রমজানের আগমন: আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রস্তুতি
আব্দুল্লাহ বিন ইউনুস
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২৮
মাহে রমজান আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। রমজান প্রায় এসে গেছে। আল্লাহ তাআলা আরেকবার এই পবিত্র মাসকে আমাদের নিকটবর্তী করে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি- তিনি যেন আমাকে ও আপনাদের সবাইকে মাহে রমজান লাভ করার তাওফিক দান করেন এবং এই মহান মাসের অগণিত ফয়েজ ও বরকত থেকে পূর্ণভাবে উপকৃত হওয়ার সামর্থ্য দান করেন।
এটি সেই বরকতময় মাস, যাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কল্যাণ ও বরকত অবতীর্ণ হয়। এটি সেই মাস, যাতে আল্লাহর রহমতের ধারা প্রবল বেগে বর্ষিত হয়। এটি সেই মাস, যাতে অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এটি সেই মাস, যার আগমনে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অবাধ্য শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা. ইরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাস আগমন করে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকল পরানো হয়। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়।
(বুখারি ও মুসলিম)
এটি এমন এক মহিমান্বিত মাস, যার মধ্যে এমন একটি রাত রয়েছে যার ইবাদতের সওয়াব হাজার মাসের ইবাদতের সওয়াবের চেয়েও উত্তম। এটি এমন এক মাস, যার প্রতিটি রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির ফরমান দান করেন।
রাসুলুল্লাহ সা.ইরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাত আসে, তখন অবাধ্য শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
রমজান মাস জুড়ে এর একটি দরজাও খোলা হয় না। আর জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় সারা মাসে এর একটি দরজাও বন্ধ করা হয় না। তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করতে থাকেন, ‘হে কল্যাণের অন্বেষণকারী..! এগিয়ে এসো।
হে অকল্যাণের অনুসারী! থেমে যাও।’
আর আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতেই অনেক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে দেন এ ঘোষণা রমজান মাসের প্রতিটি রাতেই হতে থাকে। (জামে তিরমিজি)
এখন দেখার বিষয় কে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপযুক্ত প্রমাণ করতে পারে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাকেই জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ দান করবেন, যে ব্যক্তি রমজানের দিন ও রাতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করবে।
এ মাস হলো রোজা ও কোরআনের মাস।
এ মাস হলো রহমত ও মাগফিরাতের মাস।
এ মাস হলো কল্যাণ ও বরকতের মাস।
এ মাস হলো তওবার মাস।
এটি এমন এক মাস, যাতে পাপসমূহ মুছে ফেলা হয়, মর্যাদা ও স্তর উন্নীত করা হয়। এটি এমন এক মাস, যাতে গুনাহ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এ মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দান, অনুগ্রহ ও ক্ষমার এক বিশাল ভাণ্ডার। সত্যিই সৌভাগ্যবান তারা যারা তাদের রবের অনুগ্রহ, ক্ষমা, দানশীলতা ও অনুকম্পা লাভ করে সৌভাগ্য ও সফলতার অধিকারী হয়। এটি সেই মাস যার আগমনের অপেক্ষায় সালাফে সালেহিনরা ছয় মাস আগে থেকেই ব্যাকুল হয়ে থাকতেন।
মু‘আল্লা ইবনে ফুযাইল (রহ.) বলেন, সালাফে সালেহিনরা ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর কাছে এই দোয়া করতেন হে আল্লাহ! আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।
তাঁরা ছয় মাস আগে থেকেই এই মাস পাওয়ার আকাক্সক্ষা ও দোয়ায় মগ্ন থাকতেন।
ইয়াহইয়া ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, তাঁদের দোয়া ছিল। ‘হ আল্লাহ! আমাকে নিরাপদ ও সুস্থ অবস্থায় রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও। আর রমজানকে আমার জন্য নিরাপদ রাখো এবং রমজানকে আমার পক্ষ থেকে এমনভাবে কবুল করে নাও যেন তা তোমার দরবারে গ্রহণযোগ্য হয়।’
মাহে রমজান পাওয়া, এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া এবং এর সৌভাগ্য অর্জন করা এ সবই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও করুণা ছাড়া আর কী হতে পারে? সুতরাং একজন মুসলমানের উচিত রমজান পেয়ে আনন্দিত হওয়া।
মাহে রমজান হলো আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের সঙ্গে লাভজনক ব্যবসা করেন। তাঁর হাত সদা প্রসারিত, দান করতে কখনো শূন্য হয় না। যদি সমগ্র সৃষ্টি মানুষ ও জিন একত্র হয়ে এক ময়দানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে চায়, আর আল্লাহ প্রত্যেকের প্রার্থনা পূরণ করে দেন, তবুও তাঁর ভাণ্ডারে কোনো ঘাটতি হবে না। ঠিক যেমন সমুদ্রে সূঁচ ডুবিয়ে বের করলে সমুদ্রের পানিতে কোনো কমতি হয় না।
রাসুলুল্লাহ সা. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বর্ণনা করেন, হে আমার বান্দারা! যদি তোমাদের প্রথম ও শেষের সবাই মানুষ ও জিন একত্র হয়ে এক স্থানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে প্রার্থনা করে এবং আমি প্রত্যেকের প্রার্থনা পূরণ করে দিই, তবে আমার কাছে যা আছে তাতে এতটুকুও কমবে না; বরং তা হবে ঠিক তেমন, যেমন একটি সূঁচ সমুদ্রে ডুবিয়ে তুলে নিলে সমুদ্রের পানিতে যে পরিমাণ কমে। (সহিহ মুসলিম)
যখন ব্যবসায়ীরা সেই মৌসুমগুলোর জন্য প্রস্তুতি নেয়, যেগুলোতে তারা দ্বিগুণ লাভ অর্জন করে, তখন একজন মুমিন বান্দার উচিত এই মহান মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা—যেখানে নেক আমলের ওপর সীমাহীন সওয়াব প্রদান করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়াই। (সূরা যুমার: ১০) এখানে ধৈর্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আনুগত্যের ওপর অবিচল থাকা।
আর হাদিসে এটাও এসেছে যে, রোজার সওয়াব সীমাহীন ও হিসাববিহীন। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়।’
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজা ব্যতীত; কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। কেননা রোজাদার আমার সন্তুষ্টির জন্য তার কামনা-বাসনা ও আহার পরিত্যাগ করে।’
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রমজান মাসে নেক আমলের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে রোজার প্রতিদান এরও ঊর্ধ্বে তা সম্পূর্ণ হিসাবের বাইরে।
এখন আসুন, আমরা জেনে নিই এই পবিত্র ও সম্মানিত মাসের প্রস্তুতি কীভাবে গ্রহণ করব। রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে নি¤েœাক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করে।
সর্বপ্রথম এই পবিত্র মাসের জন্য আমাদের প্রস্তুতি হওয়া উচিত খাঁটি ও আন্তরিক তাওবা। কারণ বান্দা ও নেক কাজের মাঝখানে যখন গুনাহ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই গুনাহই তাকে সৎকর্ম থেকে বিরত রাখে। আর যখন বান্দা নিজের গুনাহ থেকে তাওবা করে, তখন তার অন্তর নেক কাজের প্রতি আগ্রহী ও প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা রয়েছে-
এক ব্যক্তি ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর কাছে এসে বলল, আমি রাতের নামাজ (কিয়ামুল লাইল)-এর জন্য ওযুর পানি প্রস্তুত করে রাখি, প্রস্তুতিও নিই; কিন্তু তারপরও উঠতে পারি না। এর কারণ কী?
তখন ইমাম হাসান বসরী (রহ.) তাকে বললেন, ‘তোমার গুনাহগুলোই তোমাকে বেঁধে রেখেছে।’
হ্যাঁ, গুনাহ ও অবাধ্যতাই প্রতিটি কল্যাণ ও নেকি থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ। আপনি দেখবেন, অনেক মানুষ কীভাবে অযথা সময় নষ্ট করছে, জীবন অপচয় করছে এবং রমজানের মতো নেকির মৌসুম থেকেও উপকৃত হতে পারছে না। অথচ তারা রমজানের ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। এর মূল কারণ একটাই- গুনাহ তাদেরকে শেকলে বেঁধে রেখেছে, যার ফলে তারা রমজানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করো। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। (সূরা আত-তাহরীম: ৮)
আমরা সবাই গুনাহগার। তাই রমজানকে নেক কাজ শুরু করার প্রথম ধাপ হিসেবে গ্রহণ করুন। একে কল্যাণের সূচনাকেন্দ্র বানান। এই মাসে বিভিন্ন ধরনের নেক আমলের মাধ্যমে আপনার অন্তরকে নেকির নূরে আলোকিত করুন। অতীতের সকল অবহেলার ক্ষতিপূরণ করুন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন তাহলে আল্লাহও আপনার দিকে ফিরে আসবেন। কারণ, রমজানে এমন বহু আমল রয়েছে, যেগুলো গুনাহ মাফের কারণ হয়। সেগুলো যথাযথভাবে আদায় করলে গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতগুলোতে (তারাবিহসহ) কিয়াম করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা.বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন: ‘ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি! ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি! ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি!’
জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসুল! সে ব্যক্তি কে?
তিনি বললেন: যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না।
তখন আমি বললাম: আমিন।
মাহে রমজানে গুনাহ মাফের মহান সুযোগ:
মাহে রমজানে গুনাহ মাফের অসংখ্য মহান উপায় রয়েছে। যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না সে প্রকৃতপক্ষে বড় ক্ষতি ও লোকসানের মধ্যে পড়ল এবং বহু কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। অতএব, এই পবিত্র মাসের প্রস্তুতি নাও সত্যিকারের তাওবার মাধ্যমে। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখো সত্য তাওবার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার প্রতি সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশি খুশি হন, যে ব্যক্তি এক নির্জন ও ভয়ংকর মরুভূমিতে সফর করছিল।
পথে সে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটি গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল এবং তার উটনীটি পাশে বেঁধে রাখল, যার ওপর তার সমস্ত খাদ্য ও পানীয় ছিল। ঘুম ভেঙে উঠে সে দেখল- তার উটনীটি আর নেই! সে হতভম্ব ও দিশেহারা হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করল, কিন্তু কোথাও পেল না।
শেষ পর্যন্ত সে নিশ্চিত হয়ে গেল- এখন মৃত্যুই তার একমাত্র পরিণতি। সে সেই জায়গায় ফিরে এসে শুয়ে পড়ল, যেখানে আগে বিশ্রাম নিয়েছিল। আবার যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন সে দেখল-তার হারানো উটনীটি ঠিক তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে!
এ দৃশ্য দেখে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই বান্দার তাওবার কারণে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হন, যে বান্দা তাঁর দিকে তাওবা করে যেমন তোমাদের কেউ এক নির্জন মরুভূমিতে তার বাহনের ওপর সফর করছিল, হঠাৎ তার বাহনটি হারিয়ে গেল, যার ওপর ছিল তার খাবার ও পানি। সে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়ল। এমন অবস্থায় হঠাৎ সে দেখে- তার বাহনটি তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। সে নেকল ধরে ফেলে আনন্দের চরমে বলে বসে হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা, আর আমি তোমার রব। আনন্দের তীব্রতায় সে ভুল বলে ফেলে। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুত তাওবা)
সুতরাং, এই পবিত্র মাসের প্রস্তুতি নাও আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবার মাধ্যমে যিনি অতি দয়ালু, পরম করুণাময়, তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাশীল।
দ্বিতীয় প্রস্তুতি: নেক আমলের দৃঢ় নিয়ত। এই মাসের প্রস্তুতি নাও নেক আমল করার জন্য সত্যিকারের নিয়ত ও দৃঢ় সংকল্প গ্রহণের মাধ্যমে। কেননা, খাঁটি নিয়তের বরকতেই বান্দা আল্লাহর সাহায্য ও তাওফিক লাভ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর নিয়ত দেখতে পান, তবে তিনি তোমাদেরকে তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করবেন, যা তোমাদের থেকে নেওয়া হয়েছে, এবং তোমাদের গুনাহও ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আনফাল: ৭০)
আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে তোমার হাতে বাইআত করেছিল। তিনি তাদের অন্তরের অবস্থা জেনে তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ের সুসংবাদ দেন। (সূরা ফাতহ: ১৮)
উল্লিখিত দুটি আয়াত প্রমাণ করে যে, নেক নিয়ত বান্দার জন্য আল্লাহর তাওফিক লাভের একটি বড় মাধ্যম। সুতরাং একজন মুসলমানের উচিত মাহে রমজানে নেক আমল আদায় ও তাতে পরিশ্রম করার ব্যাপারে দৃঢ় ও আন্তরিক নিয়ত করা। যেন সে নিজের অন্তরের ভাষায় বলে, যদি আমি রমজান মাসটি পাই, তবে আল্লাহ তাআলা আমার আমলের দিকে তাকিয়ে থাকবেন।
একজন বান্দার উচিত, এ মাসে আল্লাহ তাআলা যেন তাঁকে নিজের সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করেন; এজন্য অধিক পরিমাণে দোয়া করা। কারণ, রমজান মাস পাওয়া নিজেই কোনো কৃতিত্ব নয়; বরং এই মাসে নেক আমলের তাওফিক লাভ করাই আসল সাফল্য। অনেক মানুষ এমন আছে, যারা রমজান মাস পায় ঠিকই, কিন্তু কল্যাণের তাওফিক পায় না; বরং এই পবিত্র মাসেও তারা বড় বড় গুনাহে লিপ্ত হয়।
নবীজী সা. যে দোয়াটি হযরত মুআয ইবনু জাবাল (রা:)- কে শিখিয়েছিলেন, তা বেশি বেশি পড়া- ‘আল্লাহুম্মা আ‘ইন্নী আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবাদাতিক।’ অর্থ হে আল্লাহ! আপনার স্মরণ করতে, আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করতে এবং সুন্দর ও যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন।
এই দোয়া রমজান ও রমজান-বহির্ভূত সব সময়েই পড়া যায়; তবে রমজানে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ:) বলেন, আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি, সবচেয়ে উপকারী দোয়া হলো সেই দোয়া- যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার জন্য তাঁর সাহায্য চাওয়া হয়।
রমজানের প্রস্তুতি হোক কোরআনের মাধ্যমে
রমজান হলো ‘শাহরুল কোরআন’ বা কোরআনের মাস। এই মাসেই মানবতার মুক্তির সনদ নাযিল হয়েছে। তাই রমজানের প্রস্তুতি হওয়া উচিত কোরআন তিলাওয়াত, হিফজ এবং এর গভীর মর্ম উপলব্ধির মাধ্যমে।
কেন কোরআনকে গুরুত্ব দেবেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে কোরআন তিলাওয়াত ও পর্যালোচনা (দৌর) করতেন।
আমাদের পূর্বসূরিরা (সালাফ) এই মাসে দুনিয়ার সব ব্যস্ততা কমিয়ে কোরআনে মগ্ন হতেন।
আমাদের করণীয়
১. প্রতিদিন নিয়মিত তিলাওয়াত করা।
২. কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা।
৩. মুখস্থ অংশগুলো বারবার পড়া
আমরা যেন কোরআন পরিত্যাগকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হই। সূরা ফুরকানে নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে উম্মতের বিরুদ্ধে কোরআন অবহেলার যে অভিযোগ করবেন, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।
আখিরাত দুনিয়ার চেয়ে বহুগুণ উত্তম। তাই আসুন, এই রমজানকে কোরআনের সাথে সখ্যতা গড়ার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি।
দোয়ার মাধ্যমে রমজানের প্রস্তুতি
রমজানের বরকত লাভ এবং ইবাদতে তাওফিক পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো দোয়া। আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমত ও সাহায্য ছাড়া নেক কাজ করা সম্ভব নয়, তাই রমজানের আগে ও পরে সর্বদা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন ‘দোয়া-ই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত" এবং আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে সম্মানিত আর কিছু নেই।’
বান্দা যখন দুহাত তুলে চায়, তখন দয়াময় আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।
রমজান আমাদের জন্য এক সম্মানিত অতিথি। এর মর্যাদা রক্ষায় যাবতীয় গুনাহ ও নাফরমানি থেকে বিরত থেকে এই পবিত্র মাসের পবিত্রতা ও মহিমা বজায় রাখা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
আজকাল অনেকেই রমজানকে নাটক, সিরিজ ও বিনোদনের মাসে পরিণত করেছে। এটি মানুষকে আল্লাহর পথে থেকে সরিয়ে দেয় এবং সমাজে অশ্লীলতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়ায়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি রয়েছে।’ (সূরা নূর: ১৯)
যারা মুমিনদের কষ্ট দেয় এবং তওবা করে না, তাদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি রয়েছে। (সূরা বুরুজ: ১০)
মুসলমানদের উচিত রমজানের মর্যাদা রক্ষা করা, সব ধরনের হারাম দেখানো ও শোনা থেকে বিরত থাকা। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন,
যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যার ওপর আমল করা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ ত্যাগ করে না—আল্লাহর কাছে তার ক্ষুধা ও পিপাসায় থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। (সুনানে ইবন মাজাহ)
সুতরাং রমজানে নেকি বাড়াতে হলে পাপ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি।
প্রস্তুতির জন্য রমজানের বিধান, মাসআলা-মাসায়েল ও ইবাদতের পদ্ধতি শিখতে হবে। আল্লাহ আমাদের নেক কাজ, রোজা ও রাতের ইবাদতের তাওফিক দান করুন, গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া বিন্নুরিয়া আলামিয়া, করাচি, পাকিস্তান
বিকেপি/এমএম

