Logo

ধর্ম

ইফতারের ফজিলত ও তাৎপর্য

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৭

ইফতারের ফজিলত ও তাৎপর্য

রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক অনন্য নিয়ামত। এ মাসে রোজা ফরজ করা হয়েছে, যা আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ। রোজাদারের সারাদিনের ত্যাগ, সংযম ও ইবাদতের পর যে মুহূর্তটি আসে, তা হলো ইফতার। ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের সময় নয়; বরং এটি ইবাদতের অংশ, দোয়া কবুলের মহাসুযোগ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বিশেষ মুহূর্ত। কোরআন ও হাদিসে ইফতারের গুরুত্ব ও ফজিলত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

রোজা ও ইফতারের কোরআনি ভিত্তি

আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে রোজা সম্পর্কে ইরশাদ করেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ [সুরা বাকারা : ১৮৩]

রোজার উদ্দেশ্য যখন তাকওয়া অর্জন, তখন ইফতারও সেই তাকওয়ারই অংশ। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সংযমের পর আল্লাহর হুকুমে আহার গ্রহণ করাই হলো ইফতার। আল্লাহ বলেন- ‘অতঃপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ [সুরা বাকারা : ১৮৭] এই আয়াত প্রমাণ করে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে ইফতার করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সময় হলে ইফতার করাও আল্লাহর নির্দেশ।

ইফতার তাড়াতাড়ি করার ফজিলত

রাসুলুল্লাহ সা. ইফতার দ্রুত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা ইফতার করতে দেরি না করবে।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সময় হলে ইফতার করা সুন্নত এবং এতে কল্যাণ নিহিত রয়েছে। অযথা দেরি করা বা অতিরঞ্জিত সতর্কতা অবলম্বন করা রাসুল সা.-এর সুন্নতের পরিপন্থী।

ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়

ইফতারের সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো-এই সময়ে দোয়া কবুল হয়। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না-ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, মজলুমের দোয়া এবং রোজাদারের দোয়া, যখন সে ইফতার করে।’ [সুনান তিরমিজি] সারাদিন ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সংযমের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পর ইফতারের মুহূর্তে বান্দার অন্তর বিনয়ী ও আল্লাহমুখী থাকে। তাই এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

ইফতারের সময়ের মাসনুন দোয়া

রাসুলুল্লাহ সা. ইফতারের সময় যে দোয়াটি পড়তেন তা হলো- ‘যাহাবায-জামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরুক, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।’ অর্থ- তৃষ্ণা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব স্থির হলো। এ দোয়ার মাধ্যমে রোজাদার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সওয়াবের আশা করে।

অন্যকে ইফতার করানোর ফজিলত

ইফতারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-অন্যকে ইফতার করানো। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ [সুনান ইবনে মাজাহ] এ হাদিস ইসলামে সামাজিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই মিলে ইফতার করার মাধ্যমে সমাজে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।

সাদাসিধে ইফতার ও অপচয় বর্জন

ইসলাম কখনোই অপচয়কে সমর্থন করে না। ইফতারের নামে অতিরিক্ত খাবার আয়োজন, অপচয় ও প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা বিরোধী। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ [সুরা বনি ইসরাঈল : ২৭] রাসুল সা. সাধারণত খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন। এটি আমাদের জন্য শিক্ষা-ইফতার হবে সাদাসিধে, পরিমিত ও সুন্নতসম্মত।

ইফতার আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়

ইফতার আমাদের শেখায়-সংযমের পর আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে। ক্ষুধার মাধ্যমে মানুষ দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করে, আর ইফতারের সময় সেই অনুভূতি মানবিকতা ও দানশীলতায় রূপ নেয়। এভাবেই ইফতার আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম।

ইবাদতের অংশ

ইফতার শুধু রোজা ভাঙার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দোয়া কবুলের বিশেষ সময় এবং সামাজিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার এক মহান উপলক্ষ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইফতার আমাদের সংযম, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের উচিত-ইফতারের সময় সুন্নত মেনে চলা, দোয়ার প্রতি যত্নবান হওয়া, অন্যকে ইফতার করানো এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা। তাহলেই ইফতার আমাদের জন্য পরকালীন মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর