বছরের বারো মাস, মাসের ত্রিশ দিন- সবই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। সময় তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। তাঁর আদেশেই ভোরের আকাশে সূর্য হাসে। সন্ধ্যা নামলে সে অস্ত যায়। রাতে চাঁদ জোৎস্না ছড়ায়। তারকারা মিটিমিটি জ্বলে। দিন আসে, রাত যায়। সময় ঘুরে ফিরে আবর্তিত হয়। সবকিছুই চলে মহান রবের হুকুমে।
এই সৃষ্টিজগত যেমন তাঁর দান, তেমনি সময়ও তাঁর দেওয়া বিশেষ নেয়ামত। কিন্তু সব সময়ের মর্যাদা এক নয়। বান্দার কল্যাণে তিনি কিছু সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। কিছু দিন, কিছু রাত, কিছু মাসকে করেছেন অধিক ফজিলতপূর্ণ। এসব সময় রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসে।
সেই মনোনীত সময়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে বরকতময় এবং সবচেয়ে মহিমান্বিত সময় হলো- রমজান। রমজান মানেই রহমতের বসন্তকাল।
রমজান মানেই আত্মশুদ্ধির ডাক। রমজান মানেই আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ।
এই মাসের মর্যাদা এত বেশি যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা বছর রমজানের প্রতীক্ষায় থাকতেন।
রমজান আসার আগেই তিনি প্রস্তুতি নিতেন।
রজব মাসের চাঁদ দেখেই তিনি দোয়া করতেন- “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শা'বানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।”
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৬)
এ দোয়া আমাদের শেখায়- রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি মুমিনের কাক্সিক্ষত গন্তব্য।
বাস্তবতা হলো, বছরের বাকি এগারো মাস আমরা দুনিয়ার ব্যস্ততায় ডুবে থাকি। জীবিকা, কর্ম, পরিবার, দায়িত্ব- সব মিলিয়ে জীবন হয়ে ওঠে ক্লান্তিকর। দিন কেটে যায় দৌড়ঝাঁপে। সময় ফুরিয়ে যায় হাসি-তামাশা, আরাম-আয়েশ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততায়। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।
দিনে কয়েকবার রবের দরবারে দাঁড়াই। কিন্তু মন কি সবসময় উপস্থিত থাকে?
কখনো প্রশান্ত, কখনো অস্থির। কখনো মনোযোগী, কখনো উদাস। দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় দুনিয়ার চিন্তায়। সম্পদ, ভবিষ্যৎ, কর্ম- এসব হিসাব-নিকাশেই কেটে যায় সময়। ধীরে ধীরে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। আত্মা শুকিয়ে যায়। ইবাদতের স্বাদ হারিয়ে ফেলি। এমন সময় দয়ালু রব আমাদের জন্য পাঠান রমজান। রমজান যেন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে। বান্দাকে কাছে টেনে নেয়। ভুলে যাওয়া হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। গুনাহে কালিমালিপ্ত আত্মাকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে।
এক মাসের সিয়াম আমাদের শেখায় সংযম। শেখায় তাকওয়া। শেখায় আত্মনিয়ন্ত্রণ। শেখায় ক্ষুধার্তের কষ্ট অনুভব করতে। শেখায় আল্লাহর উপর নির্ভর করতে। এই মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে। নামাজের মর্যাদা বাড়ে। দান-সদকা বৃদ্ধি পায়। দিন- রাত দোয়া কবুল হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে।
জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। রমজান হলো গুনাহ ছেড়ে নেকির জীবনে ফিরে আসার মাস। নিজেকে বদলে ফেলার মাস। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস।
তাই আসুন, রমজানকে শুধু রোজা রাখার মাস হিসেবে না দেখে আত্মশুদ্ধির মহাসুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। সময়কে কাজে লাগাই। কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ি। নামাজে মনোযোগী হই। দান-সদকায় এগিয়ে যাই। তওবা ও ইস্তিগফারে ব্যস্ত থাকি।
লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদরাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা
বিকেপি/এমএম

