পবিত্র রমজানে মুমিন জীবনে আনন্দের হাওয়া বয়ে যায়। বরকতময় এ মাস সাধনা ও অধিক নেক আমলের মাস। মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য হাসিলের অপূর্ব সুযোগ। তাই তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে আদর্শবান সাহাবায়ে কেরাম এ মাসের হক পুরোপুরি আদায় করতেন। অধিক নেক আমলের পুষ্প দ্বারা সুশোভিত করতেন নিজেদের জীবন। রমজানুল মুবারকে ইবাদতের কঠিন সাধনায় মগ্ন থেকে প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন করাই ছিল তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সাহাবায়ে কেরামের পর তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ি ও পরবর্তী বুজুর্গানে দ্বীন ছিলেন অধিক ইবাদতকারী আল্লাহর বান্দা। তাঁদের কাছেও রমজান ছিলো ত্যাগ-তিতিক্ষা ও খোদা তায়ালার নৈকট্য অর্জনের মাস। সাহাবায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দীন বরকতময় এই মাসে মোটেও সময় অপচয় করতেন না। বরং রোজা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমেও তাঁরা রহমত, বরকত ও নাজাত লাভের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। মাহে রমজানে তাঁদের ইবাদত-বন্দেগি কেমন ছিল? সেই ব্যাপারে কিঞ্চিত আলোকপাত করছি।
রমজান মাসে সাহাবিগণের অন্যতম একটি ইবাদত ছিল কিয়ামুল লাইল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে তাঁরাও রমজানের রাতে সালাতে দাঁড়াতেন। রবের দরবারে সিজদায় অবনত হতেন। সারাদিন রোজার শেষে কিয়ামুল লাইল তাঁদের হৃদয়কে উদ্ভাসিত করত। তাই তাঁরা একাগ্রচিত্তে রমজানের রাতে সালাত আদায়ে মনোনিবেশ করতেন। হজরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমজান মাসে একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত আদায় করছিলেন। আমি এসে তার পাশে দাঁড়ালাম এবং অন্য একজন লোক এসেও তার পাশে দাঁড়ালেন। এভাবে আমরা এক দল মানুষ হয়ে গেলাম। (সহিহ মুসলিম: ২৪৬০)
সাহাবায়ে কেরাম খুব গুরুত্বের সাথে তারাবিহ সালাত আদায় করতেন। হজরত উমর রাযি.-এর যুগে জামাতের সাথে পূর্ণ বিশ রাকাত তারাবিহ নামাজ পড়ার প্রচলন আরম্ভ হয়। সকল সাহাবি এতে ঐক্যমত পোষণ করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর গোটা রমজান মাসে তাঁরা জামাতের সাথে পূর্ণ বিশ রাকাত তারাবিহ সালাত আদায় করতেন।
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবদ আল-কারি রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি রমজানের এক রাতে উমর ইবনে খাত্তাব রাযি.-এর সাথে মসজিদে নববিতে গিয়ে দেখি যে, লোকজন এলোমেলোভাবে জামাতে বিভক্ত। কেউ একাকী নামাজ পড়ছে আবার কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করছে এবং তার ইকতিদা করে একদল লোক নামাজ পড়ছে। উমর রাযি. বললেন, আমি মনে করি যে, যদি আমি একজন কারীর (ইমামের) পেছনে এই মানুষদের একত্র করি, তবে তা উত্তম হবে। তারপর তিনি উবাই ইবনে কাব রাযি.-এর পেছনে সকলকে একত্র করলেন। পরে আর এক রাতে আমি উমর রাযি. সাথে বের হই। তখন লোকেরা তাদের কারী ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। উমর রাযি. বললেন, এই নতুন ব্যবস্থা কতই না সুন্দর! (সহিহ বুখারি: ২০১০)
হজরত মালিক রহ. ইয়াজিদ ইবনে রুমান রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, হজরত উমর ইবন খাত্তাব রাযি.-এর জমানায় রমজানে লোকজন তেইশ রাকাত সালাত আদায় করতেন (তিন রাকাত বিতর এবং বিশ রাকাত তারাবিহ)। (মুয়াত্তা মালিক: ২৪৫)
কিয়ামুল লাইলের পাশাপাশি কোরআন নাজিলের এই মাসে সাহাবিগণ অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। মহান আল্লাহ পাক কোরআন পাঠকারীকে অনেক ভালোবাসেন। আল্লাহর বাণী পাঠ করার ওসিলায় সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি অনুভব হতো। তাই বরকতময় এই মাসে তাঁরা কোরআন তেলাওয়াত থেকে মোটেও পিছিয়ে থাকতেন না।
হজরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, রমজান মাসে তিনি তিন দিনে কোরআন খতম করতেন। (আল মুজামুল কাবির, হাদিস: ৯, ১৪৩, ৮৭০৮)
সাহাবায়ে কেরামের পর তাঁদের পরবর্তী বুজুর্গানে দ্বীনও মাহে রমজানে অধিক ইবাদতকারী ছিলেন। তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিগণের উত্তম অনুসারী ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের মতো তাঁরা রমজানের দিন-রাত অতিবাহিত করতেন ইবাদতের মধ্য দিয়ে। এ মাসে কিয়ামুল লাইল ও কোরআন তেলাওয়াতসহ সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে সমসাময়িক মানুষের মধ্যে তাঁরা অগ্রগামী থাকতেন।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারি রহ. যখন রমজান মাসের প্রথম রাতে উপনীত হতেন, তখন তাঁর সাথিরা তাঁর নিকট একত্রিত হতেন। তিনি তাদেরকে নিয়ে নামাজ পড়তেন এবং প্রত্যেক রাকাতে বিশটি করে আয়াত তেলাওয়াত করতেন। এমনিভাবে তিনি কোরআন খতম করতেন। আর সাহরির সময় তিনি কোরআনের অর্ধেক থেকে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেন। ফলে, প্রতি তিন রাতে একবার সাহরির সময় কোরআন খতম করতেন। দিনের বেলায় তিনি প্রতিদিন একবার কোরআন খতম করতেন এবং ইফতারির সময় তাঁর (কোরআন) খতম হতো। তিনি বলতেন, প্রত্যেক খতমের সময় একটি দোয়া কবুলযোগ্য থাকে। (সূত্র: তাবাকাতুল হানাবিলা, ১/২৭৫)
সাহাবিগণও কোরআন খতম করার পর আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন। এমনকি তাঁদের পরিবারবর্গ দোয়ায় শামিল থাকতো।
হজরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. যখন কোরআন খতম করতেন, তখন তাঁর পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের একত্র করতেন। অতঃপর তাদের জন্য দোয়া করতেন। (সূত্র: মুজামুল কাবির, ১/২৯১)
রমজান মাসে সাহাবায়ে কেরামের হৃদয় মসজিদের সাথে লেগে থাকতো। আল্লাহর ঘরে বসে তাঁরা আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করতেন এবং তাঁর ইবাদতে মগ্ন হয়ে পড়তেন। ইবনে আবি শাইবা আবুল মুতাওয়াক্কিল থেকে বর্ণনা করেন, হজরত আবু হুরাইরা রাযি. ও তাঁর সঙ্গীগণ রোজাদার অবস্থায় মসজিদে বসে থাকতেন।
রমজান মাসের অন্যতম আমল হলো- গরিব-দুঃখীদের খোঁজ-খবর নেওয়া, সাধ্যমতো তাদেরকে দান করা এবং রোজাদারদের ইফতার করানো। সাহাবায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দীন অত্যাধিক উৎসাহের সাথে গুরুত্বপূর্ণ এই আমলগুলো করতেন।
হজরত ইবনে উমর রাযি. রোজা রাখতেন এবং মিসকিনদের ছাড়া ইফতার করতেন না। যদি তাঁর পরিবার মিসকিনদের তাঁর নিকট আসতে বাধা দিতো, তবে তিনি ওই রাতে আর রাতের খাবার খেতেন না। তিনি খাবার খাওয়া অবস্থায় যখন কোনো ভিক্ষুক তাঁর নিকট আসতো, তিনি খাবারের অংশটুকু নিয়ে উঠে যেতেন এবং তা ভিক্ষুককে দান করে দিতেন।
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেছেন, কোনো ব্যক্তির জন্য রমজান মাসে অধিক পরিমাণে দান-সদকা করা আমি পছন্দ করি- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ করে, মানুষের প্রয়োজনের তাগিদে এবং অনেকে উপার্জনের কাজ থেকে বিরত থেকে সওম ও সালাতে মশগুল থাকার কারণে। (সূত্র: আল হাওয়িল কাবির ফি ফিকহি মাযহাবিল ইমামিশ-শাফিয়ি, ৩/৪৭৯)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম ও বুজুর্গগণ রমজান মাসে ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফকালীন তাঁরা এক স্থানে বসে করা যায়, এমন সব ধরনের নেক আমলই করতেন।
হাকিমুল উম্মত হজরত আশরাফ আলি থানভি রহ. রমজান মাসে ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফে বসে তিনি লেখালেখিও অব্যাহত রাখতেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা ‘কসদুস সাবিল’ ইতিকাফে বসেই লিখেছেন। (সূত্র: আকাবির কা রমজান)
রমজান মাসে নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াতসহ কোনো ইবাদতেই সাহাবায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দ্বীনের কমতি ছিল না। বরং, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো তাঁরা পবিত্র এই মাসকে আমলের মৌসুম মনে করতেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং চিন্তা ছিল পরকাল নিয়ে। ফলে, রমজান মাসে তাঁরা দুনিয়াবি কাজ থেকে নিজেদের ফারেগ রাখতেন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টায় সকল ইবাদতে মগ্ন হতেন। তাইতো তাঁরা হয়েছেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা। সার্থক হয়েছে তাঁদের জীবন এবং কষ্টকর ইবাদত-বন্দেগি। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তাঁদের মতো রমজান মাসে অধিক ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, আলেমা
বিকেপি/এমএম

