মহিমান্বিত রমজান। মহাপ্রাপ্তির এক মনোহর আয়োজন। শ্রেষ্ঠতম মাস সমূহের অন্যতম। কোরআন নাজিলের মাস। তাকওয়া অর্জনের মাস। গোনাহ মাফের মাস। যে মাসে আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন লাইলাতুল কদরের মহিমা; যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ মহিমান্বিত মাসে একটি নেক আমলের মর্যাদা যেমন অতুলনীয়, তদ্রুপ খারাপ কাজের পরিণামও ভয়াবহ। এজন্য এ মাসের মর্যাদা রক্ষার্থে সমস্ত খারাপ কাজ বর্জন করা অপরিহার্য। নিম্নে কিছু বর্জনীয় ও নিন্দনীয় কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
১. ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙ্গা
রোজা অবস্থায় খাওয়া, পান করা, স্ত্রীর সাথে সহবাস, যিনাহ ইত্যাদি ইচ্ছাকৃতভাবে করলে রোজা ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হবে।
রমজানের রাতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা স্ত্রী সহবাস হালাল করেছেন। আর ফজর থেকে সূর্যাস্ত বা ইফতার পর্যন্ত স্ত্রী সহবাস হারাম এবং রোজা ভঙ্গকারী।
আর যিনা তো সকল অবস্থায়ই হারাম। এজন্য আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছেন। (সুরা ইসরা-৩২) রমজানে এই গোনাহ আরো ভয়াবহ ও গুরুতর। কারণ, এটা সত্তাগতভাবে কবিরা গুনাহ। সাথে রোজা ভঙ্গকারী এবং সুস্পষ্ট পবিত্র এ মাসের অবমাননা।
২. মিথ্যা বলা
রোজা মানে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়; বরং জিহ্বা, কান, অন্তর, বদন সবকিছুকে গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখা। এক কথায় সমস্ত মন্দ কাজ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। মিথ্যা কথা বলা শরীয়তে সর্বদা নিষিদ্ধ বা হারাম। সুতরাং রোজা অবস্থায় তার ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়। রোজা অবস্থায় মিথ্যা বলা শুধু গোনাহই নয়, তার সওয়াবও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
নবীজি সা.বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তাঁর এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি- ১৯০৩)
আরেক হাদিসে এসেছে, “কিছু রোজাদারের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কিছুই পায় না, আবার রাতে জাগরণকারী কিছু সালাত আদায়কারীর রাত্রি জাগরণ ব্যতীত কিছুই পায় না।” (ইবন মাজাহ- ১৬৯০)
৩.গীবত ও অপবাদ
গীবত (পরনিন্দা) অর্থাৎ কারো অগোচরে তার দোষ ত্রুটি সম্পর্কে অন্য কাউকে বলা। যদি তা বাস্তবেই তার মধ্যে থাকে। আর মিথ্যা হলে তা হবে অপবাদ। অর্থাৎ এমন দোষ চাপানো যা সে করেনি। এটা মিথ্যার চেয়েও গুরুতর। গীবত, অপবাদ শরিয়াতে সর্ব অবস্থায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা কেউ কারো গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে?” (সুরা হুজুরাত-১২)
এই উপমাটা লক্ষ্যনীয়- মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা। মানে, গীবত শুধু গোনাহের কাজ না; বরং নৈতিক বিকৃতি।
আর অপবাদ (বুহতান) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের অযথা কষ্ট দেয়, তারা তো স্পষ্ট অপবাদ ও প্রকাশ্য গোনাহের বোঝা বহন করে।” (সুরা আহযাব-৫৮)
৪. অশ্লীলতা ও কুদৃষ্টি
রোজার মর্মকথা হলো কুপ্রবৃত্তি দমন। অশ্লীলতা বর্জন। আর তা কথা, দৃষ্টি, কল্পনা সবকিছুর মাঝে পরিব্যপ্ত। কথা যখন অসংযত, নৈতিকতামুক্ত। দৃষ্টি যখন নিষিদ্ধ বস্তুর উপর নিপতিত। কুকল্পনা যখন গোনাহ্ করার জন্য প্ররোচিত করে। এগুলো ইসলামে সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। আর শ্রেষ্ঠ মাস সমূহের অন্যতম মহিমান্বিত রমজানে আরো গুরুতর ও ভয়াবহ।
অশ্লীলতা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন কোনও রকম অশ্লীল কাজের নিকটেও যেয়ো না”। (সুরা আনআম-১৫১) অপর আয়াতে বলেন, “স্মরণ রেখ, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার হোক এটা কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আছে যন্ত্রণাময় শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সুরা নূর-১৯) সুতরাং রমজানে টিভি, মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল কনটেন্ট দেখা, অশালীন কথা বলা- সবই বর্জন করা অপরিহার্য।
৫. নামাজে অবহেলা
নামাজ ইসলামের অন্যতম একটি রোকন। আল্লাহ সাথে বান্দার প্রেম নিবেদনের অনন্য মুহূর্ত। সরাসরি প্রয়োজন পূরণের অন্যতম মাধ্যম। যা আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপর ফরয করেছেন। (সুরা নিসা-১০৩) রমজান নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাহেন্দ্রক্ষণ। এ সময় থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের অভ্যাস করা বাঞ্ছনীয়। আর রোজা অবস্থায় নামাজ ছেড়ে দিলে মূল ইবাদতেই ঘাটতি থেকে যায়। বিশেষ করে জামাতে নামাজ আদায় ও তারাবিহের নামাজকে অবহেলা করা ঠিক নয়। নামাজ মুসলমান হওয়ার একটি অন্যতম নিদর্শন।
৬. সুদ, ঘুষ ও হারাম উপার্জন
বর্ণিত বিষয়গুলো ইসলামে সর্বাবস্থায় হারাম বা নিষিদ্ধ। সর্বদা এগুলো থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। বিশেষভাবে মহিমান্বিত রমজানে। আর হারাম উপার্জনের সাহরি, ইফতার দ্বারা রোজার বরকত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষভাবে রমজানে সিন্ডিকেট করে পণ্য দ্রব্য চড়া মূল্যে বিক্রি করা। ইসলামের দৃষ্টিতে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন— সম্পূর্ণ হারাম ও ভয়াবহ অপরাধ।
প্রথমত এসব কাজ মানুষকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনা থেকে বঞ্চিত করে, যা স্পষ্ট জুলুম ও সীমা লঙ্ঘন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা জালিমের পরিণাম সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে জুলুম করতে চায়, আমি তাকে বেদনাদায়ক শাস্তি দেব।’ (সুরা হজ- ২৫)
সিন্ডিকেট সম্পর্কে নবীজি সা. বলেছেন, ‘কেউ যদি খাদ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৩৮) সহিহ মুসলিমে তাকে গুনাহগার বলা হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম- ১৬০৫) ইবনে মাযাহ শরীফে তাকে অভিশপ্ত বলা হয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ-২১৫৩)
৭. রিয়া বা লোক দেখানো
রোজা খালেস আল্লাহর জন্য। যার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে দেয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। এখানে রিয়া বা লোক দেখানোর অবকাশ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান বরবাদ কোরো না সে ব্যক্তির মতো, যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা-২৬৪)
হাদিসে লোক দেখানো আমল শিরকের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে, নবীজি সা. বলেন, তোমাদের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে যে বিষয়ের বেশি ভয় পাই, তা হলো শিরকে আছগার। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল সা., শিরকে আছগার কী? তিনি বললেন, রিয়া তথা লোক দেখানো আমল’।
যখন (কিয়ামতে) লোকদের আমলসমূহের প্রতিদান প্রদান করা হবে, তখন আল্লাহ তাআলা সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, ‘তোমরা তাদের নিকটে যাও, যাদেরকে দেখানোর জন্য দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখো, তাদের নিকট কোনো প্রতিদান পাও কিনা’। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৮৬; বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ৬৮৩১)
৮.ইফতারে অপচয়
ইসলামে ‘ইসরাফ’ ও ‘তাবজির’ হারাম। ইসরাফ অর্থ ‘অপচয়’ আর তাবজির অর্থ ‘অপব্যয়’। যেকোনো ‘ইসরাফ’ ও ‘তাবজির’ হারাম। যে এমন করবে, কোরআনের ভাষায়- সে শয়তানের ভাই। কোরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে- “আর অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান স্বীয় রবের চরম অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বনী ইসরাঈল : ২৬-২৭)
বর্তমানে ইফতার পার্টি একটা ফ্যাশনে রূপান্তর হয়েছে। ইফতারের নামে বাহারি খাবারের আয়োজন। বেলা শেষে যার অধিকাংশ যায় ডাস্টবিনে। অথচ দেশের অগণন মানুষ কেবল পানি-চিড়া দিয়ে ইফতার করে। অপচয় এক চরম গর্হিত কাজ। অথচ কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভ্রাতা বলা হয়েছে। (সূরা আ‘রাফ: ৩১)
রমজান সংযমের মাস, ভোজনের উৎসব না। অতিরিক্ত অপচয়, বিলাসী খাবার, দরিদ্রদের কথা ভুলে যাওয়া- এসব রমাদানের চেতনার বিরুদ্ধে।
৯.রমজানকে সামাজিক উৎসবে পরিণত করা
রমজানন আসে পরিশুদ্ধতার বার্তা নিয়ে। নেক আমলের বহুগুণ প্রতিদানের সুসংবাদ নিয়ে। অথচ এখন রমজান যেন এক সমাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নানান পদের বাহারি সেহরি, ইফতার। বিশেষ করে ইফতার এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা। কে কত বড় দাওয়াত দিল, কে কত ব্যয় করল, কে কত ছবি তুলল- এই হিসাব। অথচ রাসুল সা. ইফতারে সরলতা পছন্দ করতেন; খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করতেন।
তারাবির নামাজ রমজানের সৌন্দর্য। রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করা হয়। (সহিহ বুখারি ৩৫)
সুতরাং রাতভর আড্ডা, দেরিতে ঘুম, ফজর ক্বাযা- তারপর দিনের বেলা অর্ধেক সময় ঘুমিয়ে কাটানো। রমজান তখন আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে এক ধরনের মৌসুমি ব্যস্ততা হয়ে যায়। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এ মাসের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন।
১০. সময় অপচয়
রমজানের এক মুহূর্ত সময় অন্য সময়ের চেয়ে লক্ষগুণ দামি। রমজান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির মাস। এ মাসে যে কৃত গোনাহ মাফ করাতে পারল না জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তাঁর ওপর অভিসম্পাত করেছেন। আর নবীজি সা. আমিন বলেছেন। (বায়হাকি -১৫৭২)
রমজান বছরের সেরা সময়। এই সময়টা যদি সিনেমা, গেম, আড্ডা আর অকারণ ঘুমে কাটে, তাহলে এর পরিতাপের শেষ থাকবে না। সুতরাং এই মাসে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইস্তিগফার, সদকা-এসব বাড়ানো উচিত।
উপসংহার: রমজান কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটা আত্মা পরিচর্যার মাহেন্দ্রক্ষণ। মহিমান্বিত মাস। কোরআন নাজিলের মাস। তাকওয়া অর্জনের মাস। গোনাহ মোচনের মাস। সুতরাং রমজানকে হেলায় খেলায় না কাটানো। ইচ্ছাকৃত রোজা ভাঙ্গা, মিথ্যা, গীবত, অশ্লীলতা, নামাজে অবহেলা, হারাম উপার্জন, রিয়া, অপচয়, সামাজিক উৎসবের নামে বাড়াবাড়ি, সময় নষ্ট থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ মাসের পরিপূর্ণ হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন
লেখক: শিক্ষার্থী, উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা বিভাগ (২য় বর্ষ), ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।
সম্পাদক, ত্রৈমাসিক রাহবার
ই-মেইল: jakariabinjubayer@gmail.com
বিকেপি/এমএম

