Logo

ধর্ম

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬

ইসলামে নারীর অধিকার ও সম্মান

Icon

ডা. মুহাম্মাদ হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২:২৮

ইসলামে নারীর অধিকার ও সম্মান

আজ রোববার, ৮ মার্চ-২০২৬। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বের নানা দেশে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারী মানবজাতির অর্ধেক অংশ হলেও সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। নারীর সম্ভাবনা, প্রতিভা এবং ক্ষমতা বিকাশে বাধা সমাজের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকে ধীর করে দেয়। তাই নারীর ক্ষমতায়ন কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের সমৃদ্ধির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য “অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ- সব নারীর জন্য হোক”। এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচারের পরিবেশ গঠন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ বা ন্যায্য হতে পারে না।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর মর্যাদা

ইসলামে নারীকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অধিকার সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

নিশ্চয়ই পুরুষ ও নারীরা একে অপরের পরিপূরক। তারা একে অপরের সাহায্যকারী ও দায়িত্ববান। (সূরা আল-নিসা: ৩৫) এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে নারী পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা রাখেন। ইসলামে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা, শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

নারীর শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: সকল মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারীর উপর শিক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৭৬২) এটি নির্দেশ করে যে নারীর শিক্ষার অধিকার ইসলামে অঙ্গীভূত। নারী শিক্ষিত হলে পরিবার ও সমাজ উভয়ই সমৃদ্ধ হয়। ইতিহাসে শিক্ষিত নারী যেমন সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি কোরআন ও হাদিসে শিক্ষা গ্রহণে নারীর উৎসাহও প্রতিফলিত হয়েছে।

আর্থিক ও সামাজিক স্বাবলম্বিতা

নারীর আর্থিক স্বাধীনতাও ইসলামে সুনিশ্চিত। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: নারীরা আপনার সম্পত্তি নয়, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি দায়িত্বশীল অধিকার ভোগ করে।-(সূরা আন-নিসা: ৩২)

এটি নির্দেশ করে যে নারীর উপর সম্পত্তি ও অর্থের ক্ষেত্রে পুরুষের কোনও অধিকার নেই। নারী নিজের উপার্জন, সম্পদ ও ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর হাদিসে রয়েছে, যে নারী নিজস্ব অর্থ উপার্জন করে, তার উপর আল্লাহর বরকত নাজিল হয়।” (সহিহ বুখারি: ৬৪২৮) নারীর কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ গ্রহণ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে বৈষম্য কমে এবং ন্যায়ের পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরিবার ও সমাজে নারীর ভূমিকা

নারীর সামাজিক মর্যাদা শুধুমাত্র পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামে নারীর ভূমিকা বিবেচনা করা হয় সমাজের প্রতিটি স্তরে। কোরআনে আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীরা পরস্পরের বন্ধু ও সাহায্যকারী।-(সূরা তাওবা: ৭১)

এটি নির্দেশ করে যে নারী সমাজে নেতৃত্ব, পরামর্শ, দায়িত্ব ও সেবা প্রদানে সমানভাবে সক্ষম। সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

ন্যায়বিচার ও সমতার আহ্বান

ইসলামে নারীকে ন্যায়বিচারে অংশগ্রহণ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি নারীর প্রতি ন্যায়বিচার করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সহিহ মুসলিম: ১৪৮৫)

এটি নির্দেশ করে যে নারীর সঙ্গে ন্যায়পরায়ণ আচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নারীর প্রতি বৈষম্য কেবল সামাজিক অন্যায় নয়, ধর্মীয়ভাবেও গর্হিত।

নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা

নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ইসলামে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে: “মুমিনদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভয় করে, তারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে দয়া ও সহানুভূতিশীল হবে।-(সূরা আত-তালাক: ৬) এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা মুসলিম পুরুষদের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য “অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—সব নারীর জন্য হোক” ইসলামের শিক্ষা ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নারীকে শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং ন্যায়ের পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া সমৃদ্ধি কল্পনাতীত। ইসলামে নারীকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, এবং তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও দায়িত্ব নিশ্চিত করার নির্দেশ রয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, নারী মানব সমাজের অর্ধেক অংশ। ইসলামের কোরআন ও হাদিসে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্বের উপর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণে নারীর ক্ষমতায়ন সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচারের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো কতটা জরুরি। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল নৈতিক দায় নয়, এটি জাতির অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমরা আশা করি, ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী সমাজে নারীর প্রতি সম্মান, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধু স্মরণীয় দিবস নয়, বরং পরিবর্তনের বাস্তব প্রেরণা হয়ে উঠবে।

লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক প্রবন্ধকার 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামি গবেষণা সেন্টার 

ই-মেইল:[email protected]

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম রমজান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর