Logo

ধর্ম

রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ দশ আমল

Icon

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২৬

রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ দশ আমল

পবিত্র মাহে রমজান তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। আল্লাহ তাআলা এ মাসে সমস্ত আমলের প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের নফল ইবাদত অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমতুল্য। আর রমজানের একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমতুল্য।’ (শুআবুল ইমান: ৩৩৩৬) ফজিলতপূর্ণ এ রমজান মাসের পুরোটা সময় তাই ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো উচিত। মাহে রমজানের বিশেষ দশটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো-

রোজা পালন: আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ওপর রমজানের রোজাকে ফরজ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫) হজরত সালমান ফারসি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবানের শেষদিকের এক ভাষণে বলেন, ‘হে লোকসকল! এক বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। এ মাসে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন।’ (জামে তিরমিজি: ৬৮৩)

রাতের তারাবিহ: তারাবিহ নবীজি (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আর জামাতের সঙ্গে বিশ রাকাত তারাবিহ খোলাফায়ে রাশেদা এবং সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাত। দ্বীনের বিষয়ে খোলাফায়ে রাশেদার অনুসরণ করা নবীজি (সা.) আমাদের ওপর আবশ্যক করে দিয়েছেন। ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতের অনুসরণ করা তোমাদের ওপর আবশ্যক।’ (জামে তিরমিজি: ২৬৭৬) সর্বপ্রথম নবীজি (সা.) তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন। তবে ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেননি। আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রমজানের একরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে গিয়ে নামাজে দাঁড়ালেন। কিছুসংখ্যক সাহাবি তাঁর পিছনে ইকতিদা করলেন। দ্বিতীয় রাতেও তিনি নামাজ পড়লেন। এ রাতে অনেক মুসল্লি তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করলেন। এরপর তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে জড়ো হলেন, কিন্তু ওই রাতে তিনি কামরা থেকে বের হলেন না। সকালবেলা তিনি সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমরা যে রাতে মসজিদে জড়ো হয়েছিলে তা আমি দেখেছি। তবে এ নামাজ তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমি তোমাদের কাছে আসিনি।’ (সহিহ মুসলিম: ৭৬১) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করবে, আল্লাহ তাআলা তার পিছনের সমস্ত (ছগিরা) গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭) রমজান যেহেতু অধিক ইবাদতের মাস, এজন্য তারাবিহ বিশ রাকাতের কম হওয়া উচিত নয়। আর উত্তম হলো তারাবিহতে অন্তত এক খতম কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা।

তাহাজ্জুদ নামাজ: আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার জন্য তাহাজ্জুদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাহাজ্জুদ আদায়কারী মুমিনদের আল্লাহ তাআলা ‘ইবাদুর রহমান’ তথা রহমানের বান্দা উপাধিতে ভূষিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(তারা রহমানের বান্দা) যারা রাত অতিবাহিত করে মহান রবের সামনে সিজদাবনত ও দণ্ডায়মান অবস্থায়।’ (সুরা ফুরকান: ৬৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনভর তাহাজ্জুদ নামাজের পাবন্দি করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম হলো রাতের (তাহাজ্জুদ) নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৪৫)

কোরআন তিলাওয়াত: রমজান হলো কোরআনের মাস। আল্লাহ তাআলা এ মাসে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ করেছেন। রমজান মাসের শ্রেষ্ঠত্ব মূলত এ কারণেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হেদায়াত এবং এমন নিদর্শনাবলি সম্পন্ন, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫) ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইবরাহিম (আ.)-এর সহিফা রমজানের প্রথম রাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর রমজানের ৬ তারিখে তাওরাত, ১৩ তারিখে ইনজিল, ১৮ তারিখে জাবুর এবং ২৪ তারিখে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (তাবারি: ৩/১৮৯) এ মাসে তাই বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত এবং কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

দান-সদকা: নবীজি (সা.) রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। তাঁর উদারতা ছিল প্রবাহমান বাতাসের মতো। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই রমজানকে জাকাত ও সদকার মৌসুম বলা হয়। ফলে দরিদ্র মানুষ ইদের আগে কিছুটা স্বস্তি পায়। নতুন পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে সামাজিক আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। রমজান মাসে তাঁর দানের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেত।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০২) রমজানে আল্লাহ তাআলা দান-সদকার সওয়াবও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এ মাসে তাই অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা উচিত।

শেষ দশকের ইতিকাফ: ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা। আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্য রমজানের শেষ দশকে মানুষজন থেকে পৃথক হয়ে মসজিদে অবস্থান করাকে পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘প্রত্যেক রমজানেই নবীজি (সা.) শেষ দশকের ইতিকাফ করতেন, তবে মৃত্যুপূর্ববর্তী রমজানে তিনি বিশদিন ইতিকাফ করেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি: ২০৪৪)

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান: হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রাত লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর: ০৪) এ রাতের ইবাদত অনেক ফজিলতপূর্ণ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে পুণ্যলাভের প্রত্যাশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পেছনে সমস্ত (ছগিরা) গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৪) নবীজি (সা.) শেষ দশকের বেজোড় রাতে আমাদের লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে বলেছেন। 

জিকির-আজকার: জিকির মানে আল্লাহর স্মরণ। এটি মানুষকে সবধরনের পাপকাজ থেকে বিরত রাখে। বান্দা যখন জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহ তাআলাও বান্দাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা বাকারা: ১৫২) আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে জিকির করে আর যে জিকির করে না, তাদের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃতের মতো। যে জিকির করে সে জীবিত আর যে জিকির করে না সে মৃত।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)

অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা: রোজা রেখে কোনো অশ্লীল কাজকর্ম কিংবা গোনাহে লিপ্ত হওয়া যাবে না। রোজা কেবল উপোস থাকার নাম নয়, আল্লাহর জন্য সমস্ত পাপাচার থেকে বিরত থাকার নামই রোজা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যাচার ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৩) অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল ও অহেতুক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকে। রোজা অবস্থায় কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে কিংবা তার সঙ্গে ঝগড়াবিবাদ করতে আসে, তখন সে যেন বলে দেয় যে আমি রোজাদার।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৫১)

তাকওয়া চর্চা: মাহে রমজান ইবাদত ও আত্মসংযমের মাস। এ মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩) রোজা রাখার ফলে নিজের কুপ্রবৃত্তিকে নানামুখী পাপাচারের প্রবণতা থেকে সংযত রাখার অভ্যাস গড়ে উঠবে। আর এ অভ্যাসের দৃঢ়তাই হবে তাকওয়ার ভিত্তি।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

বিকেপি/এমএম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর