মহাকালের অবিরাম স্রোতে বছর ঘুরে আবার আসে এক মহিমান্বিত আহ্বান- রমাদ্বান। এটি কেবল একটি মাসের নাম নয়; এটি আত্মার পুনর্জাগরণ, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং জীবনের পুনর্গঠনের এক স্বর্ণসুযোগ। দুনিয়ার কোলাহল, ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতার ভিড়ে মানুষ যখন ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন রমাদ্বান এসে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- তুমি কেবল দেহ নও, তুমি আত্মাও; তুমি কেবল ভোগের জন্য নও, তুমি বন্দেগির জন্য সৃষ্টি। এই মাসের আগমন যেন মুমিনের হৃদয়ে এক আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে দেয়। সে আলো তাকে পাপ থেকে দূরে, নেকির পথে এবং আল্লাহভীতির উঁচু মিনারের দিকে আহ্বান জানায়। রমাদ্বান কেবল একটি মাস নয়- এটি একটি প্রশিক্ষণশালা, একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের নাম। এখানে মানুষ তার নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, আল্লাহর সামনে নিজেকে সোপর্দ করতে শেখে, আর শিখে কীভাবে এই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ত্যাগ করে চিরস্থায়ী আখিরাতের পথে হাঁটতে হয়।
রমাদ্বান রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)। এই আয়াতেই রমাদ্বানের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট তা হল তাকওয়া। অর্থাৎ আল্লাহভীতি, আল্লাহসচেতনতা, অন্তরের গভীরে এক জাগ্রত অনুভূতি যে, আমি সর্বদা আমার রবের নজরদারিতে আছি। রমাদ্বানের রোজা কেবল ক্ষুধা ও পিপাসার নাম নয়; এটি একটি সচেতন অনুশীলন- চোখ, কান, জিহ্বা, হাত ও হৃদয়কে সংযত রাখার নাম। যখন কেউ একান্ত নির্জনে পানি পান করার সুযোগ পেয়েও পান করে না, তখন সে আসলে প্রমাণ করে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে। এই ভয় আতঙ্কের নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও রবের সন্তুষ্টি হারানোর ভয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমাদ্বানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” এই হাদিস রমাদ্বানের মাগফিরাতের দরজা খুলে দেয়। আরেক হাদিসে এসেছে: “রমাদ্বান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।” অর্থাৎ রমাদ্বান এমন এক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে ইবাদত সহজ হয়, পাপ থেকে বাঁচা সহজ হয়, নেক আমল করার আগ্রহ বাড়ে। যেন আল্লাহ নিজেই তাঁর বান্দাদের জন্য জান্নাতের পথে চলার রাস্তা প্রশস্ত করে দেন।
রহমত মানে দয়া, করুণা, অনুগ্রহ। রমাদ্বানের প্রথম দশককে রহমতের দশক বলা হয়ে থাকে। এই সময় মানুষ আল্লাহর দয়ার সাগরে ডুব দেয়। নামাজ, রোজা, দোয়া, তিলাওয়াত- সবকিছুতে থাকে এক নতুন স্বাদ। মসজিদগুলো ভরে ওঠে, কোরআনের সুরে রাতগুলো আলোকিত হয়। এই রহমত কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চরিত্রেও প্রকাশ পায়। ধনী গরিবের খোঁজ নেয়, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হয়, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয়। সমাজে সহমর্মিতা বাড়ে। রমাদ্বান শেখায়- তোমার প্লেটে খাবার আছে, কিন্তু পাশের ঘরে কেউ হয়তো না খেয়ে আছে; তাই তার দায়িত্বও তোমার।
দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত। মানুষ নিজের অতীতের ভুলের দিকে তাকায়, অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা চায়। সেজদায় মাথা রেখে মহান রবকে বলে- হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমা করো। রমাদ্বান মানুষকে আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। সারাবছর যে মানুষ নিজেকে নির্দোষ মনে করে, রমাদ্বানে সে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে দেখতে পায়। এই আত্মজিজ্ঞাসাই তাকওয়ার পথে প্রথম ধাপ। কারণ তাকওয়া জন্ম নেয় হৃদয়ের গভীরে, যখন মানুষ বুঝতে পারে- আমি নিখুঁত নই; আমার রবই পরিপূর্ণ।
তৃতীয় ভাগ নাজাতের- জাহান্নাম থেকে মুক্তির। বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। কোরআনে এসেছে: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল-কদর ৯৭:৩)। এই একটি রাতের ইবাদত একজন মানুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এই রাত প্রমাণ করে- আল্লাহর কাছে সময়ের পরিমাণ নয়, আন্তরিকতার মানই বড়। কোন কোন হাদিসে এই তিনটি ভাগের কথা বলা হলেও আল্লাহর রহমত, বরকত কিংবা নাজাতের মাঝে দশক কিংবা সময়ের কোন পার্থক্য নেই। সুতরাং আমরা বলতে পারি, পুরো মাসটিই রহমতের, পুরো মাসটিই নাজাতের।
রমাদ্বানকে বলা যায় তাকওয়ার মিনার। মিনার মানে উঁচু স্তম্ভ, যা দূর থেকে দেখা যায় এবং পথিককে দিকনির্দেশ দেয়। তাকওয়া হলো সেই আলো, যা মানুষের জীবনকে পথ দেখায়। রমাদ্বান সেই মিনার নির্মাণের সময়। এক মাস ধরে মানুষ ইবাদতের ইট, ধৈর্যের বালু, তিলাওয়াতের সিমেন্ট, দোয়ার পানি দিয়ে তার অন্তরে একটি মিনার গড়ে তোলে। এই মিনার যত উঁচু হয়, মানুষ তত বেশি দুনিয়ার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকে। তাকওয়ার মিনার মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, সত্যের পথে দৃঢ় রাখে, লোভ-লালসা থেকে দূরে রাখে।
রমাদ্বান কোরআনের মাস। আল্লাহ বলেন: “রমাদ্বান মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)। কোরআন ও রমাদ্বানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই মাসে কোরআনের তিলাওয়াত, তাদাব্বুর, আমল- সবই বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমাদ্বানে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াতের পুনরাবৃত্তি করতেন। এটি প্রমাণ করে, রমাদ্বান হলো কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের মাস। কোরআন মানুষকে তাকওয়া শেখায়। কোরআন বলে- সত্য বলো, আমানত রক্ষা করো, অন্যায় করো না, ধৈর্য ধরো। যখন মানুষ রমাদ্বানে কোরআনের আলোয় নিজেকে আলোকিত করে, তখন তার ভেতরে তাকওয়ার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়।
রমাদ্বান এক মাসের প্রশিক্ষণ। যেমন একজন সৈনিক যুদ্ধের আগে প্রশিক্ষণ নেয়, তেমনি একজন মুমিন পুরো বছরের জীবনের জন্য রমাদ্বানে প্রশিক্ষণ নেয়। দিনের বেলা ক্ষুধা সহ্য করা ধৈর্য শেখায়; রাগ দমন করা চরিত্র গঠন করে; তারাবির দীর্ঘ কিয়াম শরীরকে কষ্ট সহ্য করতে শেখায়; দান-সদকা হৃদয়কে উদার করে। এই এক মাস মানুষকে শেখায়- তুমি পারো, যদি চাও। তুমি পাপ থেকে দূরে থাকতে পারো, যদি আল্লাহর ভয় থাকে। তুমি ফজরের আগে উঠতে পারো, যদি নিয়ত দৃঢ় হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- রমাদ্বান চলে গেলে কি তাকওয়ার মিনার ভেঙে পড়ে? যদি তা-ই হয়, তবে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ। রমাদ্বান আসলে বছরের বাকি এগারো মাসের জন্য প্রস্তুতির সোপান। যে ব্যক্তি রমাদ্বানে নামাজে যত্নবান হয়, তার উচিত রমাদ্বানের পরেও তা ধরে রাখা। যে ব্যক্তি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার উচিত প্রতিদিন অন্তত কিছু আয়াত পড়া। যে ব্যক্তি রোজায় জিহ্বাকে গালি ও মিথ্যা থেকে বাঁচায়, তার উচিত সারা বছর তা বজায় রাখা। তাকওয়া একটি সাময়িক অনুভূতি নয়; এটি স্থায়ী চরিত্র।
তাকওয়া মানুষকে আলাদা করে চেনায়। যখন সমাজে অন্যায় বাড়ে, তখন তাকওয়াবান ব্যক্তি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়। যখন সবাই দুর্নীতির স্রোতে ভাসে, তখন তাকওয়াবান ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করে। রমাদ্বান সেই সাহস জোগায়। কারণ সে জানে- আল্লাহ তাকে দেখছেন। কোরআনে এসেছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকওয়াবানদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯৪)। এই সঙ্গই মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আজকের ভোগবাদী বিশ্বে রমাদ্বানের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ মনে করে সুখ মানে ভোগ, সম্পদ, ক্ষমতা। কিন্তু রমাদ্বান শেখায়- সত্যিকারের সুখ আত্মসংযমে, আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। এক গ্লাস পানি সামনে রেখেও না পান করা যে আনন্দ দেয়, তা শত ভোগেও পাওয়া যায় না। কারণ এটি আল্লাহর জন্য ত্যাগের আনন্দ।
রমাদ্বান পরিবার ও সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলে। ইফতারের টেবিলে সবাই একত্র হয়, ধনী-গরিব একই কাতারে দাঁড়ায়, তারাবিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়ে। এটি সাম্যের শিক্ষা। এটি ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা। রমাদ্বান মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, তুমি একা নও; তুমি একটি উম্মাহর অংশ।
অতএব, রমাদ্বান মুমিনের তাকওয়ার মিনার। এই মিনার যত উঁচু হবে, জীবনের ঝড়-তুফান তত কম ক্ষতি করতে পারবে। রমাদ্বান আমাদের শেখায়- আত্মসংযমই মুক্তি, আল্লাহসচেতনতাই নিরাপত্তা, তাকওয়াই সফলতার চাবিকাঠি। এই মাস আমাদের হাতে এক সুবর্ণ সুযোগ তুলে দেয় নিজেকে বদলানোর, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার, জীবনের লক্ষ্যকে নতুন করে নির্ধারণ করার।
আসুন, আমরা রমাদ্বানকে কেবল রোজার মাস হিসেবে না দেখে তাকওয়ার মিনার হিসেবে গ্রহণ করি। আমরা এটিকে বানাই আমাদের আত্মার পুনর্জাগরণের মাস। আমরা গড়ে তুলি আমাদের অন্তরে তাকওয়ার সেই মিনার, যা বছরের পর বছর অটুট থাকবে। যেন রমাদ্বান চলে গেলেও তার আলো নিভে না যায়; বরং আমাদের জীবনজুড়ে জ্বলে থাকে আলোর প্রদীপ হয়ে। তখনই রমাদ্বান সত্যিকারের অর্থে সফল হবে, তখনই আমরা হবো সেই মুমিন-যার হৃদয়ে তাকওয়ার মিনার আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক: কলামিস্ট, এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ।
ই-মেইল: sultanmh17@gmail.com
বিকেপি/এমএম

