রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহান মাধ্যম। রমজান মাস বিশেষভাবে দোয়া কবুলের মাস হিসেবে পরিচিত। কোরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, রোজাদারের দোয়া আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কবুল করেন। এই সুসংবাদ প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিসীম অনুপ্রেরণা।
রোজা ও তাকওয়ার সম্পর্ক
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ [সুরা বাকারা : ২/১৮৩] এই আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তাকওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাকওয়া হলো আল্লাহভীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করা। যখন বান্দা রোজার মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখে, তখন তার অন্তর কোমল হয়, আত্মা পরিশুদ্ধ হয় এবং সে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যায়। আর আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অধিক।
দোয়া মুমিনের শক্তি
দোয়া হলো ইবাদতের সারাংশ। মুহাম্মদ সা. বলেছেন- ‘দোয়া হলো ইবাদত।’ [তিরমিজি] অন্য হাদিসে এসেছে- ‘তোমাদের রব বলেছেন- তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ [সুরা গাফির : ৪০/৬০] এই আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান প্রতিশ্রæতি। যখন বান্দা আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ তা কবুল করেন-হয় সরাসরি, নয়তো তার চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে, অথবা আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন।
রোজাদারের দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না
হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। নবী করিম সা. বলেছেন- ‘তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না- রোজাদারের দোয়া ইফতার পর্যন্ত, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুমের দোয়া।’ [তিরমিজি, ইবনে মাজাহ] এই হাদিসে রোজাদারের দোয়াকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রোজা অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি দমন করে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও কষ্ট সহ্য করে যখন সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তখন সেই দোয়া অধিক গ্রহণযোগ্য হয়।
ইফতারের সময় দোয়ার গুরুত্ব
ইফতারের মুহূর্ত রোজাদারের জন্য বিশেষ সময়। সারাদিনের ইবাদত ও সংযমের পর এই সময়টি হয় দোয়া কবুলের অন্যতম উত্তম মুহূর্ত। হাদিসে এসেছে- ‘নিশ্চয়ই রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় একটি দোয়া রয়েছে, যা প্রত্যাখ্যাত হয় না।’ [ইবনে মাজাহ] ইফতারের সময় বান্দা আল্লাহর অশেষ নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় দোয়া করলে অন্তর বেশি বিনয়ী ও আন্তরিক হয়। তাই এ সময় আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা উচিত।
রমজান : দোয়া কবুলের মাস
রমজান মাসকে আল্লাহ রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এই মাসেই নাজিল হয়েছে কোরআন মাজিদ। সুরা বাকারায় রোজার আয়াতের মাঝেই আল্লাহ বলেন- ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও, আমি তো নিকটবর্তী। আমি দোয়া গ্রহণ করি যখন সে আমাকে ডাকে।’ [সুরা বাকারা : ২/১৮৬] এই আয়াতটি রোজার বিধানের মাঝখানে উল্লেখ করা হয়েছে-যা ইঙ্গিত করে যে রমজান ও রোজা দোয়া কবুলের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে তিনি নিকটবর্তী এবং বান্দার ডাকে সাড়া দেন।
দোয়া কবুলের শর্ত
যদিও রোজাদারের দোয়া কবুল হয়, তবুও কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন-
এক. ইখলাস : দোয়া হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
দুই. হালাল রুজি : হারাম উপার্জন দোয়া কবুলের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
তিন. গুনাহ থেকে বিরত থাকা : রোজা রেখে যদি কেউ মিথ্যা, গীবত ও অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে, তবে সে রোজার প্রকৃত ফজিলত থেকে বঞ্চিত হয়।
নবী করিম সা. বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ [সহিহ বুখারি] অতএব, রোজা হতে হবে শুদ্ধ ও নৈতিকভাবে পরিপূর্ণ, তাহলেই দোয়া অধিকতর কবুলযোগ্য হবে।
রোজা ও অন্তরের বিনয়
রোজা মানুষের অহংকার ভেঙে দেয়। ধনী-গরিব সবাই একইভাবে ক্ষুধা অনুভব করে। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী ও সহানুভূতিশীল করে তোলে। যখন অন্তর বিনয়ী হয়, তখন দোয়া বেশি আন্তরিক হয়। আর আল্লাহ আন্তরিক ও বিনয়ী বান্দাকে ভালোবাসেন। কোরআনে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’ [সুরা বাকারা : ২/১৫৩] রোজা ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, আর ধৈর্যশীল বান্দার দোয়া আল্লাহ কবুল করেন।
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ
রোজা কেবল একটি শারীরিক ইবাদত নয়; এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণিত যে রোজাদারের দোয়া আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কবুল করেন-বিশেষত ইফতারের সময়।
অতএব, রমজান মাসে এবং রোজা অবস্থায় আমাদের উচিত বেশি বেশি দোয়া করা-নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য। আন্তরিকতা, ইখলাস ও তাকওয়ার সাথে করা দোয়া কখনো বিফল হয় না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন রোজা রাখার তাওফিক দিন, যার মাধ্যমে আমাদের দোয়া কবুল হবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করব। আমিন।
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর
বিকেপি/এমএম

