Logo

ধর্ম

তাওবার গুরুত্ব ও ফজিলত

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ২২:৩৬

তাওবার গুরুত্ব ও ফজিলত

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। আবেগ, প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ বারবার গুনাহে লিপ্ত হয়। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য তাওবার দরজা সব সময় খোলা রেখেছেন। তাওবা মানে শুধু গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া নয়; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, নিজেকে সংশোধন করা এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা। কোরআন ও হাদিসে তাওবার গুরুত্ব ও ফজিলত এত গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, এটিকে মুমিন জীবনের নবজাগরণ বলা যায়।

তাওবার অর্থ ও প্রকৃত তাৎপর্য

‘তাওবা’ শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর অবাধ্যতা ত্যাগ করে আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে তাঁর আনুগত্যের পথে ফিরে আসাকেই তাওবা বলা হয়। তাওবার মূল তিনটি স্তম্ভ হলো- এক. গুনাহের জন্য গভীর অনুতাপ। দুই. অবিলম্বে গুনাহ ত্যাগ করা। তিন. ভবিষ্যতে সে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প। যদি গুনাহ মানুষের অধিকারের সঙ্গে জড়িত হয়, তবে ক্ষতিপূরণ ও ক্ষমা চাওয়াও তাওবার শর্তের অন্তর্ভুক্ত।

কোরআনের আলোকে তাওবার গুরুত্ব

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে বারবার তাওবার দিকে আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ [সুরা নুর : ৩১] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, তাওবা কেবল পাপীদের জন্য নয়; বরং সব মুমিনের জন্যই অপরিহার্য। আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন- ‘বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ [সুরা যুমার : ৫৩] এ আয়াত আল্লাহর সীমাহীন দয়ার উজ্জ্বল ঘোষণা। যত বড় গুনাহই হোক, খাঁটি তাওবার মাধ্যমে ক্ষমা লাভ সম্ভব।

আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা ও তাওবা

আল্লাহ তাআলা তাওবাকারী বান্দাদের ভালোবাসেন। কোরআনে এসেছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ [সুরা বাকারা : ২২২] এতে প্রমাণিত হয়, তাওবা শুধু গুনাহ মোচনের উপায় নয়; বরং আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম।

হাদিসের আলোকে তাওবার ফজিলত

হাদিসে তাওবার গুরুত্ব অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহানবী সা. বলেছেন- ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় তার চেয়েও বেশি খুশি হন, যেমন কোনো ব্যক্তি মরুভূমিতে তার হারানো বাহন ফিরে পেলে খুশি হয়।’ [সহিহ মুসলিম] এই হাদিস আল্লাহর দয়ার গভীরতা প্রকাশ করে। আরেক হাদিসে তিনি বলেন- ‘সব আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো তারা, যারা তাওবা করে।’ [তিরমিজি] অতএব, গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে তাওবার পথে ফিরে আসাই মুমিনের পরিচয়।

তাওবা ও গুনাহ মোচন

তাওবার অন্যতম বড় ফজিলত হলো-গুনাহ সম্পূর্ণরূপে মুছে যাওয়া। হাদিসে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে এমন যেন তার কোনো গুনাহই ছিল না।’ [ইবনে মাজাহ] এটি আল্লাহর অপার করুণা। তাওবার মাধ্যমে অতীতের কালিমা মুছে যায় এবং বান্দা নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পায়।

তাওবা বিলম্ব করার পরিণতি

ইসলাম তাওবা বিলম্ব করতে নিরুৎসাহিত করেছে। কারণ মৃত্যুর সময় বা গলা পর্যন্ত প্রাণ পৌঁছে গেলে তাওবা কবুল হয় না। কোরআনে আল্লাহ বলেন- ‘তাদের জন্য তাওবা নয়, যারা মৃত্যু আসা পর্যন্ত গুনাহ করতে থাকে।’ [সুরা নিসা : ১৮] অতএব, গুনাহ উপলব্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাওবা করা জরুরি।

তাওবা ও আত্মশুদ্ধি

তাওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। অহংকার ভেঙে দেয়, আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। তাওবাকারী ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেয়-এটাই প্রকৃত বিনয়। নিয়মিত তাওবার অভ্যাস মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

তাওবার আদব ও উত্তম সময়

তাওবার কিছু আদব রয়েছে- এক. একান্তে আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা চাওয়া। দুই. চোখের পানি ও অনুতপ্ত হৃদয়। তিন. বারবার ইস্তিগফার করা। চার. নেক আমল বৃদ্ধি করা। যদিও তাওবার জন্য নির্দিষ্ট সময় নেই, তবে রাতের শেষ অংশ, সেজদা ও ফরজ নামাজের পর তাওবা করা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে আছে- ‘আল্লাহ প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন-কে আছে তাওবাকারী, আমি তার তাওবা কবুল করব।’ [সহিহ বুখারি]

দুনিয়া ও আখিরাতে তাওবার ফল

দুনিয়াতে তাওবার ফল হলো অন্তরের শান্তি, আল্লাহর সাহায্য ও জীবনে বরকত। আর আখিরাতে তাওবা জান্নাত ও মুক্তির পথ খুলে দেয়। আল্লাহ বলেন- ‘যে ব্যক্তি তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহকে নেকিতে রূপান্তর করে দেন।’ [সুরা ফুরকান : ৭০] এটি তাওবার সর্বোচ্চ সম্মান।

মুমিন জীবনের আশার আলো

তাওবা মুমিন জীবনের আশার আলো। এটি মানুষকে হতাশা থেকে উদ্ধার করে এবং আল্লাহর রহমতের ছায়ায় ফিরিয়ে আনে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট, তাওবা ছাড়া সফলতার পথ নেই। অতএব, আমাদের উচিত প্রতিদিন নিজের আমল পর্যালোচনা করা, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবার মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করা। আল্লাহ তাআলাই তাওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর