শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা-১৫
নবুওয়তের আলোকে কওমির সিলেবাস পুনর্গঠন হোক
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৬
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মুআল্লিমুল বাশার- সমগ্র মানবতার শিক্ষক। তাঁর নবুওয়তের তেইশ বছর কোনো বিচ্ছিন্ন সময়খণ্ড নয়; বরং তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা, দাওয়াতি কর্মসূচি, সমাজ-সংস্কার প্রকল্প ও রাষ্ট্র নির্মাণের বাস্তব মডেল। মক্কায় তেরো বছর তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বাস, চরিত্র ও চিন্তার ভিত; আর মদিনায় দশ বছর প্রতিষ্ঠা করেছেন সমাজ, রাষ্ট্র, আইন ও সভ্যতার রূপরেখা।
এই তেইশ বছরে গড়ে ওঠা সাহাবায়ে কেরামের সুমহান কাফেলা ছিল নববী মাদরাসার শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী। দারে আরকাম ও সুফফার তালেবে ইলমরা ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে সফল “গ্র্যাজুয়েট”- যাঁরা জাহেলি সমাজকে রূপান্তর করে শান্তি, ইনসাফ ও ইলমের আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন পৃথিবী। অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই সেই নববী মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কিসরা ও কায়সারের প্রাসাদে তাওহিদের পতাকা উড্ডীন করেছেন, কালেমার বার্তা নিয়ে ছুটে গেছেন দুনিয়ার চার কোণে।
খেলাফতে রাশেদা থেকে উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমী, তুর্কি খেলাফত- ইতিহাসের প্রতিটি যুগে এই সুফফার চেতনাধারীরাই নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্বসভ্যতাকে। মাদরাসার তালেবে ইলমরাই সূচনা করেছেন নতুন নতুন জ্ঞানশাখার। দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান-সব ক্ষেত্রেই তাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়। আল্লামা ইবনে খালদুন, ইবনে সিনা, ইমাম গাযালি, ইমাম রাজি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.- তাঁরা সবাই ছিলেন মাদরাসার সন্তান; কিন্তু তাঁরা ছিলেন কেবল গ্রন্থাগারের আলেম নন, বরং সমাজ-পরিবর্তনের বিপ্লবী নায়ক।
এখন প্রশ্ন ওঠে- আজকের তালেবে ইলমরা আধুনিক বিশ্ব নিয়ে কী ভাবছে?
বিজ্ঞানের বহুমুখী আগ্রাসন, নব্য মতবাদ, সেক্যুলারিজম, নাস্তিকতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি কী?
একুশ শতকের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য মাদরাসার পাঠ্যক্রম কতটা সক্ষম?
আজকের কওমি মাদরাসা কি বাগদাদ, কর্ডোভা, কায়রো, দিল্লি ও ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক মাদরাসাগুলোর মতো বিশ্বসভ্যতায় কার্যকর অবদান রাখতে পারছে?
আমরা কি যুগসচেতন, বিশ্বমানের আলেম-নেতৃত্ব উপহার দিতে পারছি- যাঁরা সময়ের প্রশ্ন বুঝবেন, সমস্যার ভাষা জানবেন এবং ইসলামের সমাধান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করবেন?
বিশ্বরাজনীতি, জাতিসংঘ, নতুন বিশ্বব্যবস্থা, অর্থনীতি, মিডিয়া, আইন ও প্রশাসনের জটিল চ্যালেঞ্জ- এসব বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষা কী ভাবছে? এই বাস্তবতায় দাওয়াতের কৌশল কী হওয়া উচিত- এ নিয়ে মাদরাসার কাণ্ডারিগণ কতটা ভাবছেন?
আজ যারা মাদরাসার শিক্ষক, তাঁদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের দেখতে হবে- আমরা কি তালেবে ইলমদের কেবল মসজিদের মিম্বর ও মেহরাবের জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি সমাজ ও রাষ্ট্রের রূপকার হিসেবে গড়ে তুলছি?
নবীর ওয়ারিস কি কেবল খতিব ও ইমামেই সীমাবদ্ধ?
আদালত ও প্রশাসনে আজ তালেবে ইলমরা কোথায়?
আমরা হযরত মুআজ ইবনে জাবাল রা.-কে ইয়ামানের গভর্নর করে পাঠানোর হাদিস পড়াই, কিন্তু আজকের তালেবে ইলমরা কেন গভর্নর হতে পারছে না?
আমরা কাজী আবু ইউসুফ রহ.-এর কথা পড়াই, কিন্তু আজকের আদালতে সেই মানের আবু ইউসুফরা কোথায়?
আমরা রিবঈ ইবনে আমর রা.-এর ঐতিহাসিক বক্তব্য পড়াই, কিন্তু আজকের বিশ্বদরবারে সেই সাহসী দূতেরা কোথায়?
আধুনিক যুগ হয়তো তিন-চার শত বছরের; কিন্তু বিজ্ঞানের কোন শাখায় আজ মাদরাসার তালেবে ইলমদের দৃশ্যমান উপস্থিতি আছে? নববী মাদরাসার উত্তরাসুরীরা কেন নিজেদের একটি সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে- যেখানে তাঁদের বিচরণক্ষেত্র হওয়ার কথা ছিল সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বসভ্যতার প্রতিটি অঙ্গনে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে। পাল তুলতেই হবে সাত সাগরে। নবুওয়তের তেইশ বছরকে সামনে রেখে নতুন করে ভাবতে হবে-ওয়ারিসে নবীদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত।
কওমি মাদরাসার সিলেবাসকে নববী মডেলের আলোকে পুনর্গঠন করতে হবে- যেখানে আকিদা ও আখলাকের সঙ্গে থাকবে সময়-সচেতনতা, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রচিন্তা, দাওয়াতি কৌশল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি। লক্ষ্য হবে এমন একটি সমাজ গড়া, যা খেলাফতে রাশেদার আদর্শে অনুপ্রাণিত-শান্তির সমাজ, নিরাপত্তার সমাজ, ন্যায়ের সমাজ এবং মানবতার কল্যাণে নিবেদিত এক উন্নত সমাজ।
ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
বিকেপি/এমএম

