মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি
প্রযুক্তির সঙ্গে সংযমের আহ্বান
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪১
রমজানুল মুবারক আমাদের জীবনের এক অমূল্য সময়। এটি শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণের মাস নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহিমান্বিত সুযোগ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন; গণনাযোগ্য কয়েকটি দিন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪) অর্থাৎ সময় স্বল্প হলেও, রমজানের প্রভাব চিরন্তন।
বর্তমান সমাজে প্রযুক্তি এবং বিনোদনের আধিক্য অনেকের কাছে রমজানকে নিছক ‘বিনোদনের মাস’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। প্রশ্ন হলো- আমরা কি সত্যিই রমজানের হকিকত ও মাহাত্ম্য বজায় রাখতে পারছি, নাকি প্রযুক্তির মায়াবী জালে হৃদয় হারাচ্ছে?
আধুনিক বিনোদন বনাম ইবাদত
রমজান এলেই প্রচারিত হয় নানা বিশেষ অনুষ্ঠান, নাটক ও সিরিয়াল। অনেক সময় এসব ইবাদতের পরিবর্তে মনকে বিভ্রান্ত করে এবং গাফিলতি বাড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন: ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করতে ব্যর্থ হল।
রমজানের বিশেষ রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যদি স্ক্রিনের সামনে রমজানের মহিমান্বিত সময়কে অকারণে, অর্থহীন বা নৈতিকভাবে ক্ষতিকর বিনোদনে ব্যয় করা। তবে ক্ষতি কত বড় হতে পারে তা বোঝা যায়। কোরআনে বলা হয়েছে: আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার কথাবার্তা ক্রয় করে।” (সূরা লুকমান: ৬) হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে ‘অসার কথাবার্তা’ বলতে গান, বাদ্যযন্ত্র বা এমন সব বিষয় বোঝানো হয়েছে যা মানুষকে বন্দেগি থেকে বিমুখ করে।
প্রযুক্তির দ্বৈত ভূমিকা
প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্দ নয়। এটি দ্বীনি শিক্ষার জন্য শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: অনলাইনে কোরআন তিলাওয়াত শোনা হাদিস বা তাফসিরের ভিডিও দেখা, আলেমদের দারস গ্রহণ, তবে অপব্যবহার সময় এবং মনকে নষ্ট করে। নবীজী (সা.) বলেছেন: দুটি নিয়ামত আছে যা অধিকাংশ মানুষ নষ্ট করে ফেলে- সুস্থতা এবং অবসর।
রমজান হলো এই অবসরকে ইবাদতের মাধ্যমে কাজে লাগানোর শ্রেষ্ঠ সময়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক মাধ্যম বা বিনোদনমূলক কন্টেন্টে সময় কাটানো আমাদের আত্মার ক্ষতি করে।
রমজানে ডিজিটাল সংযম
রমজানকে ফলপ্রসূ করতে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সংযম আনার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।
* সময় ব্যবস্থাপনা: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করুন। তিলাওয়াত, নামাজ বা জিকিরের মুহূর্ত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
* ধর্মীয় কন্টেন্ট অগ্রাধিকার দিন: বিনোদনের চেয়ে ইসলামি অ্যাপ, ভিডিও ও লাইভ দারসকে প্রাধান্য দিন।
* অনৈতিক কন্টেন্ট পরিহার করুন: অশ্লীলতা, গীবত বা অন্যায় আচরণ প্রচার করে এমন অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলুন।
* পারিবারিক আধ্যাত্মিক পরিবেশ: ইফতারের পরে পরিবারের সঙ্গে তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল বা দ্বীনি পাঠ করুন।
* সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযম: অহেতুক তর্ক, গীবত বা অর্থহীন স্ক্রলিং থেকে নিজেকে সংযত রাখুন। রোজা শুধু পেটের নয়, চোখ ও কানেরও হওয়া উচিত।
* প্রতিবেদন ও নোট তৈরির অভ্যাস: প্রতিদিনের আধ্যাত্মিক কার্যক্রম বা তিলাওয়াতের সময় নোট রাখুন। এটি অগ্রগতি মূল্যায়ন ও আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়।
* দ্বীনি শিক্ষার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার: সামাজিক যোগাযোগ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ধর্মীয় লাইভ দারস, কোরআন পাঠ ও হাদিস অধ্যয়নকে অগ্রাধিকার দিন।
* অনলাইনে ধর্মীয় কমিউনিটি: ইতিবাচক ও নৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করুন। এটি আত্মশুদ্ধি ও নফস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
* প্রযুক্তি ছাড়া ঘনিষ্ঠ সময়: প্রতিদিন অন্তত ১-২ ঘণ্টা প্রযুক্তি থেকে বিরতি নিন। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ধ্যানের জন্য সময় রাখুন।
* কন্টেন্টের গুণগত মান যাচাই: ভিডিও, আর্টিকেল বা পোস্ট দেখার আগে যাচাই করুন, এটি আপনার ইবাদত ও দ্বীনি চেতনা উন্নত করছে কি না।
* ছোট ইবাদত চ্যালেঞ্জ: প্রতিদিন একটি ছোট ইবাদত বা দোয়া, প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত রেখে সম্পন্ন করুন।
* পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করা: সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের জন্য ইসলামি শিক্ষামূলক কন্টেন্ট বাছাই করুন।
মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য
ইসলাম চরমপন্থা শেখায় না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত করেছি।” (সূরা আল-বাকারা: ১৪৩)
অতএব প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার চেয়ে সচেতন ও সংযত ব্যবহার কাম্য। রোজার মতোই, রমজান আমাদের স্ক্রিন ব্যবহারে সংযমী হতে শেখায়।
মনোবিজ্ঞান ও আত্মশুদ্ধি
রমজান মানসিক ও রূহানি পরিশীলনের সময়। প্রযুক্তির অপব্যবহার মনকে বিভ্রান্ত করে এবং মনোযোগ নষ্ট করে। তাই স্বচ্ছ মন ও হৃদয় রাখতে ডিজিটাল সংযম অপরিহার্য। প্রতিদিন লক্ষ্য করুন- কত সময় বিনোদনে এবং কত সময় নামাজ, তিলাওয়াত বা জিকিরে ব্যয় হচ্ছে।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার
যদি সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়, প্রযুক্তি রমজানের ইবাদতকে সমৃদ্ধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:
* কোরআন তিলাওয়াত শেখার ভিডিও।
* হাদিস ও তাফসির অনলাইনে অনুসরণ।
* পরিবার ও সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক যোগাযোগ।
* ইফতার বা রমজানের রাতগুলিতে কিয়ামুল লাইল।
* প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখি। এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক যাত্রার সহায়ক।
পরিশেষে বলতে চাই, রমজান আমাদের জন্য এক মহিমান্বিত আহ্বান। এটি আমাদের অন্তরকে আলোকিত করার, মনোবল বৃদ্ধি করার, নফস নিয়ন্ত্রণের এবং আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময়। এই মাসে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি আমাদের সময়ের সদ্ব্যবহার করি- তিলাওয়াত, নামাজ, জিকির, দোয়া ও দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে- তাহলে রমজান আমাদের হৃদয়, মন এবং আত্মাকে আলোকিত করতে পারে। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সচেতন ও সংযত ব্যবহার ছাড়া এটি বিভ্রান্তির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। ডিজিটাল পর্দার জালে আটকা না থেকে হৃদয়কে আলোকিত করুন। সংযম, মধ্যপন্থা এবং আধ্যাত্মিক সচেতনতার মাধ্যমে রমজান হোক নফস নিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার মহিমান্বিত সময়। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগান, যাতে আপনার জীবন ও আত্মা চিরস্থায়ী আধ্যাত্মিক শক্তি ও নৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে।
লেখক: কলাম লেখক ও ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।
ই-মেইল:drmazed96@gmail.com
বিকেপি/এমএম

