বদর থেকে গাজা
ভিন্ন রণক্ষেত্র, অভিন্ন সংঘাত
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ২২:৪৮
২য় হিজরির ১৭ রমজান। আরবের উত্তপ্ত মরুর বুকে তখন প্রভাতী সূর্যের স্নিগ্ধ আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। নীরব আকাশের নিচে ইতিহাসের এক মহামুহূর্তের অপেক্ষা। বদরের প্রান্তর যেন নিজেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে ঐদিকে। একদিকে দাঁড়িয়ে আছে ঈমানের দীপ্তিতে উজ্জ্বল মাত্র তিনশ তেরো জন মুমিন। তাদের গায়ে নেই বর্ম, হাতে নেই অস্ত্র। সাধারণ পোশাক, সীমিত সম্বল, কিন্তু তাদের রয়েছে অটুট ঈমান ও হৃদয়ে অটল বিশ্বাস। চোখে আল্লাহর সাহায্যের গভীর প্রত্যয়। তাদের চেহারায় ভয় নেই, রয়েছে তাওয়াক্কুলের প্রশান্তি; তাদের বুকে দুনিয়ার শক্তি নয়, রয়েছে আসমানের ভরসা।
অন্যদিকে অহংকারে উন্মত্ত এক হাজার সশস্ত্র কুরাইশ। চকচকে তলোয়ারের ঝলক, লৌহবর্মের শব্দ, শক্তিশালী ঘোড়ার টগবগ ছুটাছুটি। তাদের রয়েছে বাহ্যিক শক্তির সব আয়োজন। সংখ্যার দম্ভ, অস্ত্রের গর্ব, এবং বিজয়ের অহংকার তাদের চোখে-মুখে জ্বলজ্বল করছিল।
বদরের সেই প্রান্তরের সংঘর্ষ কেবল দুই বাহিনীর নয়; এটি ছিল ঈমান ও কুফুরির সংঘর্ষ, সত্য ও অসত্যের মোকাবিলা, আসমানি শক্তি ও পার্থিব ক্ষমতার পরীক্ষা।
মরুর বালুকণা সাক্ষী রয়েছে, সেদিন দুর্বল শক্তির সামনে অদম্য ঈমান কেমন করে পাহাড়সম দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর আকাশ থেকে নেমে এসেছিল আল্লাহর নুসরত। সেদিন বদর প্রান্তরে শুধু একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, বরং সেদিন ইতিহাসের বুকে লেখা হয়েছিল এক অনন্ত সত্যের দীপ্ত ঘোষণা।
পৃথিবী সাক্ষ্য দিয়েছিল, শক্তির প্রকৃত উৎস অস্ত্রের ঝনঝনানি বা সংখ্যার প্রাচুর্যে নয়, বরং শক্তি হলে অটল ঈমানের গভীরতায়। সেদিন বিস্ময়ে নত হয়ে পৃথিবী দেখেছিল, ক্ষুদ্র বাহিনীও কীভাবে মহাশক্তির অধিকারী হয়ে ওঠে, যখন তাদের অন্তরে থাকে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা।
সেদিন বদর মানবজাতিকে শিখিয়েছিল, ঈমান যেখানে অটুট থাকে, সেখানে দুর্বলতা শক্তিতে রূপ নেয়, অসম্ভব সম্ভব হয়ে যায়, আর সংখ্যার সব হিসাব মুছে গিয়ে আল্লাহর সাহায্যই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ফয়সালা। বদর কেবল ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়, এটি চিরকালের জন্য আসমান-জমিনের মাঝে উচ্চারিত এক অমর বাণী: “ঈমানের শক্তির সামনে দুনিয়ার সব শক্তি তুচ্ছ।”
ইসলামের অগ্নিপরীক্ষা
মক্কার বুকে দীর্ঘ তেরোটি বছর ছিল দুঃখ-কষ্ট, আত্যাচার-নির্যাতন ও ধৈর্যের পরীক্ষা। তাওহিদ গ্রহণের অপরাধে মানুষ মানুষকে কত নিষ্ঠুরভাবে যে আঘাত করতে পারে, ইতিহাস তার জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে আছে।
মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হতো হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রাযি.)-কে। তাঁর বুকের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতো বিশাল চাটান পাথর। যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে আর উচ্চারণ করতেন, “আহাদ, আহাদ!”।
হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত (রাযি.)-এর পিঠে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখা হতো, যতক্ষণ না চামড়া পুড়ে পুড়ে খসে পড়ত।
শুধুমাত্র ঈমান গ্রহণের অপরাধে তাঁদের ঘরবাড়ি লুট করা হয়েছে, সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, মুসলিমরা তবুও ধৈর্যের চাদর জড়িয়ে নীরবে সব সহ্য করেছেন। কারণ তাদের অন্তরে ছিল আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস।
অবশেষে তারা ছেড়ে গেল প্রিয় জন্মভূমি মক্কা, আশ্রয় নিল মদিনায়। কিন্তু, মুহাজিরদের হৃদয়ে তখন এক বেদনাময় গভীর প্রশ্ন “আর কতদিন এই অত্যাচার চলবে”?
সেই মুহূর্তে আসমান থেকে নেমে আসলো সান্ত¡নার বাণী, “যাদের সাথে যুদ্ধ করা হয় তাদেরকে (যুদ্ধের) অনুমতি দেওয়া হলো, কেননা তাদের প্রতি জুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে পরিপূর্ণ সক্ষম।” (সুরা হজ: ৩৯)
এটা ছিল নির্যাতিত হৃদয়ের জন্য আসমানি তোহফা, দীর্ঘ ধৈর্যের পর প্রতিশ্রুত সাহায্যের ঘোষণা।
সংবাদ এলো, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব-এর নেতৃত্বে কুরাইশদের এক বাণিজ্য কাফেলা আসছে। অনেক উট বোঝাই সম্পদ, যার অধিকাংশই ছিল মুসলিমদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সম্পদ।
অতঃপর রাসুল (সা.) তাঁর সাহাবিদের বের হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন। যারা প্রস্তুত ছিলেন, তাদের দ্রুত রওনা হতে বললেন এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অপেক্ষা করেননি, যাতে কাফেলাটি হাতছাড়া না হয়ে যায়।
এ কারণেই বদর যুদ্ধে মুসলিমরা তাদের পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে বের হননি। তারা মূলত কাফেলাটি দখল করার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন; কুরাইশদের বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া তাদের পরিকল্পনায় ছিল না।
মাত্র ৩১৩ জনের ছোট্ট কাফেলা। সরঞ্জাম মাত্র দুটি ঘোড়া, সত্তরটি উট ও সামান্য কয়েকটি অস্ত্র। বাহ্য দৃষ্টিতে পৃথিবীর বুকে দুর্বল একটি বাহিনী। কিন্তু তাদের বুকে ছিল এমন এক শক্তি, যা সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না, ঈমান ছিল অটুট, দীপ্তি ছিল ত্যাগের, ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা। সেই বিশ্বাসই তখন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
বদর প্রান্তর: সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন পার্থক্য
আবু সুফিয়ান চালাকি করে কাফেলাকে ভিন্ন পথ দিয়ে নিরাপদে নিয়ে গেল। কিন্তু কুরাইশের অহংকার তাদের ঘরে ফেরতে দিল না। অভিশপ্ত আবু জাহেল খেঁকিয়ে উঠে বলল: “আমরা বদর পর্যন্ত যাবো। মুহাম্মাদকে শেষ করব। আরবকে দেখিয়ে দেব কুরাইশের শক্তি কতখানি!”
মুসলিম বাহিনী মুশরিকদের আগেই বদরে পৌঁছে গেলেন। হুবাব ইবনে মুনযির (রাযি.) তখন পরামর্শ দিলেন, বদরের পানির উৎস যেন মুসলিমদের পেছনে রাখা হয়, যে তা মুসলিম বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাসুল (সা.) তাঁর এই পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই রাসুল (সা.) বদর যুদ্ধে নিহত হওয়া কুরাইশ নেতাদের মৃত্যুর স্থানও দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন: “আগামীকাল এখানে অমুক নিহত হবে। ইনশাল্লাহ। এবং এখানে অমুক নিহত হবে। ইনশাআল্লাহ।”
যুদ্ধের দিন সকালে রাসুল (সা.) তাঁর বাহিনীকে যুদ্ধের কাতারে কাতারে বিন্যস্ত করলেন। তিনি একটি তাবুতে অবস্থান করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন। এ সময় রাসুল (সা.) গভীর রুনাজারির সাথে আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকেন, এমনকি তাঁর কাঁধের চাদর পর্যন্ত পড়ে যায়।
একপার্যায়ে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.) এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! যথেষ্ট হয়েছে। তিনি অবশ্যই আপনার সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।”
এরপর আল্লাহ তাআলা নাজিল করলেন: “স্বরণ কর, যখন তোমরা নিজ রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলে, ফলে তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে (সুসংবাদ দিলেন) যে, ‘আমি পর-পর আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহয্য করব।’ (সুরা আনফাল-৯)
এরপর রাসুল (সা.) তাবু থেকে বের হলেন এবং বললেন: “এই বাহিনী পরাজিত হবে এবং তারা পালিয়ে যাবে।” (সুরা কামার: ৪৫)
অতঃপর রাসুল (সা.) মুশরিকদের দিকে এক মুঠো কঙ্কর নিক্ষেপ করলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তুমি নিক্ষেপ করোনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন।” (সূরা আনফাল: ১৭)
অর্থাৎ, নিক্ষেপের সূচনা রাসুল (সা.) করেছিলেন, কিন্তু সেই নিক্ষেপের প্রকৃত প্রভাব আল্লাহর পক্ষ থেকেই সংঘটিত হয়েছিল।
যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধের সূচনা হয় কুরাইশ নেতা উৎবা ইবনে রাবিয়ার অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে। তার সঙ্গে ছিল তার পুত্র ওয়ালিদ ও ভাই শায়বা। মুসলিম বাহিনীর দিকে অগ্রসর হয়ে তারা একক যুদ্ধের আহ্বান জানায়। প্রথমে আনসারদের কয়েকজন তরুণ এগিয়ে এলে তারা তাদের প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজেদের গোত্রের সমকক্ষ প্রতিদ্ব›দ্বী দাবি করে।
রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ তখন হযরত আলি বিন আবি তালিব, হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব এবং উবাইদা বিন হারিস (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এগিয়ে যান। হামজা (রা.) উৎবাকে, আলি (রা.) শাইবাকে কতল করেন। আর উবাইদা ও তাঁর প্রতিপক্ষ উভয়েই গুরুতর আহত হন। পরে আলি ও হামজা (রাযি.) মিলে শত্রুকে কতল করে আহত উবাইদাকে ফিরিয়ে আনেন। এই দ্বন্দ্বযুদ্ধের ফল কুরাইশদের মনোবল ভেঙে দেয়। এরপর তারা সম্মিলিত আক্রমণ শুরু করে। এদিকে রাসুল (সা.)ও সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন- শত্রুদের দিকে তীর নিক্ষেপ করতে।
বদরের তাৎপর্য ও ইতিহাস পরিবর্তনের মুহূর্ত
বদরের যুদ্ধকে শুধু একটি সামরিক অভিযান ভাবলে ভুল হবে। এটি ছিল এক মহাজাগরণ, এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা।
প্রথমত: এটি ছিল ঈমানের বাস্তব পরীক্ষা। আল্লাহর সাহায্য কেবল কিতাবের পাতায় নয়, বরং বাস্তব জীবনে বদরের মাটিতে দৃশ্যমান হলো। মুসলিমরা প্রমাণ পেল, যখন তোমরা আল্লাহর জন্য বের হবে, আল্লাহ তোমাদের সাথে থাকবেন।
দ্বিতীয়ত: এটি মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করলো। কারণ বদরের বিজয়ের পর মদিনার মুনাফিকরা প্রকাশ্যে আর শত্রুতা দেখাতে পারলো না। তারা ইসলামের ভিতরে লুকিয়ে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিলো।
তৃতীয়ত: এটি আরব উপদ্বীপে ইসলামের রাজনৈতিক ক্ষমতার সূচনা করলো। সিরিয়া পর্যন্ত বার্তা পৌঁছে গেল, মুসলিমরা সাধারণ কেউ নয়? তারা আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
চতুর্থত: বদরী সাহাবিদের মর্যাদা অতুলনীয় হলো। রাসুল (সা.) একদিন কাব ইবনে মালিকের সম্পর্কে বললেন: “আল্লাহ বদরীদের ব্যাপারে বলেছেন: যা ইচ্ছা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম।” (সহিহ বুখারি: ৩৯৮৩)
রমজানের বদর: সংযম থেকে শক্তির বিস্ফোরণ
বদর কোনো সাধারণ সংঘাত ছিল না, আর এটি রমজান মাসে সংঘটিত হওয়া কোনো ‘কাকতালীয়’ ঘটনাও ছিল না। রমজানের কাঠফাটা রোদে তৃষ্ণার্ত ছাতি আর ক্ষুধার্ত উদর নিয়ে যখন মুজাহিদগণ রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁদের ভেতর এক প্রচণ্ড আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। রমজানের সিয়াম মুসলিমের অন্তরে যে অবিনাশী শক্তি তৈরি করে, সেই অদম্য সংযম, হিমালয়সম ধৈর্য আর নিখাদ আল্লাহমুখিতাই ছিল বদরের প্রান্তরে বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন: “সিয়াম হলো ঈমানের ঢাল।” (যাদুল মাআদ, ২/২৮) এই ঢাল কেবল প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে নয়, এই ঢাল বাতিলের সকল অন্যায় আর জুলুমের বিরুদ্ধেও।
যে রোজাদার মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের বৈধ পানাহার আর দুনিয়ার তুচ্ছ লোভকে অবলীলায় বিসর্জন দিতে পারে, সেই কেবল আখিরাতের অনন্ত পথে লড়বার যোগ্যতা রাখে। যার আত্মা প্রবৃত্তির গোলামি থেকে মুক্ত, তার তলোয়ারই কেবল বাতিলের দম্ভকে চূর্ণ করার শক্তি রাখে।
রমজানে বদরের এই স্মৃতিচারণ কেবল ধূলোপড়া ইতিহাস পাঠ নয়; এটি এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তোলার নিনাদ। বদর আমাদের শেখায়, পেট খালি থাকলেও যদি কলিজা ঈমানের নূরে ভরপুর থাকে, তবে সহস্র আবু জাহেলও পদানত হতে বাধ্য। রমজান আমাদের কেবল সংযম শেখায় না, বরং সেই সংযমকে শক্তিতে রূপান্তর করে বাতিলের সিংহাসন কাঁপিয়ে দেওয়ার দীক্ষা দেয়।
বদর থেকে গাজা: ইতিহাসের চিরন্তন সংঘাত
একটু চোখ বন্ধ করুন এবং বর্তমানের এই আর্তনাদভরা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একবার নিজের কলিজার কম্পন অনুভব করুন। গাজায় নিষ্পাপ শিশুদের লাশের ওপর দিয়ে দম্ভভরে ইহুদিবাদী বুলডোজার চলছে, মিয়ানমারে জ্বলন্ত ঘরবাড়ির সাথে ছাই হয়ে যাচ্ছে জ্যান্ত মানুষের স্বপ্ন। আর কাশ্মীরে মায়েরা আজও হাহাকার করে সন্তানের লাশের অপেক্ষা করছে। সিরিয়া, সুদান, ইয়েমেন কিংবা ইরাক, প্রতিটি মুসলিম জনপদ আজ মুসলিমদের রক্তে ভেজা জায়নামাজে পরিণত হয়েছে। এই দৃশ্যপট কি খুব নতুন? কক্ষনো না! এটি মূলত ইতিহাসের সেই অবিনাশী চিরন্তন সংঘাতেরই এক আধুনিক সংস্করণ। আজকের এই পৃথিবী আসলে এক ‘নতুন বদর’, তফাৎ কেবল যুদ্ধের কৌশলে আর অস্ত্রের ধরনে।
সেদিন বদরের উত্তপ্ত বালুপ্রান্তরে ছিল তরবারি আর বর্শার ঝনঝনানি। আর আজ আকাশ চিরে বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসে ঘাতক ড্রোন আর বিধ্বংসী মিসাইল। সেদিন ছিল আবু জাহেলের জাহেলিয়াত এবং গোত্রীয় আভিজাত্যের অন্ধ অহংকার। এখন বিশ্বজুড়ে জেঁকে বসেছে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের বিষাক্ত ও পৈশাচিক ঔদ্ধত্য। সেদিন শয়তানের সরাসরি প্ররোচনায় মিথ্যার আস্ফালন ছিল মক্কার রাজপথে, এখন সেই একই মিথ্যাকে ডিজিটাল দুনিয়ার নীল নকশায় সুকৌশলে ‘পরম সত্য’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কানে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। মজলুমকে বানানো হচ্ছে সন্ত্রাসী, আর খুনিকে দেওয়া হচ্ছে বীরের মর্যাদা।
কিন্তু ইতিহাসের এই দুই প্রান্তের মাঝে সবচেয়ে বড় মিল হলো: পৃথিবীর চোখে সত্যকে আজও দুর্বল, নিঃস্ব আর একাকী দেখা যাচ্ছে। আজও সংখ্যার বিচারে এবং জাগতিক শক্তির পাল্লায় মুসলিমরা চরমভাবে কোণঠাসা। আজও বাতিল শক্তির প্রস্তুতি, আকাশচুম্বী সমরাস্ত্র আর পাহাড়সম অর্থশক্তি মুমিনের সামনে দানবের মতো দাঁড়িয়েছে। মূলত, ঈমানের সেই ভয়ংকর ও কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সময়টিই আল্লাহ তায়ালা পুনরায় আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছেন। তিনি দেখতে চান, কে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আর কে বাতিলের ভয়ে কুঁকড়ে যায়।
মনে রাখতে হবে, বদরের সেই মরুপ্রান্তরে আসমানি সাহায্য কিন্তু আকাশ থেকে এমনিই নেমে আসেনি। আল্লাহর সাহায্য আসার একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত রয়েছে আছে। বিশ্ব মুসলিমদের সামনে কোরআন উচ্চারণ করেছে, “যদি তোমরা আল্লাহকে (অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনকে) সাহায্য করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ় রাখবেন।” (সুরা মুহাম্মাদ: ৭)
পরাজয়ের কারণ
আজকের এই বৈশ্বিক পরাজয় আমাদের সমরাস্ত্রের অভাবে নয়, বরং আমাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে খোদায়ী সম্পর্কের চরম শিথিলতায়। আমাদের কপালে লাঞ্ছনার তিলক লেগেছে কারণ আমরা সংখ্যাতত্ত্বের মোহে অন্ধ হয়েছি। আমরা বীরত্বের চেয়ে জীবনকে বেশি ভালোবেসেছি। যেদিন আমরা সংখ্যার এই জাগতিক হিসাব ছুড়ে ফেলে ৩১৩ জনের সেই ইস্পাতকঠিন সংকল্প আর শাহাদাতের তামান্না নিয়ে রাজপথে দাঁড়াতে পারব, সেদিনই আসমানের দরজা আবার খুলবে এবং ফেরেশতাদের সেই হারানো কাতার পুনরায় জমিনে অবতীর্ণ হবে।
এই যে, জনপদে জনপদে মুসলিমদের রক্তপাত ও তাদের উপর পৈশাচিক জুলুম, এসব আসলে আমাদের মিটিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং আমাদের অন্তরে ঘুমন্ত মুমিন সত্তাকে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় জাগিয়ে তোলার আসমানি আহ্বান। বদর আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছে, বিজয় কখনোই সংখ্যার দম্ভে কিংবা অস্ত্রের জোড়ে আসে না; প্রকৃত বিজয় আসে হৃদয়ের গভীরতম বিশ্বাস আর রাব্বুল আলামীনের ওপর করা নিঃশর্ত তাওয়াক্কুলের অবিচল শক্তিতে।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

