Logo

ধর্ম

বাঙালি সংস্কৃতিতে সম্প্রীতি ও হৃদ্যতার রমজান

Icon

রাশেদ বিন শফিক

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪০

স্নিগ্ধ শীতলতায় ছেয়ে গেছে পুবের আকাশ। চারিদিকে মনোরম পরিবেশ। জান্নাতি আবহে সেজেছে মুমিন হৃদয়। পরিবার থেকে পরিবারে চলছে প্রস্তুতি। কিশোরী -তরুণী ঘরের রানীরা খুশবোতে সাজাচ্ছেন আঙিনা।

পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা আর পবিত্রতা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত সকলে।

নামাজের কাপড় গুলো ধৌত করে নিচ্ছেন সকলকেই। মসজিদে মসজিদে, শহর গ্রামের পাড়া মহল্লায় উৎফুল্লতা আর সজিবতা অফুরান। শিশুদের কণ্ঠে আহলান সাহলান গান। তরুণ যুবারা রমজান নিয়ে কবিতা লিখছে, গান বানাচ্ছে, আর  মিছিলে মিছিল স্লোগান তুলছে ইয়া শাহরু রামাদান। বছর ঘুরে আবার এসেছে ইবাদতের বসন্ত রমজান। 

সাহরিতে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ মায়াভরা ডাক। এই আধুনিক যুগে এসেও হাজার বছরের সেই চিরচেনা আহবান, উঠো, জাগো, সাহরী বানাও!  বৃদ্ধরা মসজিদে কিয়ামুল লাইলে, কেউ বা ঘরের বারান্দায়। মহিলারা উনুনে বসিয়েছে হাঁড়ি। জায়নামাজে বিছিয়েছে হৃদয়। একান্তে ডাকছে মাবুদ রাত্রির অন্তে। একলা নিশিতে করজোড়ে মোনাজাত । মধুময় প্রেম স্বীয় রবের সাথে। আহা আহ্লাদী সুরে কত ফরিয়াদ। গোনাহের মাপি চাওয়া আর পরিবারের কল্যাণ, মা-বাবার নাজাত, জীবন সাথীর বরকতি হায়াত, সন্তানের সুখের আরাধনা আরো কতোশত একান্ত বাসনার আলাপে জলে ভেজে নয়নের পাতা।

আবারো মুয়াজ্জিনের ডাক, সাহরী খাওয়ার সময় হয়েছে। পরিবার মুরব্বিদের ডাকে সকলেই এক হয়েছে খাওয়ার টেবিলে অথবা বিছিয়ে নিয়েছে দস্তারখানা। ছোট বড় সকল সদস্য একসাথে সাহরি কী যে প্রেমময় উৎসব। প্রতিটি হৃদয়ের হৃদ্যতা বাড়ে, বরকতি নূর ঝরে অফুরান। মুসলিম পরিবার যেন হয়ে উঠে জান্নাতি বাগান।

জিকির তাসবির পাঠ মনের কোণায়। মাবুদকে ভুলে না কেউ দিনের ব্যস্ততায়। রবের হুকুম পালন সকলেই ব্রত। পানাহার আর জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত। কেউ কারো করছে না গীবত। পরনিন্দার পাপে রোজাকে উপবাসে পরিনত না করতে সকলেই তাই সাবধান। মাঠে- ঘাট, দোকান, হাটে কেউ বা অফিসে নিত্য দিনের কাজ সাড়ছে। খাবারের দোকানগুলো সীমিত আকারে খোলা। 

লোকালয়ে আহার করছেনা ভিন্নধর্মী ভাই বোন কেউ-ই। অফিসের কলিগ, ব্যবসার পার্টনার থেকে অজপাড়াগাঁয়ের বৃদ্ধ দাদা বাবুরাও এ দিকে খুব সচেতন।

রোজাদারদের প্রতি তাদের এই সম্মান পর্দশন। আমার বাংলার বুকে চমৎকার সম্প্রীতির নিদর্শন। মক্তবে, মসজিদে, মাদরাসা প্রাঙ্গণে কেরাত প্রশিক্ষণ।  সোনামণি, শিশু -কিশোরেরা শিখছে কোরআন। কোরআন নাজিলের মাসে কোরআনের সুরে সুরে মুহিত চারিপাশ। বাংলা, ইংরেজি মিডিয়াম থেকে, মাদরাসা, স্কুুল, কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে ভরে উঠেছে প্রতিটি কোরআন শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। 

যুহরের সালাতের পর মসজিদের বারান্দায় একঝাঁক মুসল্লীর মজমা। কেউ তালিম দিচ্ছেন কেউ শুনছেন তালিম। এক কোণে কেউ তেলাওয়াতে মগ্ন কেউ বা পড়ছেন হাদিসের বই। 

গুনগুন  তেলাওয়াতে শোনা যায় ও বাড়ি থেকে সে বাড়ি। কী মোহনীয় আমেজ, জান্নাতি পরিবেশ। বেলা যখন গড়ায়, মহিলাদের কাজ বাড়ে। আনন্দ অনুভবে ক্লান্তি তাদের ছুঁতে পারে না। ইফতার তৈরির আয়োজন। বড় ছোট সকলে মিলেমিশে কাজ করছে। একে অপরের সহযোগিতায় নানা পদের ইফতারি বানাচ্ছে। আসরের নামাজের পর পর শিশুরা দল বেঁধে ইফতার ভরা বাটি হাটি ছুটছে মসজিদে, মক্তবে, মাদরাসায়। অনেকে বিলি করছে উন্মুক্ত ইফতাররে মজলিস খানায়। এই ঘর থেকে ঐ ঘরে হচ্ছে ইফতার আদান-প্রদান। ভালোবাসা আর মমতার সেতুবন্ধন। বিবাদ বিভেদ ভুলে ঘরে ঘরে ভালোবাসা হাদিয়া তোহফার ইফতারি উৎসব।  

মাগরিবের সালাতের পর পরই ছেলেপুলেরা এশার আজানের অপেক্ষায়। আজ এক মসজিদ আবার আগামীকাল আরেক নতুন মসজিদে তাদের সফর। প্রশান্তির খুঁজে তারাবির সালাতে মুসল্লীরা শামিল হয়েছেন। হাফেজে কোরআন সামনের কাতারে খতমে কোরআনের ইমামতি করছেন। সুরেলা কণ্ঠে বিভোর সকলেই। সুনশান-নিস্তব্ধ কবরগুলোতে যেন ভেসে যাচ্ছে সেই তেলাওয়াতের সুর, আজাব তাদের থেকে নিশ্চিত দূরত্ব বজায় রাখবে।

রবের শোকরিয়া আদায় আর গোনাহ মাপের রোনাজারিতে প্রতিটি মোনাজাত মুমিনের ফোঁপানো কান্নায় ভরে ওঠে। জাতীর কল্যান কামনা, বিশ্বের প্রতিটি মুসলমান, মজলুমানের জন্য দিলের দরদ দিয়ে সকলের প্রার্থনা।

হাজার বছরের বাঙালির সংস্কৃতিতে রমজানের এই চিত্র চির বহমান। আমাদের রমজান হোক আমাদের ইবাদত, আমাদের কালচার, আমাদের আগামীর উজ্জ্বলতার। আমাদের রমজান হোক ক্ষমা থেকে মুক্তির হাতিয়ার। অন্যায়, অনীতি, কারো প্রতি জুলুম অবিচার এবং সকল রকমের পাপ থেকে আজীবন বেঁচে থাকার প্রতিজ্ঞার।

লেখক: কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, রাজনগর, মৌলভীবাজার

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর