মুমিনের ইবাদতের বসন্ত রমজান। মহান মাবুদের খুশ হাসিলে খালিস দিলে রমজানে প্রতিটি পুণ্যের বিপরীতে দশটি করে সওয়াব মিলে। রাতের শেষ ভাগে সাহরী শেষে ফজর আদায়, দিনভর রোজা, ফরজ সালাত কায়েম, খাস নফল আমলে আত্মতৃপ্তি লাভ, সূর্যাস্তে বরকতি ইফতার, তারাবির সালাত আর কিয়ামুল লাইলে প্রভুর গোলামীতে বিভোর হওয়ার ঐশ্বরিক প্রেমের আয়োজন ভরা এই রমজান আমলে সালেহা অজর্নের সমৃদ্ধ এক মাস।
রমজান যেমন ইবাদতের তেমনি পাপ থেকে বিরত থাকার মাস। জীবনের পথচলায় তৈরি হওয়া বদঅভ্যেস থেকে মুক্ত থাকতে হবে। ছোট থেকে ছোট খারাপ কাজ পরিহার করে চলতে হয় রমজানে। পাপ যতো ছোট হোক সেটা ত্যাগ করাই রমজানের শিক্ষা। রমজানে চিরশত্রু ইবলিশ শিকল বন্দী থাকে, তবুও মানুষ ধোঁকায় পড়ে বিগত দিনের বদঅভ্যেসের কুফলে।
রমজান সংযম ও সাধনার মাস। পানাহার ও জৈবিক চাহিদার পাশাপাশি জবানের সংযম এ মাসে প্রবলভাবে জরুরি। জবান হেফাজত সম্পর্কে হাদিসে অনেক দিকনির্দেশনা রয়েছে।
হযরত উকবা ইবনে আমের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসুল! নাজাত কিসে? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি তোমার জবানকে হেফাজত করো, তোমার ঘর যেন তোমার জন্য যথেষ্ট হয়, তুমি তোমার ভুলের জন্য কান্না করো।’
সুতরাং আমাদের রোজাকে সুভাশাসিত ও পবিত্র রাখতে জবানের হেফাজত অপরিহার্য।
মিথ্যা থেকে জবান হেফাজত: : আজকাল দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় মানুষ মিথ্যা কথার অভ্যাসে ভয়াবহ ভাবে আক্রান্ত। জবান হেফাজতে মিথ্যা কথা আবশ্যিক ভাবেই পরিহার করতে হবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা মিথ্যা বলে তখন এর দুর্গন্ধে ফেরেশতারা তার নিকট থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়’। -(তিরমিযী হা.নং-১৯৭২)
মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা, তা সিরিয়াস বলা হোক অথবা রসিকতা করে। আমাদের জানা দরকার হাসি আনন্দের উদ্দেশ্যও মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো ব্যক্তি এরুপ কথা বলে, যা শুধু মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যেই। এ কথার জন্য সে দোজখের মধ্যে এত বেশি দূরে নিক্ষিপ্ত হবে, যতটা দূরত্ব রয়েছে আসমান এবং জমিনের মধ্যে। আসলেই মানুষের পদস্খলন অপেক্ষা মুখের স্খলন অধিক মারাত্মক। (বায়হাকী)।
গিবত থেকে জবান হেফাজত: জীবনের বাস্তবতায় অনেক সময়ই দেখা যায়, আমরা যখনি গল্পের আসর বা আড্ডায় অংশ নিই, কথায় কথায় যেন ব্যক্তি সমালোচনা উঠে আসে, বুঝে না বুঝে গীবত করতে শুরু করি। গীবত ভয়ংকর একটি পাপ। গীবত রোজাকে হালকা করে ধ্বংসপ্রায় করে তুলে। গীবত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন; গীবত (পরনিন্দা) যিনার (ব্যভিচার) চেয়ে জগন্য অপরাধ (বায়হাকী)
মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারীমের একটি আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেন, “তোমরা একে অপরের গীবত (পরনিন্দা) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দ করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবা কবুলকারী অসীম দয়ালু। (সূরা হুজরাত:১২)। রমজানেই আমাদেরকে গীবত থেকে বেঁচে থাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
গালাগালি থেকে জবান হেফাজত : কারো সাথে মতের অমিল হলে অথবা উত্তেজিত হলেই অনেকের মুখে বাজে গালাগাল শোনা যায়। ভিন্নমত ও বাকবিতণ্ডায় গালাগালি যেন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, অথচ গালাগালি যেমম একটা কবিরা গোনাহ তেমনি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হ্রাস করে। ইসলামি গালাগালির ব্যাপারে কঠিন ভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোন মুসলমানকে গালি দেওয়া গুনাহ’র কাজ এবং তাকে হত্যা করা কুফরি কাজ’। (সহিহ বুখারী)
সর্বোপরি জবানের মাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেওয়া,মানুষের হক নষ্ট করার সকল উপায় থেকেই আমাদের জবান হেফাজত রাখতে হবে, এ বিষয়ে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি)।
মুমিন হিসেবে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়ার পূণ্যময় এই মাসে দিলের পরিশুদ্ধতার পাশাপাশি জবানের হেফাজত করে মিষ্টভাষী ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হওয়ার তাওফিক রাব্বে কারীমের দরবারে সবিনয়ে কামনা করি।
লেখক : কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, রাজনগর, মৌলভীবাজার
বিকেপি/এমএম

