Logo

ধর্ম

রহমত, বরকত ও নাজাতের আলোকমালা

Icon

রাহেলা আক্তার

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫২

রহমত, বরকত ও নাজাতের আলোকমালা

রমযানের আত্মিক যাত্রা: আকাশের বুকে যখন এক টুকরো বাঁকা চাঁদ নরম আলো ছড়িয়ে জানিয়ে দেয়- রমযান এসেছে, তখন যেন পৃথিবীর বাতাসও বদলে যায়। মসজিদের মিনারে ধ্বনিত হয় তারাবির সুর, ঘরে ঘরে সেহরির আলো জ্বলে ওঠে, আর মানুষের অন্তরে শুরু হয় এক নীরব বিপ্লব- আত্মশুদ্ধির বিপ্লব।

রমযান শুধু একটি মাস নয়; এটি সময়ের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক পবিত্র নদী। যে নদীর প্রথম ঢেউ রহমত, দ্বিতীয় স্রোত বরকত, আর শেষ তরঙ্গ নাজাত।

রহমত: করুণার প্রথম বৃষ্টি

রমযানের প্রথম দশক যেন শুকনো হৃদয়ের মাটিতে নামা প্রথম বৃষ্টি। এ সময় আল্লাহর দয়া নেমে আসে অবিরাম। মানুষ তার সমস্ত ক্লান্তি, পাপ আর অনুতাপ নিয়ে দাঁড়ায় প্রার্থনার দরজায়। সেহরির অন্ধকারে যখন কেউ নিঃশব্দে বলে- “হে প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন”- তখন আকাশের ফেরেশতারা যেন তার মিনতি লিপিবদ্ধ করে।

পবিত্র আল-কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)

এই তাকওয়াই রহমতের প্রথম শিক্ষা। ক্ষুধা শেখায় সংযম, তৃষ্ণা শেখায় ধৈর্য, আর নীরবতা শেখায় আত্মসংলাপ।

বরকত: অন্তরের সবুজ অঙ্কুর

দ্বিতীয় দশকে রমযান হয়ে ওঠে বরকতের ঋতু। যেন অনাবৃষ্টির পরে মাঠে সবুজ অঙ্কুর গজিয়ে ওঠে। সময়ের ভেতর জন্ম নেয় এক অদৃশ্য প্রশান্তি। স্বল্প আহারেও তৃপ্তি, সীমিত আয়ে সন্তুষ্টি, ক্লান্ত শরীরেও ইবাদতের উচ্ছাস-এসবই বরকতের লক্ষণ।

ইফতারের টেবিলে যখন খেজুর ভাগাভাগি হয়, তখন শুধু খাদ্য নয়- ভাগ হয় সহমর্মিতা। দরিদ্রের মুখে হাসি ফুটলে, একটি পরিবারের রিযিকে স্বস্তি এলে, কিংবা একটি শিশুর হাতে ইফতার পৌঁছালে- রমযান তার বরকতের স্বাক্ষর রেখে যায়।

নাজাত: মুক্তির দীপ্ত প্রহর

শেষ দশক যেন আত্মার গভীরতম দরজায় কড়া নাড়ে। এ সময় রাতগুলো দীর্ঘ হয়, সেজদাগুলো গভীর হয়, আর কান্নাগুলো আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে। কেউ ইতিকাফে বসে, কেউ নির্জন ঘরে কোরআনের আয়াত পড়তে পড়তে অশ্রুসিক্ত হয়।

পবিত্র আল-কোরআন ঘোষণা করে- “নিশ্চয়ই আমি এটি অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে।” (সূরা আল-কদর ৯৭:১)

লাইলাতুল কদর- হাজার মাসের চেয়েও উত্তম সেই রাত। এ যেন অন্ধকারের ভেতর জ্বলে ওঠা মুক্তির প্রদীপ। যে হৃদয় সত্যিকারের অনুতাপে নত হয়, সে হৃদয়ই পায় নাজাতের সুবাস।

রমযান: অন্তরের পুনর্জন্ম

রমযান আমাদের শেখায়- নিজেকে ভাঙতে না পারলে গড়া যায় না। অহংকার ঝরিয়ে ফেলতে না পারলে ঈমানের ফুল ফোটে না। এই মাসে মানুষ তার অন্তরের আয়নায় নিজেকে দেখে। পাপের ধুলো ঝেড়ে ফেলে, ভালোবাসার আলো জ্বালে। রহমত দিয়ে শুরু, বরকত দিয়ে সমৃদ্ধি, আর নাজাত দিয়ে পরিণতি- রমযান যেন মানুষের আত্মার পুনর্জন্মের পথরেখা। এই মাস শেষে যদি আমাদের চোখে করুণা না বাড়ে, হৃদয়ে বিনয় না জন্মায়, আচরণে পরিবর্তন না আসে- তবে রমযানের আলো আমাদের স্পর্শ করেও স্পর্শ করেনি।

রমযান তাই সময়ের ক্যালেন্ডারে একটি মাস নয়; এটি একটি দরজা-

ফিরে আসার, ক্ষমা পাওয়ার, নতুন করে শুরু করার দরজা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, মহেশখালী, কক্সবাজার

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর