Logo

ধর্ম

প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা মহৎ গুণ

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১২

প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা মহৎ গুণ

মানবজীবনে আঘাত, অবমাননা ও অন্যায়ের সম্মুখীন হওয়া অনিবার্য। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো প্রতিশোধ নেওয়া। কিন্তু ইসলাম মানুষের এই প্রবৃত্তিকে সংযত করে একটি উচ্চতর নৈতিকতার দিকে আহ্বান জানায়, তা হলো ক্ষমা। ইসলাম শিক্ষা দেয়, প্রতিশোধে ক্ষণিকের তৃপ্তি থাকলেও ক্ষমার মধ্যে রয়েছে স্থায়ী শান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সমাজে কল্যাণ। কোরআন ও হাদিসে ক্ষমাকে মহৎ গুণ হিসেবে বারবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ক্ষমার অর্থ ও তাৎপর্য

ক্ষমা অর্থ হলো অপরাধীর ভুলকে উপেক্ষা করা, প্রতিশোধের অধিকার থাকা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ না করা এবং কল্যাণের পথ অবলম্বন করা। ক্ষমা দুর্বলতার নাম নয়; বরং এটি আত্মসংযম, নৈতিক শক্তি ও আল্লাহভীতির পরিচায়ক। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, সে নিজের অন্তরকে হিংসা ও ক্রোধ থেকে মুক্ত রাখে।

কোরআনের আলোকে ক্ষমার শিক্ষা

পবিত্র কোরআনে ক্ষমার গুরুত্ব বহু স্থানে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মন্দের প্রতিদান সমপরিমাণ মন্দ; তবে যে ক্ষমা করে ও আপস-মীমাংসা করে, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট।’ [সুরা শূরা : ৪০] এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়- আইনগতভাবে প্রতিশোধ বৈধ হলেও নৈতিকভাবে ক্ষমা অধিক শ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সেসব সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ [সুরা আলে ইমরান : ১৩৪]

এখানে ক্ষমাকে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসা লাভই একজন মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

হাদিসের আলোকে ক্ষমার মর্যাদা

রাসুলুল্লাহ সা. ক্ষমাকে তাঁর জীবনাচরণে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। এক হাদিসে তিনি বলেন- ‘ক্ষমা করলে আল্লাহ বান্দার সম্মান বৃদ্ধি করেন।’ [সহিহ মুসলিম] মানুষ ধারণা করে ক্ষমা করলে সম্মান কমে যায়। কিন্তু ইসলাম বলে, ক্ষমাই প্রকৃত সম্মানের কারণ।

আরেক হাদিসে এসেছে, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে-ই যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এই হাদিসে প্রতিশোধপরায়ণতাকে দুর্বলতা এবং ক্ষমাকে শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মহানবী সা.-এর জীবনে ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত

ইসলামের ইতিহাসে ক্ষমার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মুহাম্মদ সা.। মক্কা বিজয়ের দিন-যখন তাঁর হাতে ছিল পূর্ণ ক্ষমতা, আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মানুষগুলো, যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, হত্যা চেষ্টা করেছে, প্রিয়জনদের হত্যা করেছে। তখন তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।’ এই ক্ষমার ফলেই বহু মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। এটি প্রমাণ করে ক্ষমা হৃদয় জয় করে, প্রতিশোধ নয়।

প্রতিশোধের কুফল

প্রতিশোধ মানুষকে হিংস্র করে তোলে, সমাজে শত্রæতা ও অশান্তি বাড়ায়। প্রতিশোধের পর প্রতিশোধ চলতেই থাকে-শেষ হয় না। এতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলাম চায় এই দুষ্টচক্র ভেঙে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।

ক্ষমার সুফল ও সামাজিক প্রভাব

এক. আত্মিক প্রশান্তি : ক্ষমা অন্তরের ভার হালকা করে।

দুই. আল্লাহর সন্তুষ্টি : ক্ষমাশীলদের প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ করেন।

তিন. সম্প্রীতি ও ঐক্য : সমাজে সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

চার. নৈতিক উন্নয়ন : ব্যক্তি নৈতিকভাবে উন্নত ও পরিণত হয়।

ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্য

ইসলাম অন্ধ ক্ষমার শিক্ষা দেয় না। যেখানে ক্ষমা করলে অন্যায় আরও বাড়ে বা নির্যাতিতের অধিকার নষ্ট হয়, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। তবে ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষেত্রে ক্ষমা সর্বোত্তম গুণ হিসেবে বিবেচিত।

ক্ষমা ইসলামের আদর্শ

প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই ইসলামের আদর্শ। ক্ষমা মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে, সমাজকে করে শান্তিময় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম করে। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্ষমা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি ঈমানের শক্তি, চরিত্রের সৌন্দর্য ও মহত্ত্বের প্রতীক। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে ক্ষমার এই ইসলামি আদর্শ বাস্তবায়নই পারে মানবসমাজে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর