Logo

ধর্ম

বরকতের ছোঁয়া ও ইবাদতের মহিমায় রমজান

Icon

মোঃ আতিক উল্লাহ চৌধুরী

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৬

বরকতের ছোঁয়া ও ইবাদতের মহিমায় রমজান

পবিত্র মাহে রমাদান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ নিয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে। সিয়াম সাধনার এ মাস কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং এটি আত্মসংযম, তাকওয়া অর্জন এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। রোজা মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করে, নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জীবনের লক্ষ্যকে করে সুস্পষ্ট। 

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। বছরের নানা ব্যস্ততা ও দুনিয়াবি মোহে মানুষ অনেক সময় গাফেল হয়ে পড়ে। কিন্তু এ মাসে সিয়ামের মাধ্যমে সে নিজের ভুল-ত্রুটি, গুনাহ ও অন্যায় থেকে ফিরে আসার সুযোগ পায়। তওবা, ইস্তিগফার ও অধিক ইবাদতের মাধ্যমে অন্তর হয় পরিশুদ্ধ, হৃদয়ে জাগে নতুন আলোর সঞ্চার। মাহে রমাদানে রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে। চারদিকে যেন নেমে আসে বরকতের ছোঁয়া। অল্প আমলেও মেলে বহুগুণ সওয়াব, সামান্য দানেও পাওয়া যায় অশেষ প্রতিদান।

ঘরে ঘরে কোরআনের তিলাওয়াত, মসজিদে মসজিদে নামাজের সারি- সব মিলিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সময়ের মধ্যেও থাকে বিশেষ বরকত; কাজের ফাঁকে ফাঁকে মানুষ খুঁজে নেয় ইবাদতের সুযোগ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ছড়িয়ে পড়ে শান্তি ও কল্যাণের বার্তা। সেহরি শুধু রোজার প্রস্তুতি নয়। এটি বরকতের বিশেষ সময়। রাতের শেষ প্রহরে ঘুম ভেঙে সেহরি খাওয়া এবং সেই সঙ্গে দোয়া, ইস্তিগফার ও তাহাজ্জুদ আদায় একজন মুমিনের জীবনে আনে আত্মিক প্রশান্তি। ভোরের নীরবতায় উচ্চারিত দোয়া হয়ে ওঠে আরও হৃদয়গ্রাহী, আরও গ্রহণযোগ্য। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যাবতীয় অপবিত্র কাজ থেকে বিরত থাকাই রোজার মূল বিধান। তবে রোজার প্রকৃত শিক্ষা কেবল খাদ্য ত্যাগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরের সংযমও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা, পরনিন্দা, গীবত ও অন্যায় থেকে দূরে থাকাই সিয়ামের প্রকৃত তাৎপর্য। এ সংযম মানুষকে ধৈর্যশীল ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে তোলে।

দিনভর সিয়ামের পর ইফতারের মুহূর্তে নেমে আসে বিশেষ রহমত। একটি খেজুর বা এক চুমুক পানিতেই মেলে অপার তৃপ্তি ও প্রশান্তি। এ সময়ের দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তাই ইফতার কেবল আহার গ্রহণ নয়; এটি কৃতজ্ঞতা, প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য মুহূর্ত। রমাদান ইবাদতের বসন্তকাল। এ মাসে মুমিনের হৃদয় ইবাদতের মধ্যে মশগুল থাকে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া ও তওবায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে মন। দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর স্মরণ হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ। বিশেষ করে সালাতুত তারাবীহ রমাদানের রাতগুলোকে করে তোলে আলোকিত ও সজীব। শেষ প্রহরের তাহাজ্জুদে চোখের জল আর প্রার্থনার সুরে ভরে ওঠে মুমিনের হৃদয়। সব মিলিয়ে রমাদান হয়ে ওঠে আত্মিক প্রশান্তির এক সোনালি অধ্যায়।

রমাদান আমাদের জীবনে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসে। বদঅভ্যাস ত্যাগ, অসৎ পথ থেকে ফিরে আসা এবং সৎকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়ার সময় এটি। বরকতের এ ছোঁয়া ও ইবাদতের এ মশগুল পরিবেশ মানুষকে বদলে দেয়, অন্তরকে নরম করে এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে জীবন। এক মাসের এই অনুশীলন যেন সারা বছরের জীবনচর্চায় প্রতিফলিত হয়- এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি মুমিনের প্রত্যাশা। রমজানের আমেজে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও দানের মানসিকতা। ধনী-গরিব এক কাতারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করেন, ইফতার ভাগাভাগি করেন। যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়। ফলে সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয় এবং মানবিকতার ভিত্তি মজবুত হয়। সব মিলিয়ে মাহে রমাদান হলো আত্মশুদ্ধি, রহমত, বরকত ও পরিবর্তনের মাস। এ মাস আমাদের শেখায় কিভাবে সংযম ও তাকওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে সুন্দর করা যায়। পবিত্র এ মাসে আমাদের প্রত্যাশা- রমাদানের শিক্ষা যেন শুধু এক মাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সারা জীবনের পথচলায় হয়ে উঠুক আলোর দিশারী। 

লেখক: ফাজেল, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম,বাংলাদেশ।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর