রমজানুল মোবারক মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য নিয়ামত, এক বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস। এটি কেবল উপবাস থাকার মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। মানুষের অন্তরকে পবিত্র করা, চরিত্রকে শাণিত করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহভীতিকে প্রতিষ্ঠা করাই রমজানের মূল লক্ষ্য। এই মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে এমন সব ইবাদতের সুযোগ দেন, যার মাধ্যমে সে নিজের আত্মাকে সংশোধন করতে পারে এবং পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের পথে অগ্রসর হতে পারে।
রোজা : আত্মসংযমের সর্বোচ্চ অনুশীলন
রমজানের কেন্দ্রীয় ইবাদত হলো রোজা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও সব ধরনের রোজাভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোজা। তবে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং নফসকে সংযত করা, পাপাচার থেকে বিরত থাকা এবং তাকওয়া অর্জন করা। রোজা মানুষকে ধৈর্যশীল করে, লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত করে এবং আল্লাহর নির্দেশ মানার মানসিকতা তৈরি করে। ফলে রোজা আত্মশুদ্ধির এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সাহরি : বরকত ও নিয়তের সময়
সাহরি রোজার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কেবল ভোরের খাবার নয়; বরং একটি সুন্নত ও বরকতময় আমল। সাহরির মাধ্যমে শরীর যেমন রোজার জন্য শক্তি পায়, তেমনি অন্তরও প্রস্তুত হয় ইবাদতের জন্য। সাহরির সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা, নিয়তকে দৃঢ় করা এবং দিনটিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া আত্মশুদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইফতার : কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা
ইফতার রোজাদারের জন্য আনন্দের মুহূর্ত। সারাদিন সংযমের পর সূর্যাস্তে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত গ্রহণের মধ্য দিয়ে বান্দা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ইফতার মানুষকে শিখিয়ে দেয়, নিয়ামতের প্রকৃত মূল্য কীভাবে উপলব্ধি করতে হয়। একসঙ্গে ইফতার করা ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। দরিদ্র ও অভাবীদের ইফতার করানো আত্মশুদ্ধির এক অনন্য দিক, যা মানুষের হৃদয়কে কোমল করে এবং দানশীলতা বৃদ্ধি করে।
তারাবি : রাতের প্রশান্ত ইবাদত
রমজানের বিশেষ রাতের ইবাদত হলো তারাবি নামাজ। দীর্ঘ কিরাআত ও ধৈর্যের সঙ্গে আদায় করা এই নামাজ অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারাবির মাধ্যমে মানুষ নিয়মিত কোরআন শ্রবণ ও অনুধাবনের সুযোগ পায়। এটি আত্মাকে আল্লাহমুখী করে তোলে এবং পাপের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে।
তাহাজ্জুদ : একান্ত নৈকট্যের সময়
রমজানে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। গভীর রাতে নিভৃতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করা, নিজের ভুলত্রæটি স্বীকার করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা আত্মশুদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর। তাহাজ্জুদ মানুষের অন্তরকে বিনয়ী করে, অহংকার ভেঙে দেয় এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা সৃষ্টি করে।
তিলাওয়াত : কোরআনের সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধন
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। এ মাসে তিলাওয়াতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোরআন পাঠ কেবল সওয়াবের জন্য নয়; বরং এর অর্থ বুঝে জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা গ্রহণ করাই আসল উদ্দেশ্য। নিয়মিত তিলাওয়াত অন্তরকে আলোকিত করে, চিন্তাকে শুদ্ধ করে এবং চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়তে পারলেই আত্মশুদ্ধি পরিপূর্ণতা লাভ করে।
ইতিকাফ : দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন সাধনা
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। মসজিদে অবস্থান করে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে আলাদা রেখে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা ইতিকাফের মূল শিক্ষা। এতে মানুষ নিজের আত্মার সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করতে পারে, গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য মনোনিবেশ করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য নতুন সংকল্প গ্রহণ করতে পারে।
তাকওয়া : রমজানের চূড়ান্ত লক্ষ্য
রমজানের সব ইবাদতের মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি, আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলার মানসিকতা। রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা-সবকিছুই মানুষকে তাকওয়ার পথে পরিচালিত করে। প্রকৃত সফলতা তখনই, যখন রমজান শেষে এই তাকওয়া সারা বছরের জীবনে প্রতিফলিত হয়।
রমজান আত্মশুদ্ধির পাঠশালা
রমজান আত্মশুদ্ধির এক পরিপূর্ণ পাঠশালা। এই মাস মানুষকে সংযম, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়। সাহরি থেকে ইফতার, তারাবি থেকে তাহাজ্জুদ, তিলাওয়াত থেকে ইতিকাফ-প্রতিটি আমল মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্যই নির্ধারিত। যে ব্যক্তি রমজানের এই শিক্ষাগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করে এবং সারা জীবনে বাস্তবায়ন করে, তার জীবন হয় আলোকিত ও কল্যাণময়। অতএব, রমজানকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক মাস হিসেবে নয়; বরং আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই মুমিনের কর্তব্য।
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

