আকাশের কোণে যখন বাঁকা চাঁদ মুচকি হাসে, তখন মর্ত্যের ধুলোবালিতে যেন এক জান্নাতি আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রমজানের আগমনে বা ঈদের প্রত্যাশায় সেই এক ফালি চাঁদ আমাদের হৃদয়-মন আলোকিত করে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে আসে। কবি নজরুলের ভাষায়-
জুড়াব এবার জুড়াব গো, খুশির পায়রা উড়াব গো/ নামিবে ও চাঁদ মোর হৃদয়-আশমানে, মত্ত হইব আনন্দের রসপানে। বদলাবে তকদির আমার, ঘুচিবে সর্ব অন্ধকার, পরিব ললাটে, চুমু দেব, বাঁধব তায়/ আল্লাহ্ নামের রজ্জুতে দিল্-কোঠায়।
১. সর্বস্তরে আনন্দের হিল্লোল
আবহমানকাল থেকে নতুন চাঁদ দেখা আমাদের সমাজের এক আনন্দমুখর উৎসব। পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার সংকল্পের বিষয়টি জড়িয়ে আছে এই চাঁদের সাথে। পাড়ার কিশোররা যখন উঁচু দালানে বা খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে— “ওই যে দেখা যায়!”, তখন যেন চারপাশের বাতাসও নেচে ওঠে। যুবকদের চোখেমুখে নতুন ইবাদতের সংকল্প আর বৃদ্ধদের শান্ত হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা। এটি এমন এক মুহূর্ত যা ডিজিটাল স্ক্রিনের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত। শিশুদের দৌড়াতে দৌড়াতে বাসায় আসা এবং চাঁদের সংবাদ দেওয়ার মুহূর্তেটি যে কারো জন্য ই বেশ উপভোগ্য।
২. মসজিদের আঙিনায় উৎকণ্ঠা ও হাফেজ সাহেবদের মৃদু চিন্তা
রমজানের চাঁদ দেখার সাথে জড়িয়ে থাকে হাফেজ সাহেবদের গভীর অভিনিবেশ। তাদের মনে তখন একদিকে খতম তারাবির আমানত পালনের মৃদু চিন্তা, অন্যদিকে দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার আনন্দ। মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে মুসল্লিদের জটলা- সবার চোখ তখন পশ্চিম আকাশে। যদি চাঁদ দেখা যায়, তবে মুহূর্তেই বদলে যায় মসজিদের পরিবেশ। শুরু হয় তসবিহ আর তাকবিরের গুঞ্জন।
৩. হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বিধান
মুমিনদের জীবনে চাঁদ দেখার আনন্দের সাথে জড়িয়ে আছে সোয়াব প্রাপ্তির জযবা ও আগ্রহ। এটি সুনিশ্চিত একটি ইবাদত- নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অমিয় বাণী থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। বুখারি ও মুসলিম শরিফের সুপ্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে:
“তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখেই রোজা ছাড়ো (ঈদ করো)। তবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে (ফলে চাঁদ দেখা না যায়), তবে তোমরা গণনার সংখ্যা পূর্ণ করো (অর্থাৎ ৩০ দিন পূর্ণ করো)।” (সহিহ বুখারি: ১৯০৯, সহিহ মুসলিম: ১০৮১)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামি বিধান প্রকৃতির সাথে কতটা মিশে আছে। গাণিতিক সূ²তার চেয়ে আল্লাহর ইশারায় দৃশ্যমান চাঁদকেই এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
৪. চাক্ষুষ সাক্ষ্য ও শরয়ি সমাধান
আধুনিক যুগে টেলিস্কোপ বা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র অনেক উন্নত হলেও ফয়সালার মূল ভিত্তি হলো মানুষের চোখ। দুইজন নির্ভরযোগ্য ও আল্লাহভীরু ব্যক্তির চাক্ষুষ সাক্ষ্যই রমজান বা ঈদের ঘোষণার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন:
“তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; বলুন, তা মানুষ ও হজের জন্য সময় নির্দেশক।” (সূরা বাকারা: ১৮৯)
এখানে মানুষের জন্য সহজসাধ্য পদ্ধতির প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। যান্ত্রিক হিসাবের চেয়ে দুই চোখ দিয়ে চাঁদ খোঁজার মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতা ও সুন্নতের অনুসরণ আছে, তা অন্য কিছুতে নেই।
৫. ইবাদতের আমেজ
রমজানের চাঁদের আলো মানেই তারাবির নামাজের প্রস্তুতি এবং ইবাদতের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় সেই আকুতি যেন মূর্ত হয়ে ওঠে-
“তারাবি নামাজ পড়িতে যাইব মোল্লাবাড়িতে আজ.../চল দেখি ভাই খলিলদ্দীন, লণ্ঠন-বাতি জ্বেলে।/ঢৈলারে ডাক, লস্কর কোথা, কিনুরে খবর দাও।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমযানের সাওম পালন করবে, তাঁর অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে (তারাবি-তাহাজ্জুদের মাধ্যমে) ইবাদাত করে, তাঁরও পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে। যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বাদরে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদাত করে, তাঁরও পিছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে”।- সহীহ বুখারী
চাঁদ দেখা ইবাদত হওয়ার কারণ হলো, এর মাধ্যমেই আমরা মহান আল্লাহর নির্দেশের অধীন হই। যখন চাঁদ দেখা যায়, তখন মুমিন বান্দা আল্লাহর কুদরতের সামনে মাথা নত করে নবীজির শেখানো এই দোয়া পড়ে: “হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে উদিত করুন।”
পশ্চিম দিগন্তের সেই রূপালি রেখাটি যখন গাছের আড়াল থেকে উঁকি দেয়, তখন তা যেমন একটি মাসের সূচনা করে, অনুরূপ আমাদের অন্তরে রবের প্রতি আনুগত্যের নতুন চারাগাছ রোপণ করে। এই দেখার মাঝেই পূর্ণতা পায় মুমিনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। চাঁদটি যেন এক আধ্যাত্মিক বার্তাবাহক, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-জীবনের অন্ধকার কেটে গিয়ে এভাবেই একদিন উদিত হবে হেদায়েতের পূর্ণিমা।
লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ ঢাকা
বিকেপি/এমএম

