Logo

ধর্ম

জিকিরের ফজিলত, পদ্ধতি ও কিছু উত্তম জিকির

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৭

জিকিরের ফজিলত, পদ্ধতি ও কিছু উত্তম জিকির

আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের সর্বোত্তম পথ হলো জিকির। তাই কোন জিকির, কখন, কিভাবে করতে হবে এগুলো আমাদের জানতে হবে। বর্তমানে ইসলামের মধ্যে অনেক বাতিল ফেরকা ঢুকে পড়েছে। এদের বেশিরভাগই আবার এই জিকির প্রিয়! তবে এদের মধ্যে অনেক শিরকি, বিদআতি ও কুসংস্কারমূলক শব্দ ও বাক্য রয়েছে। সুতরাং এগুলি থেকে আমাদেরকে দূরে থাকতে হবে। আর এই দূরে থাকা তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা এসম্পর্কে সহিহ পদ্ধতি জানতে পারবো। তাই আপনাদেরকে এই সব ভন্ডদের কবল হতে সতর্ক করানোর জন্যই আমার এই প্রয়াস। আসলে জিকির সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে গেলে একটি বিশাল বই লেখা হয়ে যাবে! তবে আমি সংক্ষেপে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।

প্রথমত: জিকির কি

‘যিকর মূলত আরবি শব্দ। বাংলায় এর অর্থ স্মরণ করা বা করানো। অর্থাৎ যে কোনো প্রকারে মনে, মুখে, বা কাজে কর্মের মাধ্যমে আদেশ-নিষেধ পালন করে বা করার মাধ্যমে আল্লাহর নাম, গুনাবলী, বিধিবিধান, তার পুরস্কার, শান্তি, ইত্যাদি স্মরণ করা বা করানোকে ইসলামের পরিভাষায় জিকির বা আল্লাহর জিকির বলা হয়। অর্থাৎ ব্যাপক অর্থে ঈমান ও নেক কর্ম সবই জিকির বলে গণ্য।......তবে আমাদের মাঝে একটি ভুল ধারণা আছে যে, সুবহানআল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি এগুলিই শুধুমাত্র মুখে উচ্চারণ করাকে জিকির বলা হয়। কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়।’(রাহে বেলায়াত, ড.খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর,আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স-ঝিনাইদহ,পৃষ্ঠা-৩১-৩২) 

দ্বিতীয়ত: যিকরের ফজিলত

প্রকৃতপক্ষে যিকরের ফজিলতের পক্ষে অনেক সহিহ হাদিস আছে। কিন্তু দুঃখের কথা হলো যে, এর পরেও জাল, যয়িফ, হাদিসেরও কমতি নেই! তবে পাঠক, কথা হলো যে-অসংখ্য সহিহ হাদিস থাকতে আমরা কেনো জাল ও যয়িফের দিকে যাবো ? তাছাড়াও মিথ্যা হাদিস বর্ণনার যে ভয়ংকর শাস্তি! ‘যে মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করবে তার জন্যে জাহান্নাম নির্ধারিত!’ অতএব আমরা কখনোই ফজিলতের জন্য জাল বা যয়িফ হাদিসের দিকে যাবোনা। কোরআন-হাদিসে বর্ণিত যিকরের ফজিলতের মধ্যে সকল প্রকারের জিকিরই এসে যায়। মোল্লা আলী ক্বারি (রহ.) বলেন-“আল্লামা ইবনুল জাবারি বলেছেন ‘যিকরের ফজিলত শুধু তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যিনিই আল্লাহর আনুগত্যে লিপ্ত বা আল্লাহর আনুগত্যমূলক কোনো কাজে লিপ্ত আছেন তিনিই যিকরে লিপ্ত আছেন বা তিনিই যাকির। সর্বশ্রেষ্ঠ যিকর কোরআন কারিম। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যেখানে কোরআন ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে যিকরের বিধান দিয়েছেন সেখানে সেই যিকরই উত্তম।” (মোললা আলী, আল মিরকাত ৫/৩২)

যিকরের ফজিলত জ্ঞাপক হাদিসমূহে সাধারণত যিকর বলতে তাসবিহ, তাহলিল ইত্যাদি আযকার বুঝানো হয়েছে। এছাড়া সকল প্রকারের ইবাদত ও আনুগত্যই যিকরের অšতর্ভুক্ত। হাদিস শরিফে কয়েকভাবে যিকরের ফজিলত বর্ণনা করা  হয়েছে। “ক) সাধারণভাবে যিকরের ফজিলত, খ) প্রত্যেক প্রকার যিকরের জন্য বিশেষ ফজিলত, ও গ) বিশেষ সময়ের বিশেষ যিকরের ফজিলত।” তবে আমি এখানে শুধুমাত্র সাধারণভাবে জিকরের সাধারণ ফজিলত নিয়ে লিখবো ইনশাআল্লাহ। 

১। হযরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম  বলেছেন-“নিঃসঙ্গ একাকি মানুষেরা এগিয়ে গেলো। তখন সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম  একাকি মানুষেরা কারা ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর বেশি বেশি জিকির কারিগণ।” (সহিহ মুসলিম নং-২৬৭৬) 

২। উক্ত আবু হোরায়রা (রা:) হতেই বর্ণিত। তিনি বলেন,“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম  বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার বিশেষ ছায়াতলে আশ্রয় দান করবেন। যেদিন তার ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবেনা। তন্মধ্যে একশ্রেণির মানুষ ঐ মানুষ, যিনি একাকি অবস্থায় আল্লাহর জিকির করেছেন। আর তার চোখ থেকে অশ্রæর ধারা নেমেছে।” (বুখারি শরিফ, কিতাবুল আযান,নং-৬৬০)

৩। হযরত আবু মুসা (রা:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “যে ঘরে আল্লাহর নামের জিকির হয় , আর যে ঘরে জিকির হয়না তাদের তুলনা জীবিত ও মৃতের ন্যায়!” (সহিহ মুসলিম, ১/৫৩৯,নং-৭৭৯)

৪। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘আল্লাহর যিকরের চেয়ে উত্তম কোনো সাদকাহ নেই।’(তাবারানি)

৫। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর সাথে আমার সর্বশেষ যে কথাটি হয়েছিলো। যে কথাটি বলে আমি তার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলাম তা হলো, আমি প্রশ্ন করেছিলাম। হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, আল্লাহর নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রিয় আমল কোনটি ? তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কর্ম হলো যে, তুমি যখন মৃত্যু বরণ করবে তখনো তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকরে আর্দ্র থাকবে। (বুখারি শরিফ, ১/৭২)

(প্রিয় পাঠক এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে দয়া করে “ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রচিত রাহে বেলায়াত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর যিকর অজিফা এবং অন্যান্য বইগুলো পড়–ন।”)

কতিপয় উত্তম জিকর

আমাদের মহান আদর্শ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নৈকট্য তথা বন্ধুত্ব লাভের জন্য কি কি জিকির, কখন, কিভাবে করতে হবে তার সব বর্ণনা দিয়ে গেছেন। আসলে যিকরের সংখ্যা অগণিত! এর সবগুলোই বিষয়সম্পৃক্ত আর সবগুলোই সর্বোত্তম। তবে সালাত, কোরআন কারিম তেলায়াত সর্বশ্রেষ্ঠ যিকর! কোরআন ও হাদিসে উল্লেখিত এসকল যিকরগুলো জপমূলক বাক্যাদির মূল বাক্য চারটি। যথা-“সুবহানাল্লাহ, আলহাম্দুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া লা হাওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”(রাহে বেলায়াত, পৃ:৫১,এহইয়াউসসুনান পৃ:৩০৮লেখক-ঐ) মহান আল্লাহ বলেছেন -“আর আল্লাহর জন্য রয়েছে উত্তম সব নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাকো। আর তাদেরকে বর্জন করো, যারা তার নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।”(সুরা আ’রাফ, আয়াত নং-১৮০)

জিকরের ধরন ও পদ্ধতি

আসলে যিকর হলো একটি ইবাদত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বিস্তারিতভাবে এই ইবাদতের পদ্ধতি ও বাক্য শিখিয়েছেন। তিনি যেখানে যে বাক্য বা শব্দ শিখিয়েছেন সেখানে বাক্য বা শব্দ বলাই উচিত। জিকরের সময় যাকিরকে অবশ্যই আল্লাহর প্রতি নিজের মনকে নির্দিষ্ট করতে হবে। জিকিরের শব্দ বা বাক্যে ও  অর্থের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে উল্লেখ্য যে, যে সকল যিকর সমূহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন , সেগুলোর প্রায় সবই বাক্য। শব্দ নয়। তবে আমাদের দেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের যিকরে প্রায় সময়ই বিদআত মূলক শব্দের জিকর উচ্চারণ করতে দেখা যায়। এবং এর পাশাপাশি মনোযোগ সৃষ্টির জন্য তারা এমন কিছু নিয়ম বা পদ্ধতি ঠিক করে নিয়েছেন, যা মূল সুন্নাতকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে! তারা এগুলোকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ,সাহাবি, তাবেয়ি, এবং তৎপরবর্তী শ্রেষ্ঠ যুগসমূহের আলিমদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে কঠিন বিদআতে লিপ্ত হয়েছেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : “জিকরের শব্দে ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া) আল্লাহ আল্লাহ, হু..হু..ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলির কোনো ভিত্তি নেই। এগুলিকে সাওয়াবি বলে মনে করা বিদআতি। এগুলির সাওয়াব নিয়ে কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। এছাড়া মনোযোগ সৃষ্টির জন্য জোরে জোরে, বুকের নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত বা কল্পনা করে যিকর করা সম্পূর্ণ বানোয়াট আর ভিত্তিহীন ও সুন্নাত বিরোধি! পাঠক, আমাদের অনুসরনীয় হলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবিবর্গ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কর্তৃক স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ যুগের আলেমগণ। সুতরাং তারা যে কাজ করেননি বা যে কাজ করাকে অপছন্দ করেছেন আমরা কিভাবে এবং কেনো তা পছন্দ করবো ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ওয়াজ পর্যায়ের যিকর ছাড়া অন্যান্য কোনো যিকরই কখনোই জোরে জোরে করেননি! তার সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পরের শ্রেষ্ঠ চার যুগের আলেমগণও কখনোই এগুলো করেননি। হানাফি মাযহাবেও জোরে জোরে যিকর করাকে বিদআতি বলা হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন- রাহে বেলায়াত, পৃ:২৫-২৪১, এহইয়াউসসুনান পৃ:৩০৫-৩১৮ লেখক-ঐ) 

এছাড়াও মহান আল্লাহ পাক সুরা আ’রাফের ২০৫ নং আয়াতে বলেছেন-“আর স্মরণ করতে থাকো স্বীয় প্রতিপালককে আপন মনে ক্রন্দনরত ও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায়। এবং এমন স্বরে যা চিৎকার করে বলা অপেক্ষা কম; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর বে-খবর থেকোনা।” লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, এসম্পর্কে একটি বহুল প্রচারিত হাদিস রয়েছে। হাদিসটি হলো-“আর তোমরা এমন ভাবে জিকর করো, যেনো লোকে তোমাকে পাগল বলে!” এই হাদিসটি আমি দেখেছি মোছাম্মৎ আমেনা খাতুনের “ওয়াজে নিসওয়া বা মহিলাদের ওয়াজ” নামক বিখ্যাত বইতে। ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর তার “হাদিসের নামে জালিয়াতি” নামক বইতে এই উক্তিকে জাল হাদিস বলে উল্লেখ করেছেন। আর যদিও এটা জাল হাদিস না হয় তবুও তো এটা কোরআনের আয়াতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতএব কোরআনের আয়াতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কখনোই বরতে পারেননা।

পরিশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-আসলে জিকর করার জন্যে কোনো নির্ধারিত সময় নেই। সকল অবস্থায়,(পবিত্র-অপবিত্র) শুয়ে-বসে, চলাফেরা সবসময়ই যে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর জিকির করতে হবে। তবে সেটা অবশ্যই সুন্নাত সম্মত পদ্ধতিতে হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক ও সহিহ নিয়্যাতে সুন্নাত পদ্ধতিতে যেনো জিকির করার তাওফিক দেন এবং ভণ্ড যাকির ফেরকা হতে যেনো রক্ষা করেন। আমিন।

(বিস্তারিত তথ্য সূত্র- রাহে বেলায়াত, এহইয়াউসসুনান, খুতবাতুল ইসলাম, লেখক: ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স-ঝিনাইদহ) লেখক: প্রাবন্ধিক

বিকেপি / এমএম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর