগর্ব ও ঔদ্ধত্য তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিও প্রদর্শন করেছিল। ইবনে আব্বাস (রাযি.) বর্ণনা করেন, নুমান বিন আদা, বাহরী বিন আমর ও শাস বিন আদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এল এবং তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন, আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখালেন। তখন তারা বলল, “হে মুহাম্মদ! তুমি আমাদের কী ভয় দেখাও? আমরা তো আল্লাহর সন্তান ও প্রিয়জন।” (যেমনটা খৃষ্টানরা বলে)। তখন আল্লাহ ওহী নাযিল করে বলেন, “ইহুদি ও খৃষ্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর সন্তান ও প্রিয়জন।’ হে মুহাম্মদ তুমি বলো, তাহলে কেন আল্লাহ তোমাদের গুনাহের কারণে শাস্তি দিচ্ছেন? না, তোমরা তো তাঁর সৃষ্টি মানব সম্প্রদায় মাত্র। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আর আকাশসমূহ ও পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর, এবং তাঁর দিকেই সব কিছু প্রত্যাবর্তন করবে।” (সূরা মায়িদা: ১৮)
ইহুদিদের এই আত্মগর্ব ও ঔদ্ধত্যের প্রতিফলন আমাদের সমাজে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কোন খান্দানে জন্ম নেওয়াকে অনেকেই নাজাতের মাধ্যম মনে করে বসে আসে। ভ্রান্ত ও বিপথগামী হওয়া স্বত্ত্বেও দলবাজী ও গোষ্ঠীবাজী করে সত্যপন্থীদেরকে গোমরাহ বলে এবং নিজেদেরকেই একমাত্র হক মনে করে। কেউ দাওয়াত দিলে তাকে উপহাস করে ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে। গ্রহণ করার বদলে সত্যকে ঠাট্ট বিদ্রুপের ক্ষেত্র বানায়। আকন্ঠ পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত থেকে ভাবতে থাকে “আমরা তো আল্লাহর প্রিয় বান্দা”- এটাই আত্মপ্রবঞ্চনা, এটাই ইহুদি স্বভাব।
১১. কৃপণতা
ইহুদিদের একটি পুরোনো বৈশিষ্ট্য হলো অর্থ-সম্পদে কৃপণতা। ওরা নিজেরাও দান-খয়রাতে অংশগ্রহণ করে না এবং অন্যকেও দান করতে নিরুৎসাহিত করে। আনসারদেরকে ওরা বলত, “তোমরা তোমাদের অর্থ ব্যয় কোরো না, এতে তোমাদের দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।” “তোমরা দ্রুত দান করো না, কে জানে ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে!” এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা কৃপণতা করে এবং অন্যদের কৃপণতা করতে বলে, এবং আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তা গোপন করে, তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা নিসা: ৩৭) আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, “তারা যদি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনত এবং আল্লাহ তাআলা তাদের যা রিযিক হিসেবে দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করত- তাদের কী ক্ষতি হতো? আল্লাহ তাদের সম্পর্কে সবকিছুই জানেন।” (সূরা নিসা: ৩৯)
মুসলিম সমাজেও ইহুদিদের এই কৃপণতার প্রভাব লক্ষ করা যায়। অনেকেই দান-সদকা, জাকাত ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে অনিচ্ছুক। তারা নিজেরা দান করে না, আবার অন্যকেও নিরুৎসাহিত করে বলে, “সময় খারাপ”, “নিজের ভবিষ্যৎ আগে দেখতে হবে।” এই মানসিকতা ঈমানদারের নয়; বরং এটি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত অস্বীকার এবং পরকালের বিশ্বাসে দুর্বলতারই প্রতিফলন। ঠিক যেমন ইহুদিরা করত, তেমনিভাবে আজও অনেকে সম্পদ আঁকড়ে ধরে আছে, অথচ দরিদ্র প্রতিবেশী না খেয়ে দিন কাটায়।
১২. একগুঁয়েমি ও হঠকারিতা
রাসুল (সা.)-এর নবুওয়তের ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলিল ও প্রমাণ তাদের কাছে বিদ্যমাণ থাকা সত্ত্বেও। কেবল একগুঁয়েমি, হটকারিতা ও জেদের কারণে তারা ঈমান আনতে অস্বীকার করেছে। আর এই একগুঁয়েমির কারণে মানুষ প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়, ফলে হক গ্রহণের সৌভাগ্য তার কাপালে জুটে না। কোরআনের ভাষায়, “আর যদি তুমি (হে মুহাম্মদ) (সা.) আহলে কিতাবদের নিকট প্রত্যেক নিদর্শনই পেশ করো, তবুও তারা তোমার কিবলা অনুসরণ করবে না। আর তুমিও তাদের কিবলা অনুসরণ করবে না। এমনকি তারা নিজেরাও একে অন্যের কিবলা অনুসরণ করে না...। (সূরা বাকারা: ১৪৫)
বর্তমান সমাজে অনেকেই নবুওয়াত ও রিসালাতের স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সত্যকে অস্বীকার করে একগুঁয়েমি ও জেদের কাছে মাথা নোয়ায়। তারা ইসলামের বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানায়। এটাকেই নিজেদের অগ্রগতির সোপান মনে করে। এই মনস্তত্ত্বের কারণে ওরা হক গ্রহণের সৌভাগ্য থেকে দূরে থাকে, ফলে তারা আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায় এবং সঠিক পথ অনুসরণের সুযোগ হারিয়ে ফেলে।
মোদ্দাকথা: ইহুদিরা যখন আল্লাহর বিধান, নবীদের দাওয়াত ও তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বকে অবহেলা করে অহংকার, কৃপণতা, সত্য গোপন, অন্যায়ের প্রশ্রয় ও আত্মম্ভরিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের ওপর অনবরত নেমে আসে আল্লাহর আযাব। নেতৃত্ব থেকে তারা ছিটকে পড়েছে, জাতিগতভাবে হয়েছে অপমানিত, বঞ্চিত হয়েছে আল্লাহর রহমত থেকে। ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়েছে বর্বর, পিশাচ, হিংস্র, রক্তখেকু হায়েনার মত লাঞ্ছিত একটা জাতি হিসেবে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের মুসলিম সমাজেও ইহুদিদের মন্দবৈশিষ্ট্যগুলো খুব যতেœর সাথে চর্চিত হচ্ছে। কেউ কেউ তো এগুলো র্চাচা করাকে উন্নতি ও অগ্রগতির স্তম্ভ ঠাওরাচ্ছে। সত্য ও সত্যবাদিতাকে বানানো হচ্ছে সেকেলে ও পশ্চাদপসরণের কারণ। দাওয়াত ও নসিহাকে দেখা হচ্ছে দুস্থ ও দরিদ্রদের কর্ম রূপে। দান-সদকাকে তুলনা করতে চান্দা ও জুলুমী টেক্স-এর সাথে। দল ও গোষ্ঠীর তাপ-প্রতাপে আশপাশের জনসাধারণের জীবন উষ্ঠাগত হয়ে যাচ্ছে। অন্যায়কে ন্যায় এবং ন্যায়কে অন্যায় বানিয়ে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, আদল-ইনসাফকে নিক্ষেপ করেছে এক জুলুমে ভরপুর ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে।
গোটা জাতি আজ জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখে কুলুক এটে রাখাকে নিজেদের অবশ্য কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। অথচ যে জাতি আল্লাহর আদেশ অমান্য করে, অন্যায়কে দেখে চুপ থাকে। সত্যের পথে চলা মানুষদের হেয় করে এবং স্বার্থের জন্য দ্বীনকে জবাই করে দেয়- সে জাতিও ইহুদিদের মতোই আল্লাহর গজবের উপযুক্ত হয়ে পড়ে।
আজ মুসলমানরা নেতৃত্বহীন, বিভক্ত, লাঞ্ছিত ও দুর্বল। দুনিয়াব্যাপী অপমান, নির্যাতন, রক্তপাত ও রাজনৈতিক দুর্বলতায় পর্যুদস্ত- যার মাধ্যমে সূর্যের মত দেদীপ্যমান হয়ে পড়েছে যে, ইহুদিদের উপর ধ্বসে পড়া আযাবের পূর্বাভাস এখন মুসলমানদের অভিমুখী। মুসলমানদের জন্য এটা আল্লাহর তরফ থেকে পূর্ব সতর্কতা।
যদি মুসলমানেরা নিজেদের সংশোধন না করে, যদি এই মন্দ বৈশিষ্ট্যসমূহ দূর না করে- তাহলে ইহুদিদের মতোই তাদের ইতিহাসও হবে পতন, লাঞ্ছনা আর আযাবের ইতিহাস। তাই আল্লাহর পথে ফিরে আসা ছাড়া মুসলিমদের কোনো মুক্তির পথ নেই। এ পথে তাদের সফলতা, উন্নতি ও অগ্রতি নিহিত।
অতএব, সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার। আমরা কি সেই পথেই হাঁটছি না, যেই পথ দিয়ে ইহুদিরা গিয়েছিল—গজব ও ধ্বংসের দিকে? নিজেদের ভুলগুলো এখনই চিনে সংশোধনের সময়। মুসলিম উম্মাহর রক্ষা-কবজ হলো আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন, সত্য গ্রহণ, অন্যায় রোধ এবং ঈমান-তাকওয়ার ওপর অটল থাকার মাঝে। সত্য চাপা দিলে নয়, তা মেনে চললেই রহমত আসে। কৃপণতা নয়, বরং দান ও সেবার মাধ্যমেই বরকত। গর্ব নয়, বিনয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আসুন, আমরা বদলাই- যাতে ভবিষ্যতে মুসলিম উম্মাহ জেগে উঠে সত্যনিষ্ঠ ও ঐক্যবদ্ধ এক নেতৃত্বশীল জাতি হিসাবে-যারা টেনে ধরবে সকল জুলুম-নির্যাতনের লাগাম, গড়ে তুলবে আদল-ইনসাফের সমাজ ব্যবস্থা।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

