ক্ষমতা নয়, আমানতের দায়ভার
এয়োদশ নির্বাচনের পর ইসলামের নির্দেশনা
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৭
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের স্পষ্ট সমর্থন ও বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচনী অনিশ্চয়তা এবং সমাজে জমে থাকা প্রত্যাশার ভার বহন করে এই বিজয় এসেছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক বিজয় কেবল সাফল্যের প্রতীক নয়; বরং এটি হলো দায়িত্ব, পরীক্ষার সুযোগ এবং আমানতের ভার বহনের আহ্বান।
ইসলাম রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত অর্জন বা আত্মপ্রশংসার বিষয় হিসেবে দেখে না। বরং তা জনগণের প্রতি দায়িত্ব, ন্যায়ের নিশ্চয়তা এবং সমাজের কল্যাণের জন্য একটি আমানত। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার দিয়ে বিচার করবে।-(সুরা আন-নিসা :৫৮) এই আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে নির্বাচনে বিজয় মানে জনগণের আস্থা অর্জন। সেই আস্থা রক্ষা না করা ইসলামের দৃষ্টিতে খিয়ানত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)ও সতর্ক করেছেন- হে আবু যর! তুমি দুর্বল, আর নেতৃত্ব আমানত। কিয়ামতের দিন তা লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে, তবে যে ব্যক্তি এর হক আদায় করবে সে ব্যতিক্রম।-(সহিহ মুসলিম: ১৮২৫)
অতএব, এয়োদশ নির্বাচনের বিজয় নতুন সরকারকে অহংকারের নয়, বরং আত্মসমালোচনা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের পথে পরিচালিত হওয়ার আহ্বান জানায়।
বিজয়ের পর করণীয়
১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বিনয়
বিজয়ের মুহূর্তে অহংকার নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও বিনয় ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন- যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, আমি অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত বৃদ্ধি করব।-(সুরা ইবরাহিম:৭) মক্কা বিজয়ের দিনে রাসুল (সা.)-এর আচরণ ছিল এর সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। তিনি মাথা নত করে আল্লাহর শোকর আদায় করেছিলেন। এয়োদশ নির্বাচনের পর নতুন সরকারেরও উচিত সেই সুন্নাহ অনুসরণ করা- বিজয়কে আল্লাহ প্রদত্ত পরীক্ষার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
২. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হলো ইনসাফ। কোরআনে বলা হয়েছে- হে মুমিনগণ! ন্যায়ের উপর অবিচল থাকো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।-(সুরা আন-নিসা:১৩৫)
নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে—যে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা পূর্বের বিরোধিতা নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৩. প্রতিহিংসা নয়, ক্ষমা ও সহনশীলতা
রাজনৈতিক প্রতিশোধ সাধারণত দেশের অস্থিরতা বাড়ায়। ইসলামে ক্ষমা ও সহনশীলতা মূল নীতি। আল্লাহ বলেন-
মন্দের প্রতিদান মন্দই; তবে যে ক্ষমা করে ও সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।-(সুরা আশ-শূরা:৪০) বিজয়ের পর রাজনৈতিক হয়রানি, বিরোধীকে শাস্তি বা প্রশাসনিক নিপীড়ন ইসলাম নিষিদ্ধ করে।
৪. দুর্নীতিমুক্ত শাসন
দুর্নীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক। কোরআনে বলা হয়েছে- তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না।-(সুরা আল-বাকারা:১৮৮) রাসুল (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করে, কিয়ামতের দিন তা বহন করে উপস্থিত হবে।-(সহিহ বুখারি: ৭১৭৪) নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে- ক্ষমতায় এসে দলীয় লোকদের সুবিধা না দেওয়া।
৫. দরিদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা
ইসলামে শাসকের মূল দায়িত্ব হলো দরিদ্র ও প্রান্তিকদের অধিকার রক্ষা করা। রাসুল (সা.) বলেছেন- যে শাসক তার প্রজাদের বিষয়ে দায়িত্বহীন থাকবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।- (সহিহ মুসলিম: ১৪২)
অতএব নতুন সরকারের জন্য জরুরি- অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতিতে দরিদ্রবান্ধব পদক্ষেপ।
৬. শিক্ষার মানোন্নয়ন
ইসলামে শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট নয়; এটি দক্ষতা, নৈতিকতা ও সমাজসেবা তৈরির মাধ্যম। কোরআনে বলা হয়েছে- পড়াশোনা করো, জ্ঞান অর্জন করো, আল্লাহর পথে মানুষকে উপকৃত করো।-(সুরা আল-আলাক:১-৫)
নতুন সরকারের উচিত- শিক্ষা ব্যবস্থা নিরপেক্ষ, মানসম্পন্ন ও সকলের জন্য সমানভাবে প্রাপ্য করা।
৭. স্বাস্থ্যসেবা
রাসুল (সা.) বলেছেন- অসুস্থের দেখাশোনা ও চিকিৎসা সর্বাধিক মহৎ কাজ।-(সুনান আবু দাউদ: ২৮৫৮)
নতুন সরকারের দায়িত্ব-সকল জেলার হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা।
৮. আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থা
ইসলামে আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারের মানদণ্ড হলো ন্যায়বিচার। রাসুল (সা.) বলেছেন-
যে শাসক বিচারকে অবহেলা করে, সে জনগণের প্রতি অবিচার করেছে।-(সহিহ মুসলিম: ১৮২৭)
নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো- অপরাধ দমনে দৃশ্যমান উদ্যোগ, বিচার বিলম্ব কমানো এবং প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি রোধ করা।
৯. প্রশাসনের মানবিকতা ও দক্ষতা
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে অহংকার বা উদাসীনতা থাকলে ক্ষমতা বদলালেও মানুষের ভোগান্তি কমে না। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা একান্ত জরুরি।
বর্জনীয় বিষয়: ইসলামের দৃষ্টিতে
অহংকার ও আত্মগর্ব -আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বকারীকে ভালোবাসেন না।-
(সুরা লুকমান:১৮) জুলুম ও প্রতিশোধ – রাসুল (সা.) বলেছেন: জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৯)
দলীয়করণ ও পক্ষপাতিত্ব- যোগ্যতার বদলে দলীয় পরিচয়ে দায়িত্ব দেওয়াই খিয়ানত।
(মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৩৬) ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো - দ্বীন কখনো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উপকরণ নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, এয়োদশ নির্বাচনের বিজয় নতুন সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক সুযোগ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এই বিজয় তখনই সার্থক হবে, যখন তা অহংকার, প্রতিশোধ ও দুর্নীতির পথে না গিয়ে ন্যায়, ইনসাফ, মানবিকতা ও আমানতের দায়িত্ব পালন করবে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমানতের হিসাব চিরস্থায়ী।
গণরায় একটি সূচনা মাত্র; শাসনের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধই চূড়ান্ত মানদণ্ড। এই বিজয় যদি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত হয়, তবে তা ইতিহাসে কল্যাণের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সত্যিকার নেতৃত্ব হলো- যে আমানত রক্ষা করে, জনগণের আস্থা অটল রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগোতে পারে।
লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল: drmazed96@gmail.com
বিকেপি/এমএম

