চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজার স্বাস্থ্যগত ও আধ্যাত্মিক সুফল
ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:২৭
রোজা সম্পর্কে আধুনিক চিকিৎসক ও বিজ্ঞান যা বলেছেন তা নিয়ে আলোচনা করবো। অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেন, সর্বক্ষণ আহার সীমাতিরিক্ত ভোজন ও দূষিত খাদ্য খাওয়ায় শরীরে এক প্রকার বিষাক্ত উপকরণ ও উপাদানের সৃষ্টি হয় এবং জৈব বিষ জমা হয়। যার কারণে দেহের নির্বাহী ও কর্মসম্পাদন অঙ্গ প্রতঙ্গগুলো বিষাক্ত উপকরণ ও জৈব বিষ দমনে অক্ষম হয়। ফলে তখন জটিল ও কঠিন রোগের জন্ম হয়। দেহের মধ্যকার এমন বিষাক্ত ও দূষিত উপাদানগুলো অতিদ্রুত নির্মূলকরণের নিমিত্তে পাকস্থলিকে মাঝে মধ্যে খালি করা একান্ত প্রয়োজন। রোজাই এর একমাত্র সহায়ক। যার বিকল্প করা যায় না। মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, রোজা দ্বারা শরীরের ওজন সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা শরীরের কোন ক্ষতি করে না বরং শরীরের মেদ কমাতে রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অপেক্ষা অধিক কার্যকর। তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আলোকে আরও জানা যায়, যারা মনে করেন রোজা রাখলে শূল বেদনার প্রলোপ বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয় বরং ভোজনে তা বৃদ্ধি পায়।
পাকিস্তানের প্রবীণ প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হোসেনের নিবন্ধ থেকে জানা যায়, যারা নিয়মিত সিয়াম পালন করে সাধারণত তারা বাতরোগে, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে তুলনামূলক আক্রান্ত কম হয়। এছাড়া ডা. ক্লাইভসহ অন্যান্য চিকিৎসা বিজ্ঞানী পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, ইসলামের সিয়াম সাধনার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত ও ফলপ্রসূ, আর তাই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার রোগব্যাধি তুলনামূলকভাবে অন্য এলাকার চেয়ে কম দেখা যায়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম কম খাওয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। ক্ষুধা লাগলে খেতে বলেছেন এবং ক্ষুধা না লাগলে খাওয়া বন্ধ করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে দীর্ঘজীবন লাভ করার জন্য খুব বেশি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখন আধুনিক বিজ্ঞান ও কিছু অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত উল্লেখ করা হলো।
জার্মানির ডাক্তার ফেডারিক হানেমান (জন্ম ১৭৫৫ মৃত্যু ১৮৮৪) বলেছেন, “রোজার মাধ্যমে মৃগীরোগ, গ্যাস্টিক ও আলসারের চিকিৎসা করা যায়। ইটালির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী মাইকেল এংলো ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। ৯০ বছর বয়স পার হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মক্ষম ও কর্মঠ ছিলেন। তাকে এর রহস্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, আমি বহু দিন আগ থেকেই মাঝে মাঝে রোজা রেখে আসছি। আমি প্রত্যেক বছর এক মাস, প্রত্যেক মাসে এক সপ্তাহ রোজা রাখি এবং দিনে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খাবার খাই।
ক্যাব্রিজের ডাক্তার লেখার জিম। তিনি ছিলেন, ফার্মাকোলজি বিশেষজ্ঞ। সব কিছু গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে তার স্বভাব। তিনি রোজাদার ব্যক্তির খালি পেটের খাদ্য নালীর লালা স্টোমক সিক্রেশন সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করেন। এতে তিনি বুঝতে পারলেন, রোজার মাধ্যমে ফুডপাটি কোলস সেপটিক সম্পূর্ণ আরো দেহের সুস্থতার বাহন। বিশেষত্ব পাকস্থলীর রোগের আরোগ্য গ্যারান্টি।
মহাত্ম গান্ধীর ইচ্ছা। মহাত্ম গান্ধীর উপোস থাকার ঘটনা সর্বজনবিদিত। ফিরোজ রাজ লিখিত দাস্তানে গান্ধীতে লেখা রয়েছে। তিনি রোজা রাখা পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন মানুষ খাবার খেয়ে নিজের দেহকে ভারী করে ফেলে। এরকম ভারী অলস দেহ দুনিয়ার কোনো কাজে আসে না। তাই তোমরা যদি তোমাদের দেহ কর্মঠ এবং সবল রাখতে চাও তবে দেহকে কম খাবার দাও। তোমরা উপাস থাকো। সারা দিন জপ তপ করো আর সন্ধ্যায় বকরির দুধ দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করো। (দাস্তানে গান্ধী)।
সিগমন্ডনারায়েড মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানীর মন্তব্য। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মনস্তত্ত্ব বিশারদ। তার আবিষ্কৃত থিওরী মনস্তত্ত্ব ক্ষেত্র পথনির্দেশকের ভূমিকা পালন করে। তিনিও রোজা এবং উপবাসের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি বলেন, রোজার মাধ্যমে মস্তিষ্কের এবং মনের যাবতীয় রোগ ভালো হয়। মানুষ শারীরিকভাবে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির দেহ ক্রমাগত বায়ুচাপ সহ্য করার যোগ্যতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি খিঁচুনি এবং মানসিক রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে। এমনকি কঠিন রোগ থেকে মুক্তি লাভ করে এবং এর রোগের সম্মুখীন হওয়া থেকে বিরত থাকে।
আলেকজান্ডার গ্রেট এবং এরিস্টল। উল্লিখিত দু’জনই ছিলেন অধিবাসী। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা বিশ্বখ্যাত। তারা মাঝে মাঝে ক্ষুধার্ত বা উপবাস থাকাকে দেহের সুস্থতা ও সবলতার জন্য খুবই উপকার বলে মনে করেন।
আলেকজান্ডার গ্রেট বলেন, আমার জীবনে অনেক ব্যতিক্রম ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এবং ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, সকাল-সন্ধ্যা যে আহার করে সে রোগমুক্ত। আমি ভারতে এরকম প্রচণ্ড উষ্ণ এলাকা দেখেছি। সেখানে সবুজ গাছপালা পুরে গেছে। কিন্তু সেই তীব্র গরমের মধ্যেও আমি সকালে এবং বিকালে খেয়েছি। সারাদিন কোনো প্রকার পানাহার করিনি। এর ফলে আমি অনুভব করেছি এক নতুন অফুরন্ত প্রাণশক্তি (আলেকজান্ডার গ্রেট, মাহফুজুর রহমান আখর তারী)।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র প্রফেসর’স মোরপান্ড বলেছেন, আমি ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি জানার চেষ্টা করেছি। রোজা অধ্যায় অধ্যয়নের সময় আমি খুবই মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছি। চিন্তা করেছি ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য এক মহাফর্মুলা দিয়েছে। ইসলাম যদি তার অনুসারীদেও কোনো বিধান না দিয়ে শুধু রোজা দিত তবুও এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কিছু হত না।
বিষয়টি নিয়ে আমি একটু গভীর চিন্তায় মনোনিবেশ করলাম। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য আমি মুসলমানদের সাথে রোজা রাখতে শুরু করলাম। দেখলাম রোগ অনেকটাই কমে গেছে। আমি রোজা চালিয়ে গেলাম এতে দেহ আরো উন্নতি পরিবর্তন উপভোগ করলাম। কিছুদিন পর লক্ষ করলাম আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি। এক মাস পর আমি নিজের মাঝে এক অসাধারণ পরিবর্তন অনুভব করলাম। (রসালানঈ দুনিয়া)। পাকিস্তানের বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সার্ভে রিপোর্ট। রমজান মাসে নাক, কান, গলার অসুখ কম হয়। জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম এ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য এক রমাজন মাসে পাকিস্তান আসে। তারা গবেষণাকর্মের জন্য পাকিস্তানের করাচী, লাহোর ও ফয়সালাবাদ শহরকে মনোনীত করেছেন। সার্ভে করার পর তারা যে রিপোর্ট দিলেন তার মূল কথা ছিলো- মুসলমানরা নামাজের জন্য যে অজু করে সেই অজুর কারণে নাক, কান, গলার অসুখ কম হয়। খাদ্য কম খাওয়ার কারণে পাকস্থলী এবং লিভারের অসুখ কম হয়। রোজার কারণে তারা মস্তিষ্ক এবং হৃদরোগের আক্রান্ত কম হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা পালন করা মুসলমানদের উপর ফরজ। এ ফরজ আদেশ প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে মুসলিম সমাজে স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকে মুসলিম উম্মাহ এই পবিত্র মাসে রোজা রাখার রেওয়াজ চালু করে আসছে। রোজা কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়; এটি বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্যকর অনুশীলন এবং মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য উৎস।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান এই মাসে রোজা পালন করেন। তারা আল্লাহ তাআলার প্রতি নিজেদের আত্মনিবেদন প্রকাশ করেন। এ আত্মনিবেদনের পেছনে কোনো ইহলৌকিক লাভের আশা থাকে না। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। রোজা মানুষের মন ও দেহকে প্রশিক্ষণ দেয়- দেহকে অনাহারে শক্তি সঞ্চয় করতে শেখায় এবং মনকে ধৈর্য, ধ্যান ও আত্মসংযমে অভ্যস্ত করে।
চিকিৎসা ও বিজ্ঞান বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে রোজার স্বাস্থ্যসম্মত দিকগুলো স্বীকৃত করেছে। এটি হজমতন্ত্র ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, অতিরিক্ত চর্বি ও ক্ষতিকর টক্সিন দূরীকরণে সহায়ক, এবং শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও, রোজা মানসিক প্রশান্তি, হৃদয়শুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রোজা কেবল শারীরিক বা মানসিক উপকারের জন্য নয়, এটি মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ, ইবাদত ও নৈতিক চরিত্রের বিকাশের মাধ্যম। মহান আল্লাহ তা’আলা জাল্লা শানহু আমাদেরকে সঠিক আকিদা, নৈতিকতা এবং সদ্যাচার্য আচরণের মাধ্যমে জীবন গঠনের তাওফিক দান করুন। আমাদেরকে হাকিকতসম্মতভাবে ইবাদত করতে সক্ষম হবার নাজাত ও বরকত দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ই-মেইল:drmazed96@gmail.com
বিকেপি/এমএম

