মাতৃভাষা মানুষের জীবনের প্রথম আলো, প্রথম সুর ও প্রথম পরিচয়। শিশুর জন্মের পর যে ভাষায় সে মায়ের স্নেহমাখা ডাক শুনে, যে ভাষায় সে পৃথিবীকে চিনতে শেখে-সেই ভাষাই তার মাতৃভাষা। মাতৃভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও আত্মার প্রতিচ্ছবি। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অপরিসীম।
মানুষের চিন্তাভাবনা ও মানসিক বিকাশে মাতৃভাষার ভূমিকা সবচেয়ে গভীর। মানুষ প্রথম চিন্তা করতে শেখে মাতৃভাষায়, স্বপ্ন দেখে মাতৃভাষায় এবং অনুভূতির গভীরতম স্তরেও মাতৃভাষাই আশ্রয় নেয়। অন্য ভাষা শেখা যায় শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে, কিন্তু মাতৃভাষা হৃদয়ের ভেতর জন্ম নেয় স্বাভাবিকভাবেই। এ কারণেই মাতৃভাষায় প্রকাশিত অনুভূতি হয় সবচেয়ে সাবলীল, প্রাণবন্ত ও আন্তরিক।
শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গবেষণায় প্রমাণিত, প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা যদি মাতৃভাষায় হয়, তবে শিক্ষার্থীর উপলব্ধি ও চিন্তাশক্তি অনেক বেশি বিকশিত হয়। মাতৃভাষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান হয় স্থায়ী ও গভীর। যে জাতি মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দেয়, সে জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যায়। মাতৃভাষা তাই কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি উন্নয়ন ও অগ্রগতিরও শক্ত ভিত।
মাতৃভাষা একটি জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, গান, কবিতা, ইতিহাস ও সামাজিক মূল্যবোধ। মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে কেবল শব্দ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি জাতির আত্মা। তাই ভাষা রক্ষা মানে সংস্কৃতি রক্ষা, আত্মপরিচয় রক্ষা। মাতৃভাষার মাধ্যমেই একটি জাতি নিজের স্বকীয়তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারে।
ইসলামেও ভাষার গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণে সৃষ্টি করেছেন-একে তিনি তাঁর নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।’ [সুরা রুম : ২২] এ আয়াত প্রমাণ করে, মাতৃভাষা আল্লাহ প্রদত্ত এক মহামূল্যবান নিয়ামত, যার মাধ্যমে মানুষ পরস্পরকে চিনে ও বোঝে।
বাংলা ভাষাভাষী জাতির ইতিহাসে মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠত্ব সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য তরুণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়ার এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে-ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।
মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি দিক হলো এর মানবিক শক্তি। মাতৃভাষায় কথা বললে মানুষ আপন হয়ে যায়, দূরত্ব কমে আসে। মায়ের ভাষায় উপদেশ, দোয়া বা ভালোবাসার কথার প্রভাব অন্য যেকোনো ভাষার চেয়ে অনেক গভীর। বিপদে-আপদে, আনন্দে-বেদনায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাতৃভাষার কাছেই ফিরে আসে। এটি প্রমাণ করে-মাতৃভাষা মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের ভাষা।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগে অনেকেই মাতৃভাষাকে অবহেলা করে ভিনভাষায় অধিক গর্ব অনুভব করে। বিদেশি ভাষা শেখা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়। মাতৃভাষার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই অন্য ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা উচিত। মাতৃভাষাকে দুর্বল করে কোনো জাতি কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
মাতৃভাষা রক্ষার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্র বা শিক্ষাব্যবস্থার নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবারে মাতৃভাষার চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মাতৃভাষার ব্যবহার-এসবের মাধ্যমেই ভাষা টিকে থাকে ও সমৃদ্ধ হয়। প্রযুক্তির জগতে মাতৃভাষার ব্যবহার বাড়ানোও আজ সময়ের দাবি।
মাতৃভাষা মানুষের আত্মার ভাষা, জাতির পরিচয়ের মূল ভিত্তি। মাতৃভাষার গুরুত্ব শুধু অতীতের গৌরবেই সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। মাতৃভাষাকে ভালোবাসা, লালন করা ও সম্মান করা মানেই নিজের অস্তিত্বকে সম্মান করা। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে, তার শ্রেষ্ঠত্বকে হৃদয়ে ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

