ভালোবাসার নামে জেনা
ইসলামের কাঠগড়ায় কথিত রিলেশন
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:৩৪
আজকের যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতারণা হলো, পাপ ও অপকর্মকে সৌন্দর সৌন্দর মুখোশ পরিয়ে বাজারে তোলা। যে অপকর্মকে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় কবিরা গুনাহ ঘোষণা করেছেন, যে পাপের শাস্তি দুনিয়ায় অপমান আর আখিরাতে কেবল জাহান্নামের আগুন- সেই অপরাধকেই আজ “ভালোবাসা” নামের মিষ্টি মোড়কে ঢেকে সমাজের সামনে পরিবেশন করা হচ্ছে। শব্দ বদলে ফেলা হয়েছে, কিন্তু কাজের বাস্তবতা একটুও বদলায়নি।
বিয়ে ছাড়া নারী-পুরুষের সম্পর্ককে আজ “রোমান্টিক লাভ”, “রিলেশনশিপ”, “প্রেম” ইত্যাদি আকর্ষণীয় শব্দে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন এটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য কিছু। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এই সম্পর্কগুলোর পরিচয় একটাই, তা হলো ‘জেনা’।
আল্লাহ আমাদের জন্য জেনাকে শুধু নিষিদ্ধই করেননি, বরং তার কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর বিধান এখানে একেবারে পরিষ্কার। কোরআনের আয়াত আজও আমাদের সামনে জীবন্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সতর্কবাণী এখনও আমাদের জন্য যথেষ্ট। আধুনিকতার যুক্তি, আবেগের ভাষা বা সময়ের কথিক চাহিদা এর কোনোটাই হালালকে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করতে পারে না। সত্যের মানদণ্ড মানুষের এই সব অনুভূতি নয়, বরং সত্য কেবল আল্লাহর দেয়া মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়।
এই আহ্বান কাউকে অপমান করার জন্য নয়, বরং এটা জতির মুক্তির ডাক। আমরা সবাই ভুল করি, কিন্তু সফল সে-ই, যে ভুল থেকে ফিরে আসে। এই দাওয়াত আমাদের সেই সত্যের দিকে ডাকে, যাতে হারামকে হারাম বলে চেনা, আল্লাহর সীমার কাছে থেমে যাওয়া এবং পবিত্র পথের দিকে ফিরে আসার আকুতি রয়েছে। কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে আমরা বুঝতে চাই, এই তথাকথিত সম্পর্কগুলোর পরিণতি কী এবং আল্লাহ কোন পবিত্র, নিরাপদ ও বরকতময় পথ আমাদের জন্য খুলে রেখেছেন।
জেনা: কোরআনের দৃষ্টিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে জেনা-ব্যভিচারকে শুধু নিষিদ্ধই করেননি, বরং এর কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, “আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।” (ইসরা-৩২) লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে বলেননি “ব্যভিচার করো না”, বরং বলেছেন “নিকটবর্তী হয়ো না”। এর অর্থ হলো, যেসব কাজ ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়, যেসব পদক্ষেপ এই মহাপাপের পথ প্রশস্ত করে, সেসবও সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং নিষিদ্ধ। এতে স্পষ্ট হয় যে ইসলাম শুধু চূড়ান্ত পাপকেই বন্ধ করে না, বরং সেই পাপের দিকে ধাবিত করে এমন প্রতিটি সিঁড়িকেও রুদ্ধ করে দেয়। আয়াতে “অশ্লীল কাজ” এবং “নিকৃষ্ট পথ” শব্দগুলো দিয়ে আল্লাহ তাআলা এই পাপের জঘন্যতা তুলে ধরেছেন।
সুরা নুরের দুই নাম্বর আয়াতে এর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে একশত বেত্রাঘাত, আর বিবাহিত ব্যক্তির জন্য রজম অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপে হত্যা। এত কঠোর শাস্তি আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন এই পাপের ভয়াবহতা ও সমাজের জন্য এর বিষাক্ততা বোঝাতে। ডেটিং, প্রেমের সম্পর্ক, একাকী দেখা-সাক্ষাৎ, অবৈধ স্পর্শ, যৌন আবেদনময় কথাবার্তা; এ সবকিছুই ব্যভিচারের “নিকটবর্তী হওয়া”র অন্তর্ভুক্ত এবং সম্পূর্ণভাবে হারাম।
এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হলো, নিজের দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে, নামাহরামের সাথে সকল প্রকার সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলতে হবে, সেটা যত হালকা-ই মনে হোক না কেন।
মোবাইলে কথোপকথন, সোশ্যাল মিডিয়ায় অবৈধ চ্যাটিং ও যে কোন ধরণের সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। হালাল-হারামের সীমারেখা সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহকে ভয় করে চলতে হবে। যখনই কোনো সম্পর্ক বা পরিস্থিতি জেনার দিকে নিয়ে যাওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা সৃষ্টি করে, তখনই তা থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরে আসতে হবে।
কোরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ আদায় এবং সৎসঙ্গে থাকা এই বিষয়ে আত্মরক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম। প্রতিদিন এই দোয়া করতে হবে যে আল্লাহ যেন আমাদেরকে সকল প্রকার অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করেন এবং পবিত্রতার পথে চলার তাওফিক দান করেন।
হাদিসে জেনার স্তরবিন্যাস
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে জেনা শুধু শারীরিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিটি অঙ্গের আলাদা আলাদা জেনা রয়েছে। তিনি বলেন, “...চোখের জেনা হলো হারামভাবে তাকানো, কানের জেনা হলো শোনা, জিহ্বার জেনা হলো কথা বলা, হাতের জেনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জেনা হলো হারামের দিকে হাঁটা এবং অন্তরের জেনা হলো কামনা ও আকাক্সক্ষা করা। আর লজ্জাস্থান হয় তা বাস্তবায়ন করে অথবা করে না।” (সহিহ মুসলিম-২৬৫৭)
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে জেনা একটি বহুস্তরীয় পাপ, যার শুরু হয় চোখ দিয়ে এবং ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় চূড়ান্ত স্তরের দিকে। আজকের তথাকথিত প্রেমের সম্পর্ক বা রিলেশনশিপে এই সমস্ত স্তরের জেনা-ই ঘটে থাকে। দৃষ্টি বিনিময় হয় চোখের জেনা, প্রেমের কথা বলা হয় জিহ্বার জেনা, এই ধরণের কথা শোনা হয় কানের জেনা, হাত ধরা ও আলিঙ্গন করা হয় হাতের জেনা, নিষিদ্ধ স্থানে একসাথে যাওয়া হয় পায়ের জেনা এবং অন্তরে এই কল্পনা লালন করা হয় অন্তরের জেনা। যারা মনে করে “আমরা শুধু কথা বলি, শারীরিক সম্পর্ক নেই” তাদের জানা উচিত যে তারা ইতিমধ্যেই বহু প্রকার জেনাতে লিপ্ত হয়ে গেছে। এই হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিটি ছোট পাপ মূলত বড় পাপের সিঁড়ি, তাই প্রথম সিঁড়িতেই পা না দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তাই আমাদের চোখের হেফাজত করতে হবে এবং নামাহরামের দিকে কখনো তাকানো যাবে না । যদি দৃষ্টি ভুলবশত পড়েও যায়, তৎক্ষণাৎ সেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে। কানের হেফাজত করতে হবে এবং অশ্লীল কথা, গান বা আবেগঘন রোমান্টিক সংলাপ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকে। জিহ্বার হেফাজত করতে হবে এবং যৌন আবেদনময় বা রোমান্টিক কথাবার্তা কখনো বলা যাবে না। হাতের হেফাজত করতে হবে- নামাহরামকে কোনোভাবেই স্পর্শ করা যাবে না, এমনকি হাত মেলানোও নিষিদ্ধ। পায়ের হেফাজত করতে হবে এবং হারাম সাক্ষাতের জন্য কোথাও যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি অন্তরের হেফাজত করতে হবে, কুচিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে হবে এবং মনে কোনো এই ধরণের কোন কল্পনা লালন করা যাবে না। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং দোয়ার মাধ্যমে অন্তরকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করতে হবে। সৎসঙ্গে থাকতে হবে এবং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে এসব পাপ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
গাইরে মাহরামের সাথে নির্জনতা: শয়তান যেখানে তৃতীয় অতিথি
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, “কোনো পুরুষ যদি কোনো নামাহরাম নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করে, তাহলে সেখানে হয় শয়তান তৃতীয়জন হিসাবে উপস্থিত থাকে।” (সুনানে তিরমিজি-২১৬৫)
এই হাদিসটি বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি। আজকাল যুবক-যুবতীরা তথাকথিত সম্পর্কের নামে একাকী দেখা করে, ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে, পার্কে একসাথে ঘুরে, গাড়িতে একসাথে চলাফেরা করে। তারা মনে করে এসব নিরীহ কাজ, কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সম্পূর্ণরূপে হারাম। শয়তান ঠিক এমন পরিস্থিতিরই অপেক্ষায় থাকে এবং ধীরে ধীরে তার প্রলোভন বিস্তার করে। যা শুরু হয় একটি নিরীহ কফি পান করা দিয়ে, তা ধাপে ধাপে পাপের গভীরতম স্তরে নিয়ে যায়। সুরা বাকারার একশত আটষট্টি নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, “শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদেরকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের আদেশ দেয়।”
পরিসংখ্যান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দেয় যে প্রেমিক-প্রেমিকার একান্ত মুহূর্ত যতই নিরীহভাবে শুরু হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা নিকৃষ্ট জেনায় পরিণত করে।
বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক: সামাজিক ও ধর্মীয় ধ্বংসযজ্ঞ
বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক কখনোই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পাপ নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের জন্য একটি মহাবিপর্যয় এবং ধ্বংসের কারণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি আমার উম্মতের জন্য পুরুষদের ক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে বড় ফিতনা বা পরীক্ষা ও বিপর্যয় রেখে যাচ্ছি না।” (সহহি বুখারি-৫০৯৬)
যখন যুবক-যুবতীরা অবাধে মেলামেশা করে এবং বিয়ের বাইরে সম্পর্ক তৈরি করে, তখন পরিবারে তীব্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, গোপন পাপাচার সমাজে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে, বিবাহের পবিত্রতা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয় এবং সন্তানের বংশ পরিচয় অত্যন্ত সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, এই পাপ ব্যক্তির আত্মিক জগতকেও সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।
এই জেনা ব্যক্তির ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ব্যভিচারকারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন থাকে না।” (সহিহ বুখারি-৬৮৮২) ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর শরহে মুসলিমে বলেছেন যে, পাপের মুহূর্তে ঈমান অন্তর থেকে উঠে যায়, ঠিক যেমনভাবে ছায়া শরীর থেকে পৃথক হয়ে যায়। এই কথাগুলো কত ভয়াবহ এবং চিন্তা করার মতো!
“আমরা বিয়ে করবো” এই অজুহাতের ভয়াবহ মিথ্যাচার”
অনেক যুবক-যুবতী নিজেদের হারাম সম্পর্ককে বৈধতা দেয়ার জন্য একটি অত্যন্ত প্রতারণামূলক যুক্তি ব্যবহার করে থাকে। তারা বলে, “আমরা একে অপরকে ভালোবাসি এবং বিয়ে করার নিয়ত আছে, তাই আমাদের সম্পর্ক রাখতে কোনো সমস্যা নেই।” এটি শয়তানের সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রবঞ্চনা এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য একটি মিথ্যা অজুহাত।
প্রথমত: জানা দরকার যে বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো নারী-পুরুষ কোনোভাবেই একে অপরের জন্য হালাল নয়।
দ্বিতীয়ত: ভবিষ্যতের কোনো প্রতিশ্রæতি কখনোই বর্তমানের পাপকে বৈধ করতে পারে না।
তৃতীয়ত: বাস্তবতা হলো অধিকাংশ তথাকথিত প্রেমের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিয়েতে পরিণত হয় না। ভাঙন, বিশ্বাসঘাতকতা, মানসিক আঘাত, এসবই এই ধরনের সম্পর্কের স্বাভাবিক এবং বেদনাদায়ক পরিণতি। আর যদি কোনো কারণে বিয়েও হয়ে যায়, তবুও বিয়ের পূর্বের সমস্ত হারাম কার্যক্রম গুনাহ হিসেবে রয়ে যায় এবং আল্লাহর কাছে এর জবাবদিহিতা অবশ্যম্ভাবী।
ইসলামের সমাধান: বিবাহের পবিত্র বন্ধন
ইসলাম কখনোই মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ ও চাহিদাকে অস্বীকার করে না বা তা দমন করতে বলে না। বরং এর জন্য একটি অত্যন্ত পবিত্র, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল পথ নির্ধারণ করেছে, আর সেই পথটি হলো বিবাহ। রাসুল (সা.) যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “হে যুবকসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন দ্রুত বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা তার জন্য যৌন চাহিদার ঢাল স্বরূপ।” (সহিহ বুখারি-৫৫৬৫)
বিবাহ শুধুমাত্র চাহিদা পূরণের একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত, পরিবার ও সমাজের মূল ভিত্তি এবং বৈধভাবে প্রশান্তি লাভের সর্বোত্তম উপায়। সুরা রূমের একুশ নাম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত সুন্দরভাবে বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
প্রকৃত ভালোবাসা, স্থায়ী সুখ এবং আত্মিক প্রশান্তি শুধুমাত্র বৈধ বিবাহের মাধ্যমেই অর্জিত হয়, হারাম সম্পর্কের মাধ্যমে কখনোই নয়। হারাম সম্পর্ক শুধু ক্ষণিকের লালসা মেটায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু দুঃখ, অনুশোচনা এবং ধ্বংস বয়ে আনে।
সমাজের দায়িত্ব হলো বিয়েকে সহজ করা, অতিরিক্ত খরচ ও যৌতুকের মতো কুপ্রথা বন্ধ করা এবং যুবক-যুবতীদের দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করা যাতে তারা হারাম থেকে রক্ষা পায়।
তাওবার আহ্বান: আল্লাহর অসীম রহমতের দরজা
যারা ইতোমধ্যে জেনা বা পূর্বস্তরের পাপে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের জন্য হতাশার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ তাআলার রহমত ও করুণার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত এবং তিনি তাওবাকারীদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। তবে মনে রাখতে হবে যে তাওবা অবশ্যই সত্যিকার, আন্তরিক ও প্রকৃত হতে হবে, শুধুমাত্র মুখে বলা কথা নয়। প্রকৃত তাওবার কয়েকটি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে যা অবশ্যই পূরণ করতে হবে। প্রথম শর্ত হলো পাপ অবিলম্বে পরিত্যাগ করা- অর্থাৎ হারাম সম্পর্ক এই মুহূর্তেই সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা, একদিনও দেরি না করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো অন্তর থেকে গভীরভাবে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া, নিজের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাওয়া। তৃতীয় শর্ত হলো ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা এবং সেই অনুযায়ী বাস্তবে জীবনযাপন করা। চতুর্থ শর্ত হলো যদি কারো হক নষ্ট করা হয়ে থাকে বা কাউকে ক্ষতি করা হয়ে থাকে, তবে তা পূরণ করা বা ক্ষমা চাওয়া। সুরা যুমারের তিপ্পান্ন নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সুসংবাদ দিয়ে বলেন, “বলো, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো- অর্থাৎ পাপ করেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।” এই আয়াত কত বড় সুসংবাদ পাপীদের জন্য! যত বড় পাপই হোক না কেন, প্রকৃত তাওবা করলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করেন।
সমাজের প্রতি আহ্বান: প্রতিরোধ গড়ে তুলুন
এই সমস্যা কখনোই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের একটি মহাসমস্যা। অশ্লীল সংস্কৃতির বিষাক্ত প্রভাব, মিডিয়ার ধ্বংসাত্মক ভূমিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার ভয়াবহ অভাব এবং পরিবারে ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম দুর্বলতা, এসবের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিবেশ যেখানে হারাম সম্পর্ক একদম স্বাভাবিক বিষয় মনে হয়। তাই শুধু ব্যক্তিগত সংশোধন যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন সমষ্টিগত প্রতিরোধ ও ব্যাপক সংস্কার।
বাবা-মা, শিক্ষক, আলিম, সমাজসেবক, সচেতন নাগরিক, প্রত্যেকের রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রথমত: সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই হালাল-হারামের স্পষ্ট শিক্ষা দিতে হবে, তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি তৈরি করতে হবে এবং ইসলামি মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত: সামাজিকভাবে অশ্লীল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং মিডিয়ায় পর্দা ও শালীনতার প্রচার করতে হবে।
তৃতীয়ত: বিয়েকে সহজ করতে হবে, যৌতুকপ্রথা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং যুবক-যুবতীদের দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত: ইসলামি জ্ঞান প্রচারের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে, মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল-কলেজ সর্বত্র নৈতিক শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চমত: আইনগতভাবে অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সত্যকে সত্য বলার সাহস
ভালোবাসা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও পবিত্র অনুভূতি, তবে তা অবশ্যই আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে এবং শরিয়তের বিধান কঠোরভাবে মেনে প্রকাশিত হতে হবে। বিয়ে-বহির্ভূত যেকোনো সম্পর্ক, তা শারীরিক হোক বা মানসিক, তা হলো জেনা এবং কবিরা গুনাহ। এই কঠিন সত্য থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই এবং থাকতেও পারে না। পাপকে সুন্দর নাম দিয়ে, মিষ্টি শব্দে সাজিয়ে কখনোই বৈধ করা যায় না। শূকরের মাংসকে যদি “গোল্ডেন মিট” বা “স্বর্ণালী খাবার” নাম দেওয়া হয়, তবুও তা হালাল হয় না, কারণ আল্লাহর বিধান নামের উপর নির্ভর করে না, বরং বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত। ঠিক তেমনিভাবে জেনাকে যদি “লাভ স্টোরি”, “রোমান্টিক রিলেশনশিপ” বা “পবিত্র ভালোবাসা” নাম দেওয়া হয়, তবুও তা কখনোই বৈধ হবে না। আল্লাহর বিধান চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। আমাদের দায়িত্ব হলো সত্যকে সত্য বলা, পাপকে পাপ বলা এবং মানুষকে সঠিক পথ দেখানো, যত কঠিনই হোক না কেন। এই যুগে যেখানে হারামকে হালাল দেখানোর তীব্র প্রচেষ্টা চলছে, সেখানে আমাদের আরও জোরালোভাবে কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা তুলে ধরতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন, আমাদের যুবসমাজকে পবিত্র পথে পরিচালিত করুন এবং এই জাতিকে জেনার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন।
লেখক: মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।
বিকেপি / এমএম

