Logo

ধর্ম

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৯

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত

ইসলাম ধর্মে রমজান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এক বিশেষ নিয়ামত ও রহমতের মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা রোজা ফরজ করেছেন, কোরআন নাজিল করেছেন এবং বান্দার গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ রেখেছেন। রমজান মাস কেবল উপবাসের মাস নয়; বরং এটি তাকওয়া অর্জন, আত্মসংযম, নৈতিক উৎকর্ষ ও আল্লাহমুখী জীবনের এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল।

রমজান মাসের পরিচয় ও তাৎপর্য

‘রমজান’ শব্দটি আরবি ‘রমদ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দহন বা জ্বালিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ এই মাস মুমিনের গুনাহসমূহ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়। রমজান হলো সেই মাস, যে মাসে মানুষের হৃদয় আল্লাহভীতিতে উজ্জ্বল হয়, পাপাচার থেকে দূরে থাকার চেতনা জাগ্রত হয় এবং ইবাদতের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ [সুরা বাকারা : ১৮৩] এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন।

রমজান মাসে কোরআন নাজিল

রমজানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মর্যাদা হলো-এই মাসেই কোরআন মাজিদ নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘রমজান মাস-যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত।’ [সুরা বাকারা : ১৮৫] এ কারণে রমজানকে কোরআনের মাস বলা হয়। এ মাসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা, এর অর্থ অনুধাবন করা এবং জীবনাচরণে বাস্তবায়নের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সালাফে সালেহিন রমজানে কোরআন তিলাওয়াতে বিশেষ মনোযোগ দিতেন।

রোজার ফজিলত ও মর্যাদা

রমজানের প্রধান ইবাদত হলো রোজা। রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। রোজা শুধু পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং যাবতীয় পাপাচার, মিথ্যা, গিবত, হিংসা ও অশ্লীলতা থেকে আত্মসংযমের নাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] আরেক হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ এতে বোঝা যায়, রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন, যা মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে।

রমজান মাসে জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থা

রমজানের বিশেষ ফজিলতের মধ্যে একটি হলো-এই মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। হাদিসে এসেছে- ‘রমজান এলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ [বুখারি ও মুসলিম] এটি প্রমাণ করে, রমজান মাসে নেক আমলের পরিবেশ সহজতর হয়ে যায় এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা তুলনামূলক সহজ হয়।

লাইলাতুল কদরের মহিমা

রমজানের সবচেয়ে মহিমান্বিত রাত হলো লাইলাতুল কদর। এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ [সুরা কদর : ৩] এই রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে অবতরণ করেন এবং শান্তি বর্ষিত হয়। যে ব্যক্তি এই রাতে ইবাদতে মশগুল থাকে, তার জীবনের মোড় ঘুরে যেতে পারে।

রমজান আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের মাস

রমজান মাস মানুষকে ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সংযম শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে ধনী-গরিবের ব্যবধান অনুভব করায় এবং অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি জাগ্রত করে। এ মাসে সদকা, দান-খয়রাত ও যাকাত আদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রমজান মানুষকে মিথ্যা পরিহার, অন্যায় থেকে বিরত থাকা ও উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। এ মাসের শিক্ষা যদি সারাবছর ধরে রাখা যায়, তবে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে।

রমজান অবহেলার পরিণতি

রমজান পেয়েও যে ব্যক্তি গুনাহ মাফ করাতে ব্যর্থ হয়, তার জন্য রয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা। হাদিসে এসেছে- ‘সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমজান মাস পেল অথচ তার গুনাহ মাফ হলো না।’ এটি আমাদের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়। তাই রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত, তওবা ও আত্মশুদ্ধিতে কাজে লাগানো উচিত।

অতুলনীয় নেয়ামত

রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অতুলনীয় নেয়ামত। এটি ক্ষমা, রহমত ও নাজাতের মাস। রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, তারাবি, দোয়া, ইস্তিগফার ও নেক আমলের মাধ্যমে এই মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলেই প্রকৃত সফলতা অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে রমজান মাসের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করে তার পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর