Logo

ধর্ম

প্রিয়তমের টানে মদিনার পথে

Icon

মাওলানা হুসাইন আহমদ কামাল

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৩

প্রিয়তমের টানে মদিনার পথে

মদিনার পথে আমার যাত্রা নতুন নয়। বহুবার সেখানে পা পড়েছে, বহুবার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে রওজা মোবারকের নীরব নুরানি ডাক। তবু কী আশ্চর্য- মন কখনোই তৃপ্ত হয় না। মনে হয়, কোথাও যেন অপূর্ণতা রয়ে যায়, যেন কিছু পাওয়ার আকুলতা আজও নিভে না।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশ্বাস অনুযায়ী আমিও বিশ্বাস করি- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হায়াতপ্রাপ্ত। তিনি রওজা মোবারকে সশরীরে জীবিত। একদল ফেরেশতা নিরন্তর মুমিন বান্দার দরুদ ও সালাম তাঁর দরবারে পৌঁছে দেন। এই বিশ্বাসই আমার হৃদয়ের অবলম্বন, আমার পথচলার আলো।

আমি একজন যাযাবর। বিরামহীন পথচলাই আমার পরিচয়। জীবনের পথে কত মানুষকে বিদেশমুখী হতে দেখেছি, কত আপনজনকে বিমানে তুলে দিয়ে বলেছি- ‘ফি আমানিল্লাহ’। কখনো কল্পনাও করিনি, জীবনের গোধূলিলগ্নে আমাকেও এভাবে আকাশপথে সফর করতে হবে। জানতাম না বিমানের নিয়ম-কানুন, জানতাম না আকাশে ভাসার অনুভূতি। শৈশবে ভাবতাম, বিমানে উঠলেই মানুষ ভয় পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এত উঁচুতে উঠলে আতঙ্কই তো স্বাভাবিক- আর ঘুম হয়তো সেই ভয় থেকে মুক্তির এক সহজ আশ্রয়।

কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখার পর একদিন এক কাজিনকে বলেছিলাম- আজও আমার বিমানে চড়ার শখ অপূর্ণ রয়ে গেছে। জানি না, কখনো তা পূরণ হবে কি না। তিনি সহজভাবে বলেছিলেন, ‘মিডল ইস্টের ভিসায় চলে যাও, আমি টাকা দেবো।’ হয়তো তিনি আমার কথা শুনেছিলেন, কিন্তু হৃদয়ের হাহাকারটি বোঝেননি। জীবিকার তাগিদে বিদেশযাত্রার প্রস্তাব দিলেও, আমার অন্তরের তৃষ্ণা যে ছিল অন্যখানে- তা তিনি জানতেন না।

সময় বহমান। যৌবনের জোয়ারে ভেসে গিয়ে হয়তো আমার আমলের জমিন খানাখন্দে ভরে গেছে। জীবনে চড়াই-উতরাই সবারই আসে। তবে আমার গল্পটি ছিল একটু ভিন্ন। প্রবাদ আছে- ‘হালবিহীন নৌকা চলে এঁকেবেঁকে।’ আমার জীবনতরিটাও যেন তেমনই ছিল। জন্মের প্রথম বছরেই পিতৃহারা এক শিশুর বেড়ে ওঠা যে কতটা অমসৃণ হতে পারে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন।

একসময় বিমানে চড়ার সেই শখটি অধরাই রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে আমার আকাশপথের যাত্রা শুরু হলো। আলহামদুলিল্লাহ- এ যাত্রা রুজি-রোজগারের সন্ধানে নয়, বরং প্রিয়তমের টানে মদিনার পথে। আমার রব নিজ হাতে সব আয়োজন করে দিয়েছেন। তিনিই আমাকে চালনা করছেন, আর আমি তাঁর দরবারে কেবল কৃতজ্ঞতার সিজদায় নত হচ্ছি। তাই তো আজ বিমানে বসে ঘুমিয়ে পড়িনি। বরং মদিনাকে লিখছি, হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকছি সোনালি মদিনার ছবি। সহস্র না-পাওয়ার ভিড়ে যেন হঠাৎ পাওয়া এক অমূল্য হীরের টুকরো- যা শুধু অনুভব করা যায়, শব্দে ধরা যায় না।

আজও আমি মদিনার পথে। প্রিয়তম নবীজির সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছি। যদি তাঁর দিদার নসিব হয়! যদি তিনি আমাকে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বলেন- ‘হুসাইন কামাল, তোমার মনের বেদনা কী, বলো?’

আমি তখন হয়তো কিছুই বলতে পারব না। অপলক নয়নে তাঁর নুরানি চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকব। বাক্য হারিয়ে যাবে, শব্দ স্তব্ধ হয়ে যাবে। শুধু অশ্রু ঝরবে- অঝোর ধারায়। সেই অশ্রু কি আমার মনের সব পঙ্কিলতা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবে না? আনন্দের আতিশয্যে হয়তো আমি সব ভুলে যাব, শুধু তাকিয়ে থাকব আমার প্রিয়তমের মুখপানে।

কিন্তু তখন আমি তাঁকে কী বলব? আমার তো গোটা জীবনটাই তাঁর চরণে উৎসর্গ করা। তাঁর নামে কুরবান হতে আমি দিওয়ানা। অথচ চারদিকে আজ মজলুমের আর্তনাদ, নারী ও শিশুর হাহাকার। আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠছে রোনাজারিতে। কত মুমিন ঈমান হারিয়ে বিদায় নিচ্ছে, কত নারী নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। দেশে দেশে মুসলমানদের রক্তে রঙিন হচ্ছে মাটি। আমি কীভাবে বলব- আমি ভালো আছি? কীভাবে তাঁকে সান্তনা দেব?

আসলে আমরা কেউই ভালো নেই। বিলাসিতার মোহে পড়ে আমরা পথ হারিয়েছি। আমাদের হাতেই আজ মুসলিম ভাইয়ের রক্ত। এই কলঙ্কিত হাত, এই নোংরা কথাগুলো- আমি কীভাবে নবীজির সামনে তুলে ধরব?

এই প্রশ্ন নিয়েই আমি মদিনার পথে। প্রিয়তমের টানে, অপরাধী হৃদয় নিয়ে, অশ্রুসিক্ত চোখে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও মাদরাসা শিক্ষক, (গত ২১ ফেব্রুয়ারি-২৬, ঢাকা-মদীনা ফ্লাইটে বসে প্রবন্ধটি লেখা)

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর