Logo

ধর্ম

আধুনিক সমাজে রমজানের চ্যালেঞ্জ ও আমাদের দায়িত্ব

Icon

ফয়সাল আহমদ

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২০

আধুনিক সমাজে রমজানের চ্যালেঞ্জ ও আমাদের দায়িত্ব

দুঃখজনকভাবে বর্তমান সমাজে রমজান মাসেও নানা ধরনের অসংগতি দেখা যায়। যেখানে এই মাসটি হওয়ার কথা সংযম ও ত্যাগের, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ভোগবিলাসিতা ও অপচয়ের প্রবণতা। ইফতারের নামে অতিরিক্ত খাবারের আয়োজন, মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেওয়া, রাত জেগে অনর্থক সময় কাটানো- এসব রমজানের মূল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।

অনেক দোকানদার রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। এটি মারাত্মক অনৈতিক ও অমানবিক। রমজান যেখানে শেখায় অন্যের কষ্ট লাঘব করতে, সেখানে কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষকে আরও কষ্ট দেয়। এটি রমজানের প্রকৃত শিক্ষার সাথে সরাসরি বিরোধ।

আবার অনেকে রোজা রাখেন ঠিকই, কিন্তু ইবাদতের মাসেও ঝগড়া-বিবাদ, কটুকথা, গীবত এবং অন্যান্য অন্যায় থেকে বিরত থাকেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট, মিথ্যা ছড়ানো এবং ফিতনা সৃষ্টি করা- এসব রোজার মর্যাদাকে নষ্ট করে দেয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রমজান শুধু পানাহার ত্যাগের মাস নয়, এটি সামগ্রিক চরিত্র সংশোধনের মাস। আমাদের উচিত এই মাসে নিজেদের জীবনযাত্রা সরল ও সাদাসিধে রাখা, অপচয় থেকে বিরত থাকা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা।

রমজানের শিক্ষা কী কেবল এক মাসের জন্য

রমজান মাস আমাদের যে শিক্ষা দেয়- আত্মসংযম, তাকওয়া, সততা, ধৈর্য, দানশীলতা, মানবিকতা- তা কি আমরা শুধু এই ত্রিশ দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব? নাকি এই শিক্ষাগুলো আমরা সারা বছর, সারা জীবন ধারণ করব?

রমজানের প্রকৃত সফলতা তখনই, যখন এর আলো আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়বে। যে মানুষ রমজানে মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাঁর উচিত সারা বছর মিথ্যা থেকে দূরে থাকা। যে মানুষ রমজানে দান করেছেন, তাঁর উচিত বছরের অন্যান্য সময়েও দরিদ্রদের সাহায্য করা। যে মানুষ রমজানে নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছেন, তাঁর উচিত সারা বছর সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

রমজান হলো একটি ট্রেনিং ক্যাম্প। এই এক মাস আমরা প্রশিক্ষণ নিই কীভাবে একজন সত্যিকারের মুমিন হতে হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে আসল পরীক্ষা শুরু হয় বাকি এগারো মাস। যদি রমজানের পর আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই, তাহলে এই পুরো প্রশিক্ষণই ব্যর্থ হয়ে যায়।

রমজান পরবর্তী জীবন: একটি নতুন শুরু

রমজান শেষ হওয়ার অর্থ এই নয় যে ইবাদত শেষ। বরং রমজান আমাদের শেখায় কীভাবে সারা বছর আল্লাহর কাছাকাছি থাকা যায়। শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিধান এসেছে যাতে রমজানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং তারপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।” (সহিহ মুসলিম)

এছাড়া প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা, প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা- এসবই সুন্নত। এভাবে আমরা সারা বছর রমজানের স্মৃতি ও শিক্ষা জীবিত রাখতে পারি।

রমজানে আমরা যে পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত করি, দান-সদকা করি, তাহাজ্জুদ পড়ি- এসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন কিছু কোরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাপ্তাহিক দান-সদকা- এগুলো অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে রমজানের রুহানি শক্তি সারা বছর আমাদের সঙ্গে থাকবে।

ব্যক্তি-সমাজে রমজানের সমন্বিত প্রভাব

রমজান শুধু ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজে। যখন একটি সমাজের অধিকাংশ মানুষ সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং দানশীল হয়ে ওঠেন, তখন সেই সমাজে অপরাধ কমে যায়, পারস্পরিক সম্প্রীতি বাড়ে এবং সবার জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

রমজান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা সবাই একই স্রষ্টার সৃষ্টি এবং একই মানব পরিবারের সদস্য। ধনী-গরিব, সাদা-কালো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একই সময়ে রোজা রাখি, একই সময়ে ইফতার করি। এতে সামাজিক সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়।

ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা এবং রমজানের দান-সদকা অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর এক কার্যকর উপায়। যদি প্রতিটি সচ্ছল মুসলমান নিয়মিত যাকাত দেন এবং রমজানে বেশি পরিমাণে দান করেন, তাহলে সমাজে দারিদ্র্য অনেকাংশে কমে যাবে।

উপসংহার: রমজানের মানুষ হয়ে ওঠার শপথ

রমজান শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু রমজানের মানুষ যেন আমাদের মধ্যে সারা বছর বেঁচে থাকে। রোজার মাধ্যমে যে আত্মসংযম শিখলাম, তা দিয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াব। যে ক্ষুধা অনুভব করলাম, তা দিয়ে দরিদ্রের কষ্ট বুঝব এবং তাদের পাশে দাঁড়াব। যে তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করলাম, তা দিয়ে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপকে আল্লাহভীরু করে তুলব।

রমজান আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রকৃত মুমিন তিনিই যিনি আল্লাহকে ভয় করেন এবং সৃষ্টির প্রতি দয়ালু। যিনি নিজের কথা ও কাজে সত্যবাদী, যিনি প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখেন, যিনি দুর্বলের পাশে দাঁড়ান, যিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকেন।

আসুন, এই রমজান থেকে আমরা নতুন করে শপথ নিই- রমজানের শিক্ষাকে আমরা শুধু একমাসের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য আঁকড়ে ধরব। আমরা হব সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দানশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ। আমরা গড়ে তুলব এমন এক সমাজ, যেখানে ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিকতা বিরাজ করবে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের এবং সেই শিক্ষা জীবনে ধারণ ও বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। তিনি যেন আমাদের রোজা, নামাজ, দান-সদকা এবং সমস্ত নেক আমল কবুল করেন এবং আমাদের জান্নাতবাসী করেন। আমিন।

রমজান এসেছে রহমত নিয়ে, রমজান যাবে ক্ষমা দিয়ে। কিন্তু আমরা থেকে যাব পরিবর্তিত মানুষ হয়ে, রমজানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে।

লেখক: প্রাবন্ধিক 

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর