Logo

ধর্ম

সহিংসতা প্রতিরোধে ইসলাম

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৭

সহিংসতা প্রতিরোধে ইসলাম

সহিংসতা মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র; সব স্তরেই সহিংসতার কুফল সুদূরপ্রসারী। ইসলাম একটি শান্তি ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা; যার মূল লক্ষ্য মানবজীবনকে নিরাপদ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা। কোরআন ও হাদিসে সহিংসতা প্রতিরোধের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেখানে অন্যায় আক্রমণ নিষিদ্ধ, মানবজীবনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন, ন্যায়বিচার ও ক্ষমার সংস্কৃতি লালিত।

ইসলামের মূল দর্শন : শান্তি ও নিরাপত্তা

ইসলাম শব্দটির অর্থই শান্তি ও আত্মসমর্পণ। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল অন্যায়ভাবে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল; আর যে একজনকে জীবন দান করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করল।’ [সুরা মায়িদা : ৩২] এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, সহিংসতা ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থী।

মানবজীবনের পবিত্রতা ও সম্মান

ইসলাম মানুষকে আল্লাহর সৃষ্ট সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত, হত্যা, সন্ত্রাস; সবই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি যুদ্ধাবস্থাতেও শিশু, নারী, বৃদ্ধ, উপাসনালয় ও নিরীহ জনগণের ক্ষতি করা নিষেধ। এ বিধান প্রমাণ করে, ইসলাম সংঘাত নয়; ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির নীতিতে বিশ্বাসী।

ন্যায়বিচার : সহিংসতার বিকল্প পথ

সহিংসতার বড় কারণ অন্যায় ও অবিচার। ইসলাম ন্যায়বিচারকে সমাজের ভিত্তি বানিয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও-যদি তা তোমাদের নিজেদের বা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ [সুরা নিসা : ১৩৫] ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলে প্রতিশোধপরায়ণতা কমে, সহিংসতা প্রশমিত হয়।

আত্মসংযম ও ক্রোধ দমন

সহিংসতার অন্যতম উৎস ক্রোধ। ইসলাম ক্রোধ দমনের শিক্ষা দেয়। কোরআনে মুত্তাকীদের গুণ হিসেবে বলা হয়েছে- ‘তারা রাগ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।’ [সুরা আলে ইমরান : ১৩৪] হাদিসে এসেছে, শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে জয়ী; বরং শক্তিশালী সে-ই যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে। আত্মসংযম সামাজিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর অস্ত্র।

ক্ষমা ও মীমাংসার সংস্কৃতি

ইসলাম প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা ও সমঝোতাকে উৎসাহিত করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মন্দের প্রতিদান মন্দের সমান; তবে যে ক্ষমা করে ও সংশোধন করে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।’ [সুরা শূরা : ৪০] ক্ষমা ব্যক্তিগত হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং সামাজিক সংঘাত কমায়। ইতিহাসে ক্ষমার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. মক্কা বিজয়ের দিনে শত্রæদের সাধারণ ক্ষমা দিয়ে।

জুলুম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোরতা

ইসলাম সহিংসতা প্রতিরোধে যেমন কোমল, তেমনি জুলুমের বিরুদ্ধে দৃঢ়। অন্যায়ভাবে রক্তপাত, সন্ত্রাস সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন; এসবকে কোরআন ‘ফাসাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আল কোরআন নির্দেশ দেয়- ‘যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।’ [সুরা বাকারা : ১৯০] অর্থাৎ আত্মরক্ষায় শক্তি প্রয়োগ অনুমোদিত; আগ্রাসন নয়।

সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক শিক্ষা

সহিংসতা রোধে ইসলাম পারিবারিক ও সামাজিক নৈতিকতাকে জোরদার করে। মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, বিদ্বেষ-এসব মানসিক সহিংসতার জন্ম দেয়। কোরআন এগুলো নিষিদ্ধ করেছে। ভালো কথা বলা, দয়া প্রদর্শন, প্রতিবেশীর হক আদায়-এসব সমাজে বিশ্বাস ও নিরাপত্তা বাড়ায়।

সংলাপ ও পরামর্শের নীতি

ইসলাম মতভেদে সহিংসতা নয়, সংলাপকে অগ্রাধিকার দেয়। কোরআনে শূরার নীতি এসেছে, পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত। যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ আছে। ‘হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো।’ [সুরা নাহল : ১২৫] সংলাপ সংঘাত প্রশমনের কার্যকর উপায়।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইসলামের বার্তা

আজকের বিশ্বে রাজনীতির নামে সহিংসতার অপব্যবহার দেখা যায়। অথচ কোরআন-হাদিসের প্রকৃত শিক্ষা শান্তি, ন্যায় ও মানবকল্যাণ। মুসলিম সমাজের দায়িত্ব- স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা, শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো, আইনগত ও সামাজিক কাঠামোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

ইসলামের লক্ষ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা

ইসলাম সহিংসতা প্রতিরোধে একটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়। মানবজীবনের পবিত্রতা, ন্যায়বিচার, আত্মসংযম, ক্ষমা, সংলাপ ও মানবিকতার সমন্বয়ে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে সহিংসতা ইসলামের আদর্শ নয়; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য। ব্যক্তি ও সমাজ যদি এই নীতিগুলো ধারণ করে, তবে সহিংসতা হ্রাস পাবে এবং নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর