রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সময়, যা অর্জিত হবে রোজা রাখার মাধ্যমে। আর এ রোজার দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সাহরি ও ইফতার- দিনের শুরু ও সমাপ্তির দুই বরকতময় মুহূর্ত। সাহরি কেবল শেষরাতে কিছু খেয়ে নেওয়ার নাম নয়; বরং ইবাদতের নিয়তে গ্রহণ করা এক বরকতময় আহার। এতে রয়েছে সুন্নাহর অনুসরণ, এবং সারা দিনের সিয়ামের শক্তি সঞ্চরণ। অন্যদিকে ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়; বরং দোয়া কবুলের অনন্য মুহূর্ত, শুকরিয়া আদায়ের সুন্দর সময়।
এই প্রবন্ধে আমরা সাহরি ও ইফতারের ফজিলত, তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
সাহরি পরিচিতি
সাহরি আরবী শব্দ ‘সুহুর’ থেকে নির্গত। অর্থ: রাতের শেষাংশে কিছু খাওয়া। এ শব্দটি আরবি সাহার শব্দ থেকে নির্গত। অর্থ: রাতের শেষ প্রহর। পরিভাষায়, “সওম পালনের নিয়তে মধ্যরাত থেকে সুবহে সাদিকের মধ্যেবর্তী সময়ে কিছু খাওয়া”-কে সাহরি বলা হয়।
সাহরি খাওয়া সুন্নত। সাহরিতে আল্লাহ তায়ালা বরকত রেখেছেন। রাসুল সা. বলেছেন, তোমরা সাহরি খাও; কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে। (সহিহ বুখারি-১৯২৩, সহিহ মুসলিম-২৪১৫) অন্য হাদিসে রাসুল সা. বলেন, আমাদের (মুসলমান) ও আহলে কিতাবদের (ইহুদী নাসারা) রোজার মাঝে পার্থক্য হল সাহরি খাওয়া। (সহিহ মুসলিম-২৪১৬)
সাহরি মধ্যরাতে বা অধিক পূর্বে না খেয়ে সুবহে সাদিকের পূর্ববর্তী সময়ে খাওয়া।
হযরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, হযরত যায়েদ বিন সাবেত রা: বলেন, “আমরা আল্লাহর রাসুলের সাথে সাহারি খাই। এরপর তিনি নামাজের জন্য দাঁড়ান। হযরত আনাস বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম ফজরের আজান ও সাহরির মধ্যে কতটুকু ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, ৫০ আয়াত (পাঠ বা ১৫-২০ মিনিট) পরিমান (সহিহ বুখারি-১৯২১, সহিহ মুসলিম-২৪১৮)
সাহরির খাবার ও তদসম্পর্কীয় মাসআলা
১. সাহরিতে খেজুর খাওয়া:
সাহরিতে যে-কোন পবিত্র হালাল খাদ্য ভক্ষণযোগ্য। তবে প্রিয় রাসুল (সা.)-এর পছন্দনীয় খাবারগুলো অগ্রাধিকার রাখে। আর রাসুল সা. যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। দেশ প্রকৃতির ভিন্নতার কারণে যদিও সেগুলো খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এজন্য পারতপক্ষে চেষ্টা করা রাসুলের পছন্দনীয় কোন একটি খাবার দস্তারখানে স্থান দেওয়া। আর তিনি খেজুর দিয়ে সেহরি খাওয়াকে সেরা সেহরি বলেছেন।
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল সা. বলেন, ‘খেজুর কতই না উত্তম সাহরি!’ (আবু দাউদ-২৩৪৫)
২. সাহরি বর্জন না করা:
শরীর নাপাক হওয়ার কারণে সাহরি বর্জন না করা। একান্ত যদি সময় সংক্ষিপ্ত হয় তাহলে ওজু করে সাহরি করে নেওয়া।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. জানাবাতের (গোসল ফরজ) অবস্থায় পানাহার কিংবা ঘুমানোর ইচ্ছা করলে নামাজের অজুর মত অজু করে নিতেন। (সহিহ মুসলিম-৩০৫)
তবে পরেই গোসল করে নেওয়া। আর নাপাক অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকা যেমনিভাবে শরীয়াতসম্মত নয় তদ্রুপ স্বাস্থসম্মতও নয়।
ইফতার পরিচিত
ইফতার ফাতরুন শব্দের ক্রিয়ামূল। এর অর্থ দুটি। এক. নবোদ্ভাবন। দুই, খাওয়া, বিদির্ণ করা। তবে ইফতারের সরল অর্থ হল- উপবাস ভঞ্জন করা। পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে দিনভর সাওম পালন শেষে রোজাদার সূর্যাস্তের পর প্রথম যে পানাহারের মাধ্যমে উপবাস ভঞ্জন করা হয়, তাকে ইফতার বলে। যে খাদ্য বা পানীয় দিয়ে ইফতার করা হয়, তাকে ইফতারি বলা হয়।
ইফতারের সময় সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন রাত ওদিক থেকে ঘনিয়ে আসে ও দিন এদিক থেকে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন রোজাদার ইফতার করবে (সহিহ বুখারি-১৮৩০)
দ্রুত ইফতার করা:
নির্ধারিত সময়ে ইফতারি করা। অযথা বিলম্ব না করা। ইফতার স্বতন্ত্র একটি ইবাদত এবং রাসুল সা.-এর সুন্নাহ।
নবীজি সা. সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করতেন। ইফতার শেষ করে সাহাবিদের নিয়ে নামাজের জামাতে দাঁড়াতেন। হাদিসে এসেছে, নবীজি বলেন, ‘লোকেরা যত দিন যথাসময়ে ইফতার করবে, তত দিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৫৭)
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দাদের মধ্যে তারা আমার সবচে প্রিয়, যারা দ্রুত ইফতার করে।’ (তিরমিজি, আলফিয়্যাতুল হাদিস- ৫৬০,)
খেজুর দ্বারা ইফতার করা:
রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে, সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে। কেননা, তাতে বরকত ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’ (মেশকাত-১৮৯৩)
অপর হাদিসে হজরত, আনাস বিন মালেক রা. বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সা. নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত, তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকত, তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন।’ (তিরমিজি-৬৩২)
রোজাদারকে ইফতার করানো:
আল্লাহর রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সে ওই রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। এবং রোজাদারের সওয়াবও কমানো হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস -৮০৭)
যায়েদ ইবনে খালেদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- নবীজি সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। রোজাদারের সওয়াব থেকে একটুও কমানো হবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ,- ১৭৪৬, সহিহ ইবনে হিব্বান-৮/২১৬)
উপসংহার
সাহরি ও ইফতার- দুই বরকতময় মুহূর্ত। আর রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং তা আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাধনা। আর এই সাধনাকে পরিপূর্ণ করে তোলে সাহরি ও ইফতারের বরকতপূর্ণ আহার। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সাহরি ও ইফতারের সুন্নাহ যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দান করুন এবং এ মাসের বরকতে আমাদের জীবনকে পবিত্র ও অর্থবহ করে তুলুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক
শিক্ষার্থী, তাখাসসুস ফিল ইফতা, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
বিকেপি/এমএম

