Logo

ধর্ম

ইতিহাসের আয়নায় সিয়াম সাধনা

Icon

আমানুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:১৪

ইতিহাসের আয়নায় সিয়াম সাধনা

সিয়াম বা রোজা কেবল ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভই নয়; বরং এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। পবিত্র রমজান মাস এলে মুসলিম বিশ্ব এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশে প্রবেশ করে। কিন্তু এই সিয়াম সাধনার শুরুটা ঠিক কবে বা কীভাবে হয়েছিল এবং এর পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও যুক্তিই বা কী- তা জানার আগ্রহ অনেকেরই। ইতিহাসের পাতা থেকে রোজার বিবর্তন ও এর অন্তর্নিহিত দর্শনটি একটু গভীরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে দেখা যায়, এটি যুগে যুগে মানুষের আত্মিক প্রশান্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

আরবি ‘সিয়াম’ বা ‘সাওম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘বিরত থাকা’। শরিয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় ইন্দ্রিয়গত তাড়না থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিরত থাকাই হলো সিয়াম। রোজা রাখার এই বিধান শুধু শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জন্যই খাস বা নির্দিষ্ট ছিল না। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া (সংযম) অর্জন করতে পারো।”

কোরআনের এই আয়াতের ঐতিহাসিক সত্যতা প্রাচীন সভ্যতা ও অন্যান্য ধর্মের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। ইহুদি ধর্মে ‘ইওম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিনে উপবাসের বিধান রয়েছে। হযরত মুসা (আ.) তূর পাহাড়ে তাওরাত কিতাব লাভের আগে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। একইভাবে, হযরত ঈসা (আ.) বা যিশু খ্রিস্টও ৪০ দিন রোজা পালন করেছেন বলে জানা যায়। খ্রিষ্টধর্মে ‘লেন্ট’ বা ৪০ দিনব্যাপী উপবাস ও সংযমের প্রথা রয়েছে। হিন্দুধর্মেও ‘একাদশী’ বা বিভিন্ন তিথিতে উপবাসের বিধান আছে। শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত শরীরকে সুস্থ ও পবিত্র রাখতে মাসে অন্তত তিন দিন উপবাস রাখা প্রয়োজন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস ও প্লেটো তাঁদের শিষ্যদের জ্ঞানচর্চার আগে উপবাসের নির্দেশ দিতেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিসও রোগ নিরাময়ে উপবাসের পরামর্শ দিতেন। অর্থাৎ, আত্মিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য উপবাস যে একটি যৌক্তিক ও কার্যকর পদ্ধতি, ইতিহাস তার বড় প্রমাণ।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় অবস্থানকালে রোজার কোনো সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক বিধান ছিল না। তখন নবী করিম (সা.) এবং সাহাবিরা প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়ামে বিয) এবং মহররমের ১০ তারিখ (আশুরার দিন) স্বেচ্ছায় রোজা রাখতেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম সমাজ যখন নতুনভাবে গড়ে উঠছিল, তখন এক কঠোর আত্মশৃঙ্খলার প্রয়োজন ছিল। হিজরতের দ্বিতীয় বছর (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে) শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আয়াত নাজিল হয়। মাস হিসেবে রমজানকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল শুরু হয়েছিল। তাই স্রষ্টার বাণী প্রাপ্তির এই মাসটিকে সম্মান জানানোর জন্য এক মাসব্যাপী সিয়াম পালন বাধ্যতামূলক করা হয়।

আধুনিক বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘ সময় উপবাস বা ‘ফাস্টিং’ মানবদেহের জন্য কতটা উপকারী। ২০১৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহসুমি ‘অটোফেজি’ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। তিনি দেখান, উপবাসের সময় শরীর তার ভেতরের মৃত ও ক্ষতিকর কোষগুলোকে ধ্বংস করে নিজেকে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ করে তোলে। হাজার বছর আগের একটি ধর্মীয় বিধানের সাথে আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন সত্যিই বিস্ময়কর।

পরিশেষে বলা যায়, রোজার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, এটি শুধু না খেয়ে থাকার কোনো প্রথা নয়। এটি স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য, নিজের প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার একটি প্রাচীন ও যথার্থ প্রশিক্ষণ। ১৪০০ বছর আগে মদিনায় যে সিয়াম সাধনার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল, তা আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখাচ্ছে।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট,পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ

ইমেইল: amanurrahman.world@gmail.com

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর