মাজার সংস্কৃতির নামে অনাচার
ভক্তি যখন গোমরাহীর হাতিয়ার
কায়ছার উদ্দীন আল-মালেকী
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৪
ভূমিকা: বাংলাদেশ আউলিয়া-দরবেশ ও সুফি-সাধকদের পুণ্যভূমি। ইসলামি ঐতিহ্যের প্রসারে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমানে মাজার ও ওরসকে কেন্দ্র করে এমন কিছু অনৈসলামিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, যা ইসলামের মূল ভিত্তি তওহীদ ও সুন্নাহর পরিপন্থী। ভক্তির আবরণে এই অনাচারগুলো আমাদের সমাজের ঈমানি চেতনাকে কলুষিত করছে এবং ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা দিচ্ছে।
সুফিবাদ বনাম প্রচলিত বিকৃতি: একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন-বর্তমানে মাজারগুলোতে যে জঘন্য প্রথাগুলো দেখা যায়, তা কোনোকালেই ইসলাম বা প্রকৃত সুফিদের অংশ ছিল না। বড় বড় আউলিয়াগণ আজীবন শরিয়তের কঠোর অনুসারী ছিলেন। অথচ আজ তাঁদের নাম ব্যবহার করে শিরক ও বিদআতের চর্চা করা হচ্ছে। ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে এই অসংলগ্ন কাজগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এগুলো দ্বীনের বিকৃতি মাত্র। তাই এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
আকিদাগত বিচ্যুতি ও কুসংস্কার: মাজারগুলোতে মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে হুক্কা, আয়না, চেয়ার কিংবা পড়ার টেবিল রাখার মতো বিভ্রান্তিকর প্রথা দেখা যায়। বিশ্বাস করা হয়, মৃত ব্যক্তি কবর থেকে উঠে এগুলো ব্যবহার করবেন। এটি দ্বীনের নামে চরম গোমরাহী। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, শহীদানরা জীবিত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত হন (সূরা আল-ইমরান: ১৬৯), কিন্তু সেই রিযিক বা জীবন পার্থিব জগতের মতো নয়। সাধারণ মানুষ এই বিশ্বাসে মাজারে দুনিয়াবী খাবার বা আসবাব নিবেদন করা যে, মাজারওয়ালা সরাসরি তা ভোগ করবেন-এটি আকিদাগত বিভ্রান্তি ও অপচয়।
পীরতন্ত্র ও আর্থিক শোষণ: ওরসের নামে সংগৃহীত পশু সম্পদ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিবের হকের পরিবর্তে পীরের বংশধর বা খাদেমদের ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত হয়। যেখানে ইসলামে দান-সদকা অভাবীদের মাঝে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে একশ্রেণির পীর-আওলাদ ভক্তদের টাকা নিয়ে আলিশান ও বিলাসজহুল জীবন যাপন করছেন। অথচ এই অতিরিক্ত অর্থ আর্তমানবতার সেবায় ব্যয় করাই ছিল প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা।
মাদক, গান ও নৈতিক পতন: মাজারগুলোর পবিত্রতা আজ বাদ্যযন্ত্র (ঢোল, তবলা) ও তথাকথিত ‘সামা’র নামে ভূলুণ্ঠিত। অনেক মাজারে আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে গাঁজার আসর বসিয়ে যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, ভক্তিকে পুঁজি করে নারী ভক্তদের ওপর চারিত্রিক ও যৌন শোষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমি বস্ত্র, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (সহিহ বুখারি: ৫৫৯০)।
তন্ত্র-মন্ত্র ও সম্মোহনী জালিয়াতি: বর্তমানে অনেক তথাকথিত পীর বা সাধক আঙুলে একাধিক তান্ত্রিক আংটি (যেমন: রাজমোহিনী বা বশীকরণ পাথর) ব্যবহার করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে অলৌকিক শক্তির দোহাই দিয়ে মানুষকে নিজের প্রতি মোহগ্রস্ত বা আকৃষ্ট করা। শরিয়তের দৃষ্টিতে জাদুর সাহায্য নিয়ে মানুষকে বশ করা বা ভাগ্য পরিবর্তনের দাবি করা সরাসরি শিরক ও কুফরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি (অশুভ উদ্দেশ্যে বা ভাগ্য বদলাতে) কোনো কিছু ঝুলালো বা ধারণ করলো, তাকে ওই বস্তুর ওপরই সোপর্দ করে দেওয়া হয় (অর্থাৎ সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়)” (তিরমিজি: ২০৭৪)।
উপসংহার ও প্রতিবাদ: ধর্মীয় ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে এই অনাচারগুলো আর মেনে নেওয়া যায় না। প্রকৃত তাসাউফ বা সুফিবাদ ছিল আত্মশুদ্ধি ও শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণের নাম, যা বর্তমানের এই লৌকিক মাজার সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই: ১. মাজার কেন্দ্রিক মাদক ও বাদ্যযন্ত্রের আসর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হোক। ২. মাজারের দান ও আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তা লোকালয়ের অভাবী মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হোক। ৩. পীর বা খাদেম পরিচয়ে নারী নির্যাতনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ৪. আংটি বা পাথরের মাধ্যমে তান্ত্রিক ব্যবসা ও মানুষের সরল বিশ্বাস নিয়ে প্রতারণা বন্ধ করা হোক। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষকে কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞানে সচেতন হতে হবে। আসুন, ভক্তির নামে ভণ্ডামিকে রুখে দিই এবং ইসলামের নির্মল শিক্ষা রক্ষা করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক
বিকেপি/এমএম

