সালাতুত তারাবিহ: দীর্ঘ কিয়ামে আত্মার প্রশান্তি
মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩১
‘তারাবি’ শব্দটি আরবি তারবিহাতুন-এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থ- বিশ্রাম নেওয়া, প্রশান্তি লাভ করা। পরিভাষায় রমজান মাসে এশার নামাজের পর আদায়কৃত বিশেষ সুন্নত নামাজই হলো সালাতুত তারাবিহ। দীর্ঘ কিয়াম, তিলাওয়াত ও ইবাদতের মাঝখানে বিরতির মাধ্যমে মুমিনের দেহ-মন যখন প্রশান্ত হয়, তখন এই নামাজ যেন আত্মার জন্য এক অনন্য বিশ্রামক্ষেত্রে পরিণত হয়।
তারাবিহ নামাজে সাধারণত চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া হয়। এই বিরতির কারণেই নাম হয়েছে ‘তারাবিহ’। ফকিহদের মতে, ২০ রাকাত তারাবিহ সুন্নতে মুআক্কাদা। পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাতে আদায় করা উত্তম, আর নারীরা নিজ গৃহে আদায় করবেন। জামাতে অংশ নিতে না পারলে একাকী আদায় করলেও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয় না।
এশার নামাজের পর থেকে ফজর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে তারাবিহ পড়া যায়। একসঙ্গে ২০ রাকাত আদায় সম্ভব না হলে ভাগ করে পড়ারও সুযোগ রয়েছে। যেহেতু এটি সুন্নত ইবাদত, তাই কোনো কারণে আদায় করতে না পারলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে এর ফজিলত ও বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়া বড় আফসোসের বিষয়।
তারাবিহ নামাজের অন্যতম সৌন্দর্য হলো কোরআন তিলাওয়াত। পুরো রমজানে অন্তত একবার পূর্ণ কোরআন খতম করা সুন্নত- যা ‘খতম তারাবিহ’ নামে পরিচিত। এতে মুসল্লিরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কালাম শ্রবণের সৌভাগ্য লাভ করেন।
ঐতিহাসিকভাবে তারাবিহের জামাত সুসংগঠিত রূপ পায় উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে। তাঁর নির্দেশে সাহাবিগণ উবাই ইবনে কাব-এর ইমামতিতে ২০ রাকাত তারাবিহ জামাতে আদায় করেন। সেই ধারা আজও মক্কা-মদিনাসহ বিশ্বজুড়ে অব্যাহত।
বর্ণনায় এসেছে, তারাবিতে যেন খতম সম্পন্ন হয়- সে জন্য তিনি প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়াত পড়ার নির্দেশ দিতেন। হযরত আবু উসমান নাহদী (রহ.) বলেন, তিনি তিনজন ক্বারীকে ডেকে তাদের তিলাওয়াতের ধরণ অনুযায়ী একজনকে দ্রুত, একজনকে মধ্যম এবং একজনকে ধীর গতিতে তিলাওয়াত করার নির্দেশ দেন- যাতে রমজানজুড়ে কোরআন সুন্দরভাবে খতম হয়।
পরবর্তীতে উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর খেলাফতকালে তারাবিহে নিয়মতান্ত্রিক তিলাওয়াতের চর্চা আরও বিস্তৃত হয়। তাবেয়ি ও মুহাদ্দিসদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি রাকাতে সুবিন্যস্ত তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করা হয়।
মালিক ইবনে আনাস (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুআত্তা-তে বর্ণনা করেন, সাহাবা ও তাবেয়িগণ এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তারাবিহ আদায় করতেন যে সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত সাহরি করতে হতো। আবার সায়িব ইবনে ইয়াজিদ-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইমামরা শত শত আয়াত তিলাওয়াত করতেন- দীর্ঘ কিয়ামের ক্লান্তিতে সাহাবিরা কখনো লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।
ফকিহদের মতে, তারাবিতে ধীর-স্থির তিলাওয়াত, ভাবগম্ভীর কিয়াম এবং খুশু-খুযুর সঙ্গে নামাজ আদায় করাই মূল লক্ষ্য। বড় আয়াত হলে কম, ছোট আয়াত হলে বেশি- এভাবে পড়ে মুসহাফের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কথাও উল্লেখ করেছেন আলেমগণ।
লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদরাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

