বিশ্ব যৌন নিপীড়ন বিরোধী দিবস ২০২৬
নারী-শিশু নিরাপত্তায় ইসলামের দিকনির্দেশনা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ২২:১৮
আজ বুধবার ৪ মার্চ ২০২৬- বিশ্ব যৌন নিপীড়ন বিরোধী দিবস। দেশের সামাজিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, দিবসটি ঘিরে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে যথাযথ সচেতনতা নেই। অথচ নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়ন আজ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সামাজিক ও নৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ঘরে, রাস্তায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও জনসমাগমস্থলে নারীরা নিয়মিতভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধা- কেউই নিরাপদ নয়। নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পারিবারিক চাপের কারণে নীরব থাকতে বাধ্য হন। ফলে অপরাধ চাপা পড়ে যায়, আর অপরাধী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রতিবাদ করলে অনেকে উল্টো হামলা বা হুমকির শিকার হন। নিম্মে ২০২৫-২৬ সালের একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরা হল।
নারী নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন:
৮২৩ নারী শিকার : ২৩১ ধর্ষণ, ১১৭ দলবদ্ধ ধর্ষণ, ১৬ ধর্ষণের পর হত্যা, ১১০ ধর্ষণচেষ্টা, ১৪৯ যৌন হয়রানি, ১০ এসিড নিক্ষেপ, ৭২ প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণ, ৫১২ নারী আত্মহত্যা করেছেন, ১৫ নারী অপহৃত, ২২ নারী নিখোঁজ।
শিশু ও কিশোরী: ৭৬৮ শিশু ও কিশোরী যৌন নিপীড়নের শিকার। ৪৩২ ধর্ষণ, ৬৪ দলবদ্ধ ধর্ষণ, ২৫ ধর্ষণের পর হত্যা, ৪ ধর্ষণের পর আত্মহত্যা, ১৩০ যৌন হয়রানি, ১১৩ ধর্ষণচেষ্টা।
পারিবারিক সহিংসতা ও নবজাতক পরিত্যক্ত
৫৮০ নারী পারিবারিক নির্যাতন, ২৯২ নিহত, ১৪২ আত্মহত্যা, ১৫০ নারী যৌতুকজনিত সহিংসতার শিকার, ৭০ নারী নিহত, ৯১ নবজাতক পরিত্যক্ত: ২১ জীবিত, ৭০ মৃত।
শিক্ষাঙ্গন:
শিক্ষার্থীর ৫৩% যৌন হয়রানির শিকার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৬% ছাত্রী যৌন হয়রানি ভোগ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৭%, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৬৬%, মেডিকেল কলেজ ৫৪%, বিভিন্ন পেশায় ১৯% নারী যৌন হয়রানি শিকার।
অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সালিশে মামলা বন্ধ করা হয়েছে, যা আইন ও ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়- যৌন নিপীড়ন এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে যৌন নিপীড়ন ও প্রতিরোধ
ইসলাম যৌন নিপীড়নকে কেবল অপরাধ নয়; এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়। ইসলামের মূল লক্ষ্য- এমন মানুষ তৈরি করা, যার অন্তরে আল্লাহভীতি ও নৈতিক দায়িত্ববোধ এত দৃঢ় যে সে অন্যায় করতে পারে না।
দৃষ্টি সংযম
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “ঈমানদার পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। (সুরা নূর, আয়াত ৩০) ঈমানদার নারীদেরও বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান রক্ষা করে।” (সুরা নূর, আয়াত ৩১)
চোখের সংযম যৌন অপরাধ প্রতিরোধের প্রথম স্তম্ভ।
খালওয়া (নির্জন একান্ত অবস্থান) নিষেধ
মাহরাম নয় এমন নারী ও পুরুষের একান্ত অবস্থান হারাম। রাসুল (সা.) বলেন: কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে অবস্থান না করে; কারণ তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।” (তিরমিজি, হাদিস ২১৯৬)
এতে সন্দেহ, অপবাদ ও অপরাধের সম্ভাবনা বন্ধ হয়।
শালীন পোশাক ও শিষ্টাচার
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ বলেন: হে আদমের সন্তানরা! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখবে এবং যা হবে তোমাদের ভূষণ। আর পরহেজগারির পোশাক, সেটাই সর্বোত্তম।” (সুরা আরাফ, আয়াত ২৬) জনপরিসরে শিষ্টাচার, নম্র চলাফেরা ও আবেদনের সঠিক ব্যবহার- সবই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
বৈধ বিবাহ ও যৌন নিয়ন্ত্রণ
ইসলাম যৌন আকাঙ্ক্ষা ধ্বংস করতে চায় না; বরং বৈধ ও মানবিক পথে পরিচালিত করে। রাসুল (সা.) বলেন: “হে যুবসমাজ! যারা বিবাহে সক্ষম, তারা বিবাহ করুন। যারা সক্ষম নয়, তারা রোজা রাখুক। কারণ রোজা তাদের যৌন স্পৃহা অব্যবস্থিত রাখে।”(বুখারি, হাদিস ৫০৬৫) এটি যৌন চাহিদাকে নিয়ন্ত্রিত ও সামাজিকভাবে নিরাপদভাবে পরিচালনার মাধ্যম।
বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচার কঠোর নিষিদ্ধ
ইসলাম যিনা (ব্যভিচার) ও ধর্ষণকে হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন: “ব্যভিচারের কাছেও যেও না। এটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২০)
তাকওয়া: সর্বোচ্চ প্রতিরোধ
আইন অপরাধ সীমিত করতে পারে; তবে তাকওয়া মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি জাগিয়ে দেয়। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, আল্লাহ সর্বদা দেখছেন, সে গোপনেও অপরাধ করতে ভয় পায়।
ইসলামে করণীয়:
* পরিবারে দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা * শিশুদের আত্মসম্মান, সংযম ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেখানো * শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি ও সচেতনতা বৃদ্ধি * আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা * সালিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের অপব্যবহার বন্ধ করা * যৌন স্পৃহার প্রতি বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত পথ নির্দেশ * সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে যৌন হয়রানি রোধ।
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু আইন নয়- মানুষের চরিত্র, সংযম ও আল্লাহভীতি গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
শিক্ষামূলক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত
* শিশুদের সচেতনতা: স্কুল ও মাদরাসায় শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে শিক্ষামূলক পাঠ্যক্রম চালু করা।
* প্রতিবেশী ও পরিবারিক সহায়তা: নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ঠেকাতে পরিবারের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
* মিডিয়ার ভূমিকা: সচেতন প্রচারণা, সামাজিক নৈতিকতা ও সতর্কবার্তা প্রচার।
* আইনের যথাযথ প্রয়োগ: সালিশ ও প্রভাবশালীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৫-২৬-এর ভয়াবহ পরিসংখ্যান আমাদের সতর্ক করে- যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে আইন, প্রচারণা বা প্রতীকী ক্ষমতায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক চেতনা, দৃষ্টির সংযম, শালীন পোশাক, পরিবারিক শিক্ষা, ইসলামি অনুশাসন এবং আল্লাহভীতি। ইসলাম যৌন স্পৃহাকে ধ্বংস করতে চায় না; বরং নিয়ন্ত্রিত ও মানবিকভাবে পরিচালিত করতে চায়। নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে ইসলামি অনুশাসনের চর্চা অপরিহার্য।
লেখক: কলাম লেখক ও ইসলামি গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার।
ইমেইল: drmazed96@gmail.com
বিকেপি/এমএম

