এক মাসের সাধনায় এগারো মাসের দিশা
রমজানের শিক্ষায় জীবন গঠন
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৩
রমজান কেবল এক মাসের ইবাদত নয়; এটি মুমিনের জীবনে আল্লাহর প্রদত্ত এক বিশেষ শিক্ষা। এই মাসে রোজা, নামাজ, কোরআন পাঠ, দান-খয়রাত এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতা অর্জনের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে মূল শিক্ষা শুরু হয় রমজানের শেষে, যখন এই অভ্যাসগুলোকে বাকি এগারো মাসে জীবনে প্রয়োগ করা হয়। রমজানকে শুধুমাত্র মাসের ইবাদত হিসেবে না দেখে, সারাবছরের জীবনচর্চার ভিত্তি হিসেবে দেখা সবচেয়ে ফলপ্রসূ।
রমজানের মূল শিক্ষা
তাকওয়া ঈমানের ভিত্তি: রমজানের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহভীতি ও ঈমান বৃদ্ধি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের ওপর- যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন কর। (আল- কোরআন, সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
ফলাফল: নৈতিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি। পরিবার ও সমাজে সততা এবং দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা।
আত্মসংযম ও চরিত্রের উন্নয়ন: রোজা শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা নিয়ন্ত্রণ নয়; এটি ভাষা, দৃষ্টি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ শেখায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলার বা অসৎ কাজের অভ্যাস ধরে রাখে, তার রোজা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।-(সহিহ বুখারি: ১৯০৩)
ফলাফল: চরিত্র পরিশুদ্ধ হয়। পরিবার ও সমাজ নিরাপদ হয়। অহংকার ও অসৎ আচরণ থেকে দূরে থাকা।
সময় ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা: সাহরি, ইফতার ও নামাজের সময় আমাদের শেখায় সময় মানার গুরুত্ব।
ফলাফল: জীবনে অলসতা কমে। কাজের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন সুশৃঙ্খল
কোরআনের শিক্ষা বাস্তব জীবনে: রমজান কোরআন নাজিলের মাস। নিয়মিত কোরআন পাঠ ও অর্থ অনুধ্যান মানুষকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে।
ফলাফল: অন্যায় ও অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকা। দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা বজায় রাখা।
সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা: রোজা শেখায় ক্ষুধার্ত ও দুঃস্থদের কষ্ট বোঝা। যাকাত ও সদকা সমাজকল্যাণে রূপ দেয়। আল্লাহ বলেন, তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য কর।-(সূরা আল-মায়িদা:২)
ফলাফল: সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সমাজ ন্যায় ও শান্তির পথে এগোয়।
ধারাবাহিক ইবাদত: রাসুল (সা.) বলেছেন,আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা, যা নিয়মিত করা হয়-যদিও তা অল্প হয়।” (সহিহ মুসলিম: ৭৮৩)
ফলাফল: ধারাবাহিক ইবাদত ব্যক্তি ও পরিবারকে নৈতিকভাবে দৃঢ় রাখে। ঈমান জীবনের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরিবারে নৈতিক পরিবেশ: একসাথে ইফতার, নামাজ ও কোরআন পাঠ পরিবারে শান্তি ও শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে। সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে।পরিবারে সুখ ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় থাকে।
আত্মসমালোচনা ও তওবা: রমজান মানুষকে নিজের ভুল ও দুর্বলতার দিকে তাকাতে শেখায়। আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা কর।”(সূরা আত-তাহরীম:৮)
ফলাফল: আত্মসংশোধনের সুযোগ। অহংকার ও দম্ভ থেকে মুক্তি। নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।
দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব: রমজানের শিক্ষা- সততা, ধৈর্য ও শৃঙ্খলা- একজন দায়িত্বশীল নাগরিক গঠনে সহায়ক।
ফলাফল: আইন মানা ও অন্যের অধিকার রক্ষা। সম্পদের সঠিক ব্যবহার। সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন।
ধৈর্য ও সংকট মোকাবিলা: রোজা ধৈর্যের মাস। ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করার অভ্যাস মানুষকে জীবনের সংকট মোকাবিলায় দৃঢ় করে। (সূরা আল-বাকারা:১৫৫–১৫৭)
লক্ষ্য নির্ধারণ ও আত্মউন্নয়ন: নিয়মিত নামাজ, কোরআন পাঠ ও ইবাদতের পরিকল্পনা মানুষকে লক্ষ্য নির্ধারণ ও আত্মউন্নয়নে সহায়তা করে।
ফলাফল: পরিকল্পিত জীবনযাপন। ব্যক্তিগত উন্নয়ন।
পরিশেষে বলতে চাই, রমজান কেবল এক মাসের ইবাদত নয়; এটি বাকি এগারো মাসের জীবনযাত্রার জন্য দিশা দেয়। তাকওয়া, সংযম, শৃঙ্খলা ও সহমর্মিতা যদি জীবনে প্রয়োগ করা হয়, তবে মুমিনের জীবন আলোকিত হয়। পরিবার সুদৃঢ় হয় এবং সমাজ ন্যায়ের পথে এগিয়ে যায়। রমজান শুধু ইবাদতের মাস নয়; এটি বাকি এগারো মাসের প্রতিটি কার্যকলাপে জীবনের জন্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রমজানের শিক্ষা ধরে রাখার তৌফিক দিন, আমাদের চরিত্র ও জীবনকে নৈতিকতা ও সংযমের পথে পরিচালিত করুন, পরিবার ও সমাজকে শান্তি ও মঙ্গলপূর্ণ করুন। আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।
ইমেইল:drmazed96@gmail.com
বিকেপি/এমএম

