রমজান ও কোরআন: হিদায়াতের আলোকিত সহযাত্রা
মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৩৯
রমজান মাস মুসলমানদের জীবনে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক সোনালী মৌসুম। এটি শুধু সিয়াম সাধনার মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার অনন্য সুযোগ। কোরআনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের কারণেই রমজানকে বলা হয় ‘কোরআনের মাস’। কেননা এ মাসেই মানবজাতির হিদায়াতের দিশারি, জীবনবিধান মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘রমজান মাস, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য আদ্যোপান্ত হিদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সুরা বাকারাহ : ১৮৫)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রমজান কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার মাস নয়; বরং এটি হিদায়াতের আলোয় জীবন সাজানোর মাস। কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের মাস।
হাদিস গ্রন্থের পাতায় পাতায় আমরা দেখতে পাই, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসে কোরআনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার এক অনন্য নজির স্থাপন করতেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। আর রমজান এলে তাঁর দানশীলতা বহুগুণ বেড়ে যেত। জিবরাইল (আ.) প্রতি রাতে এসে তাঁর সঙ্গে কোরআন পাঠ করতেন ও শুনতেন। তখন তিনি কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। (সহিহ মুসলিম: ২৩০৮)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, রমজান হলো কোরআন অধ্যয়ন, তিলাওয়াত ও আমলের বিশেষ মৌসুম।
রমজানের অন্যতম সৌন্দর্য তারাবির নামাজ। রাতের নিস্তব্ধতায় দীর্ঘ কিরাতে কোরআনের তিলাওয়াত হৃদয়কে কোমল করে, ঈমানকে জাগ্রত করে। সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফে সালেহীন রমজানে একাধিকবার কোরআন খতম করতেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি : ২০০৯)
রাতের শেষাংশ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম সময়। রমজানে এ সুযোগ আরও সহজ হয়ে যায়। তাহাজ্জুদের নামাজে কোরআন তিলাওয়াত হৃদয়ে বিশেষ প্রভাব ফেলে।
আল্লাহ বলেন- ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ুন, এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৭৯)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে- ‘অবশ্যই রাত্রিকালের জাগরণ প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল।’ (সুরা মুজাম্মিল : ৬)
রমজানের প্রকৃত শিক্ষা শুধু তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কোরআনের আলোকে জীবন গঠনই এর মূল লক্ষ্য। কোরআন মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়। তাই এর অর্থ বোঝা, তাফসির অধ্যয়ন করা এবং বাস্তবে আমল করাই প্রকৃত সফলতা।
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, প্রকৃত আলিম সে-ই, যে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে। শুধু মুখে কোরআন পাঠ করলেই যথেষ্ট নয়; তা হৃদয়ে ধারণ করে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। (সুনানে দারেমি : ৩৯৪)
রমজানকে কোরআনের মাস হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কিছু বাস্তব উদ্যোগ নিতে পারি।
১. নিয়মিত তিলাওয়াত : প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
২. অর্থ ও তাফসির বোঝা : বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
৩. আমল : কোরআনের নির্দেশনা জীবনে প্রয়োগ করা।
৪. পরিবারে চর্চা : ঘরে কোরআন তিলাওয়াত ও আলোচনা চালু করা।
৫. সমাজে প্রচার : কোরআনের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া।
রমজান আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার জীবন বদলে যায় । তাই আসুন, এই পবিত্র মাসে কোরআনকে শুধু তিলাওয়াতের বই নয়, বরং জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করি। তাহলেই রমজান হবে আমাদের আত্মশুদ্ধির মাস, হিদায়াতের মাস, সফলতার মাস।
লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

