Logo

ধর্ম

ভালবাসা দিবসের নামে বন্ধ হোক সব নোংরামি

Icon

মাহফুজ হোসাইনী

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২৬

ভালবাসা দিবসের নামে বন্ধ হোক সব নোংরামি

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব ভালবাসা দিবস। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিছু সংখ্যক তরুণ-তরুণীরা অবাধ মিলামেশায় মশগুল হয়ে পড়ে। ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভালোবাসার নামে একে অপরের জন্য নিজের নোংরামির দুয়ার উন্মুক্ত করে দেয়।

“বিশ্বব্যাপী ভালোবাসার দিন। যে যতো পারো ভালবাসা দাও, ভালোবাসা নাও। সবকিছু উজাড় করে নিজেকে অপরের জন্য বিলিয়ে দাও।” এভাবেই পালন হয়ে থাকে বিশ্ব ভালবাসা দিবস।

কিন্তু এসবের প্রতি লক্ষ্য করলে সহজেই বোধগম্য হয়, দিবসটি উপলক্ষে তারা কি ভালবাসার প্রতি সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শন করছে নাকি ভালবাসাকে কলংকিত করছে?

ভালবাসা হলো মনের টান। যাতে কোনই ক্ষাদ থাকবে না। ভালবাসা নিঃস্বার্থ। এতে কোনো স্বার্থপরতার আভাস থাকবে না। ইসলামে ভালবাসার গুরুত্ব অপরিসীম। ভালোবাসা সবার মাঝেই বিদ্যমান। ভালবাসা না থাকলে কেউ মুমিনই হতে পারে না। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা মুমিন হবে। আর তোমরা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরে একে অপরকে ভালবাসবে।

আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের কথা বলবো না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হবে?

সাহাবীগণ আরজ করলেন, নিশ্চয় ইয়া রাসুলাল্লাহ! (সা.) (তিনি বললেন) তোমাদের মাঝে প্রচুর পরিমাণে সালামের প্রচলন কর’’ (মুসলিম, হাদিস নং- ২০৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পায়। ১. আল্লাহ ও আল্লাহ্’র রাসুল তার নিকট অন্য সকল কিছু থেকে অধিক প্রিয় হওয়া।

২. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশেই কাউকে ভালবাসা।

৩. “কুফুরীতে প্রত্যাবর্তন করাকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ন্যায় অপছন্দ করা” (বুখারী, হাদিস নং:১৬)।

ভালবাসা যার প্রতিই হোক না কেন সেটা ইসলাম বহির্ভূত হওয়া যাবে না। তা অবশ্যই শরীয়ত সমর্থিত হতে হবে। আর ভালবাসার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জন। কেবলমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে কেউ যদি কাউকে ভালবাসে তবেই সে প্রশান্তি লাভ করবে। আর আখেরাতে রয়েছে মহা পুরস্কার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা নবীও নয় শহীদও নয়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের সম্মানজনক অবস্থান দেখে নবী এবং শহীদগণও ঈর্ষা করবে। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাদেরকে বলুন, তারা কারা?

তিনি বলেন- “তারা ঐ সকল লোক, যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই একে অপরকে ভালবাসে। অথচ তাদের মধ্যে কোন রক্ত সম্পর্কও নেই এবং কোন অর্থনৈতিক লেন-দেনও নেই। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় তাদের চেহারা হবে নূরানি এবং তারা নূরের মধ্যে থাকবে। সেদিন তাদের কোন ভয় থাকবে না, যেদিন মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে এবং সেদিন তাদের কোন চিন্তা থাকবে না, যেদিন মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে।” (আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫২৯)।

ভালবাসা পবিত্র। ভালবাসা সম্পূর্ণই আল্লাহ্ প্রদত্ত। তাই প্রকৃত ভালবাসা হওয়া চাই আল্লাহ্ জন্যই। কোনো মানুষকে ভালবাসলে সে নাও ভালবাসতে পারে এবং নিশ্চিত প্রতিদানের আশা করাও যায় না। যেকোনো সময় ধোঁকার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের মন মূহুর্তেই রং বদলায়। কিন্তু আল্লাহ্কে ভালবাসলে আল্লাহও তোমাকে ভালবাসবেন এবং নিশ্চিত প্রতিদান দিবেন। মহা প্রতিদান। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “(হে নবী) আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদেরকে তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।” (সূরা: আল ইমরান-৩১)।

আল্লাহ্ তায়ালা প্রতিটি মানুষের অন্তরেই ভালবাসা দান করেছেন। নারী পুরুষের মাঝে দিয়েছেন এক অন্যরকম ভালবাসার বন্ধন। নারী-পুরুষের ‘মুহাব্বত-আকর্ষণ’ এটা আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ-রহমত। তাই আল্লাহর বিধান অনুযায়ীই এই আকর্ষণ কাজে লাগাতে হবে। অবৈধভাবে এই আকর্ষণের অপব্যবহার করে ভালবাসাকে অপবিত্র করার অধিকার কারো নেই। বিবাহ বহির্ভূত নারী পুরুষের ভালবাসা কখনো পবিত্র হতে পারে না। এটা ভালবাসার নামে নষ্টামি। সামাজিক বিশৃঙ্খলা। ইসলামে এই ভালবাসার ঠাঁই নেই। মস্ত বড় অপরাধ এটা।

স্বামী-স্ত্রীর সুমধুর সম্পর্কই হল সত্যিকার অর্থে ভালবাসা। আল্লাহ্ তায়ালা নারী-পুরুষের মধ্যকার যেই রোমাঞ্চকর ভালবাসা দান করেছেন সেই ভালবাসার প্রকৃত ও আসল রূপই হলো স্বামী-স্ত্রীর প্রেম-ভালবাসা। এই ভালবাসার গভীরতা ও তৃপ্তি যেমন রয়েছে তেমনি আল্লাহর কাছেও রয়েছে এর যথাযথ মূল্যায়ন। নারী-পুরুষের মাঝে একমাত্র এই ভালবাসাই বৈধ। নির্ভেজাল। এতে নেই কোনো ভয়। নেই কোনো লুকোচুরি। স্ত্রীর সাথে আনন্দ চিত্তে কথা বলা, তাকে নিয়ে ফূর্তি করা, হাসি-ঠাট্টা করা, দুষ্টুমি করা, আনন্দ-উল্লাস করা, রোমাঞ্চ করা, মজা করা, এমনকি স্ত্রীকে খাইয়ে দিলেও আল্লাহ্’র কাছে এর প্রতিদান রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও প্রতিদান দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি- ৫৬)।

ইসলাম ভালবাসার কত মর্যাদা দিয়েছে। স্ত্রীর সাথে ভালোবাসা করে তৃপ্তিও পাওয়া গেল আবার আল্লাহ্ সওয়াবও দিলেন। শুধু তাই নয়, স্ত্রীর সাথে সহবাস করে নিজের খাহেশাত পুরা করলেও আল্লাহ্ সাদকার সাওয়াব দেন। হযরত আবূ যার (রা:) থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবী রাসুলুল্লাহ  (সা.) কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ধনীরা তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত এই কাজ করছে) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাদকা করছে। তিনি বললেন, আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকা করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রতিটি তাসবীহ সাদকা, প্রতিটি তাকবীর সাদকা, প্রতিটি তাহলীল সাদকা, ভাল কাজের আদেশ করা সাদকা ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকা এবং স্ত্রী মিলন করাও সাদকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! কেউ যদি স্ত্রী মিলন করে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারণ করে, এতেও কি সে সাওয়াব পাবে? তিনি বললেন, তোমরা কি মনে কর যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন মিলন করে, তবে কি তার পাপ হবে? অনুরূপভাবে যদি সে বৈধভাবে স্ত্রী মিলন করে নিজের কামক্ষুধা নিবারণ করে, তবে সে সাওয়াব পাবে। (মুসলিম- ২৩৭৬)।

ইসলামে ভালবাসার যথাযথ মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবসের নামে নারী-পুরুষকে অবৈধ যৌন সম্পর্কের প্রতি উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। ভালবাসাকে ব্যাভিচারে পরিণত করা হচ্ছে।

আসলে এই ভালবাসা দিবসের মানেটা কী? আর কেনই বা এটা একটি দিবসে সীমাবদ্ধ? পকৃতপক্ষে ভালোবাসার মধ্যে সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে না। একদিন বিশেষ ভালোবাসা অন্যান্য দিন স্বাভাবিক, এটাও ভালোবাসার চাহিদা নয়। আর যদি ভালোবাসা সবার জন্য উন্মুক্ত হয় তাহলে এটা হবে পুরাই অশ্লীলতা। তাহলে এই দিবসের মানে কী?

এই দিবসের মানে কি এটাই যে, যুবক যুবতিদের অবৈধভাবে মিলামেশা করা, তাদের নোংরামি জনসম্মুখে প্রকাশ করা, মা-বোনেরা বেপর্দাভাবে বেহায়ার মত অর্ধউলঙ্গ হয়ে রাস্তায়-পার্কে ঘুরাফেরা করা? এ সবগুলোই অনেক বড় গোনাহের কাজ, হারাম ও নিষিদ্ধ। সামাজিক ভাবেও এগুলো গর্হিত কাজ। কোনো মুসলমান, সুস্থ সমাজ কখনই এই দিবসকে সমর্থন করতে পারে না। এই দিবসের দোহাই দিয়ে যারা ভালোবাসাকে কলংকিত করছে, পবিত্র সমাজকে অপবিত্র করছে, সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে তাদের প্রতিরোধ করা ঈমানী ও সামাজিক দায়িত্ব। এই জঘন্য দিবসকে সামাজিক ভাবে বয়কট করা জরুরি। যারা এই নোংরা দিবস উদযাপন করে সমাজ ও মুসলিম ঈমানদারদের মাঝে নোংরামি ছড়াচ্ছে তাদেরকে আল্লাহ্ তায়ালা কঠিন হুঁশিয়ারি করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয় যারা ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার-অশ্লীলতা প্রসার করতে চায়, তাদের জন্যে ইহাকাল ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” (সূরা: নূর-১৯)

লেখক: শাইখুল হাদিস, জামিয়া দারুন নাজাত ময়মনসিংহ।

সিনিয়র সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশের খবর 

বিকেপি/ এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর