রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সুমহান বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে সমাগত মাহে রমজান। কোরআন নাজিলের এ মাস তেলাওয়াত, জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। সারাদিন সিয়াম সাধনা, রাতের বেলায় তারাবির নামাজ, যাকাত আদায়, শেষ দশকে এতেকাফ এবং শবে কদরের অনুপম মহিমা- সব মিলিয়ে রমজান আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের এক অতুলনীয় সুযোগ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এ মাসের সূচনাতেই শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় (সহিহ বুখারি, হা. ৩২৭৭)।
রমজানের ফজিলত অনন্য। একটি ফরজ আদায়ের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং নফল ইবাদত ফরজের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করে (বাইহাকি, হা. ৩৫৪৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রোজা রাখে ও রমজানের রাতে কিয়াম করে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয় (সহিহ বুখারি, হা. ৩৭৩৮)। এ মাসের প্রতিটি রাত্রে কল্যাণের আহ্বান ধ্বনিত হয়- “হে কল্যাণকামী, এগিয়ে আসো; হে অকল্যাণকামী, থেমে যাও” (তিরমিজি, হা. ৬৮২)। আরও সতর্কবাণী এসেছে, রমজান পেয়েও যে ব্যক্তি ক্ষমা অর্জনে ব্যর্থ হয়, সে ধ্বংসের যোগ্য (সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৯০৮)।
এমন বরকতময় মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক তরুণ ও কিশোর তারাবির নামাজকে কেন্দ্র করে শৃঙ্খলা ও মনোযোগে ঘাটতি প্রদর্শন করছে। কেউ ফরজ নামাজের পরই মসজিদ ত্যাগ করে, কেউ কয়েক রাকাত তারাবি পড়ে বের হয়ে যায়, আবার কেউ বিতিরের জামাতে অংশ না নিয়েই চলে আসে। কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় কোলাহল বা মোবাইল ব্যবহারে অন্য মুসল্লিদের ইবাদতে বিঘœ সৃষ্টি হয়। অথচ তারাবি রমজানের সুন্নতে মুয়াক্কাদা আমল; জামাতের সাথে পূর্ণ তারাবি আদায় করা এবং বিতিরে শরিক হওয়া অত্যন্ত গুরুত্ববহ।
এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ভূমিকা অপরিসীম। সন্তানদের ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক তদারকি ও দিকনির্দেশনা। সন্তানরা মসজিদে যাচ্ছে কি না, গেলে নামাজে মনোযোগী কি না—এসব বিষয়ে সচেতন থাকা সময়ের দাবি। সম্ভব হলে তাদের সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যাওয়া অথবা অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে পাঠানো কার্যকর হতে পারে। ধর্মীয় অনুশীলন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আত্মসংযমে প্রতিফলিত হয়- এ দায়িত্ব পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে সম্মানিত ইমাম-খতিবদের প্রতিও আবেদন- খুতবা, বয়ান ও নসিহতে তারাবি ও বিতিরের গুরুত্ব, জামাতে অংশগ্রহণের আদব এবং ছুটে গেলে করণীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিন। সহানুভূতিশীল ভাষায় তরুণদের সচেতন করে তুলুন, যাতে মসজিদ হয় তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিকাশের নিরাপদ কেন্দ্র।
রমজান কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; এটি সামাজিক সংশোধন ও আত্মসমালোচনারও সময়। আসুন, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ মাসের পূর্ণ বরকত অর্জনে আমরা সবাই আন্তরিক হই। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: পরিদর্শক, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)।
বিকেপি/এমএম

